২০ নভেম্বর ২০১৯

সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে এক বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণ

দায় বাড়ছে সাধারণ মানুষের
-

সরকার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে এক বছরে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ বিপুল অঙ্কের ঋণের সুদ যেকোনো ঋণের সুদের চেয়ে বেশি। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, উচ্চ সুদের এ ঋণের মাধ্যমে সাধারণের ঘাড়ে প্রতি বছর দায় চাপানো হচ্ছে। বিদেশী ঋণ, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আরো সস্তায় ঋণ পাওয়া যেতো। কিন্তু ওই পথে না হেঁটে উচ্চ সুদের ঋণ নির্ভরতা শুধু জনগণের ওপর দায় চাপছে না, বরং উন্নয়ন ব্যয়ও সঙ্কোচিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে সরকার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে মোট ঋণ নিয়েছিল ৯০ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সুদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আসল পরিশোধ করা হয়েছে ৪০ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। এতে প্রকৃত বা নিট ঋণ নিয়েছে ৪৯ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে ঋণ নেয়া হয়েছিল ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সরকারের সঞ্চয়পত্র থেকে প্রকৃত ঋণ গ্রহণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারের ভুলনীতির কারণে ঋণপরিচর্চা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কারণ, সঞ্চয়পত্রে ঋণের সুদহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সেখানে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণের সুদহার তুলনামূলক কম। যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ ব্যয় হয়, সেখানে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নেয়ায় পরিশোধ করতে হচ্ছে সাড়ে ১১ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। বেশি মাত্রায় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নেয়ায় প্রতি বছরই বাড়তি সুদ গুনতে হচ্ছে সরকারকে। আর এ বাড়তি সুদ পরিশোধ করা হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে কর আদায়ের মাধ্যমে। অথচ বাড়তি সুদ পরিশোধ করতে না হলে এ ব্যয় উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা যেতো, যা কি না জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। আবার বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিলে সুদব্যয় আরো কম পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু নানা কারণে বিদেশী সংস্থাগুলোর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি প্রয়োজনীয় বিদেশী ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সরকারের ভুলনীতির কারণে সুদ পরিচর্চা ব্যয় বেশি করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, প্রতি বছরই সরকার বাজেটের আকার বাড়াচ্ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী আয় বাড়াতে পারছে না। এ কারণে ঋণ নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে বাজেট বাস্তবায়নে। ঋণ নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে সুদ ব্যয়। যেমন, গত ৫ অর্থবছরের ব্যবধানে সুদ ব্যয় বেড়েছে শতভাগের বেশি। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেটে সুদব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। ৫ বছরের ব্যবধানে চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫৭ হাজার ৭০ কোটি টাকা।
অস্বাভাবিক হারে ঋণের সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সরকারের ভুলনীতির কারণে প্রতি বছরই ঋণের সুদব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, সরকার ইচ্ছে করলেই কম সুদে ঋণ নিতে পারে। কিন্তু সে পথে সরকার হাঁটছে না। যেমনÑ বিদেশী ঋণের সুদ ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত হারে বিদেশী ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না।
এ কারণে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছে। আবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও তুলনামূলকভাবে কম হারে ঋণ নিতে পারে। সরকার ইচ্ছে করলেই এখন সিঙ্গেল ডিজিটে অর্থাৎ স্বল্প সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। এতে ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যয় কমে যেতো। কিন্তু সরকার ব্যাংক থেকে কম ঋণ নিচ্ছে। ঋণ নিচ্ছে ব্যাংকবহির্ভূত খাত অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র থেকে। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের সুদ এখনো সাড়ে ১১ শতাংশ রয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধন করে তা ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু সংশোধিত এ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও শেষমেশ ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেয়া হয়েছে সঞ্চয়পত্র থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অভ্যন্তরীণ খাত থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নেয়া। তিনি বলেন, ইদানীং ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ না নিয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি সুদ দিয়ে ঋণ নিচ্ছে। এতে ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ হলো সরকার কাক্সিক্ষত হারে বিদেশী ঋণ ব্যবহার করতে পারছে না। কেননা বিদেশী ঋণের সুদ অনেক কম। তিনি বলেন, বাজেটে সুদ ব্যয় কমাতে বিদেশী ঋণের ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। অন্যথায় ঋণপরিচর্চা করতেই বেশির ভাগ ব্যয় হয়ে যাবে।


আরো সংবাদ