অবরোধের প্রাচীর ভাঙতে গাজার অভিমুখে যাত্রা শুরু করল প্রতিরোধ নৌবহর

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর বিশ্বের বেশিরভাগ অংশ যখন গাজাকে আবার ভুলতে বসেছে, ঠিক তখনই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে এবং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এই নতুন মিশন শুরু করেছে এফএফসি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ফ্রিডম ফ্লোটিলা’র অধিকারকর্মীরা
ফ্রিডম ফ্লোটিলা’র অধিকারকর্মীরা |আল জাজিরা

গাজার ওপর ইসরাইলের বেআইনি ও মরণঘাতী অবরোধ গুঁড়িয়ে দিতে আবারও সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীদের জাহাজ বহর ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’। ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর হামলা, নির্মম শারীরিক নির্যাতন, ইলেকট্রিক শক বা টেজার প্রয়োগ ও যৌন সহিংসতার মতো জঘন্য অপরাধের মুখে দাঁড়িয়েও পিছপা হননি ফিলিস্তিনপন্থী এই মানবিক যোদ্ধারা। আগামী অক্টোবরে গাজার উপকূলে পৌঁছানোর চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে বিরতি দিচ্ছে ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন’ বা এফএফসি।

আল জাজিরা শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর বিশ্বের বেশিরভাগ অংশ যখন গাজাকে আবার ভুলতে বসেছে, ঠিক তখনই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে এবং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এই নতুন মিশন শুরু করেছে এফএফসি।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের দুটি জাহাজ এরইমধ্যে সমুদ্রে ভেসেছে। ‘হান্দালা ২’ নামের প্রথম জাহাজটি গত জুন ও জুলাই মাসে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলজুড়ে যাত্রা করে নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের বন্দর পরিদর্শন করেছে। অন্যদিকে ‘কেট’ নামের দ্বিতীয় জাহাজটি চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল থেকে রওনা হয়ে আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্সের বন্দরে বিরতি নিয়েছে। গাজার মূল সমুদ্রসীমার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে জাহাজ দুটি স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালির বন্দরেও নোঙর ফেলবে।

'বিশ্বের সরকারগুলো যখন তাদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, তখনই ফ্রিডম ফ্লোটিলাকে আবার সাগরে নামতে হয়েছে,' বলছিলেন এফএফসি পরিচালনা কমিটির সদস্য জোহর চেম্বারলেইন রেজভ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রতিটি নোঙর ফেলা বন্দরে তারা ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করবেন। এই আন্তর্জাতিক মানবিক অভিযানে যোগ দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, শান্তিপ্রয়াসী সাধারণ নাগরিক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীরা। মেরিল্যান্ড থেকে আসা তরুণ প্রকৌশলী এডওয়ার্ড ডিগিলিও মুচকি হেসে বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেন, 'গাজার দিকে জাহাজ চালানো যে কতটা ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমরা খুব ভালো করেই জানি। তবে ফিলিস্তিনিদের এই তীব্র আর্তনাদের মুখে আমাদের নিশ্চুপ বা নিষ্ক্রিয় বসে থাকাটা তার চেয়েও বহু গুণ বড় অপরাধ!'

মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হামলা ও নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০১০ সালে ‘মাভি মারমারা’ জাহাজে হামলা চালিয়ে ১০ জন কর্মীকে গুলি করে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ইসরাইলি বর্বরতা চরম রূপ পেয়েছিল। এমনকি গত এক বছরের মধ্যেই ‘গ্লোবাল সামুদ ফ্লোটিলা’ দুবার মাঝপথে আটকে দেয় তেল আবিব। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনের সমর্থক ও লেখক জুকিসওয়া ওয়ানার এবং নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি মান্ডলা ম্যান্ডেলাসহ সাড়ে চারশর বেশি কর্মীকে আটক করে ইসরাইল। পরবর্তীকালে ২০২৬ সালের এপ্রিলে আরও ১৭৫ জনকে একইভাবে বেআইনিভাবে আটক করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নিশ্চিত করেছে, আটক মানবিক কর্মীদের মাসের পর মাস ঘুমাতে না দেওয়া, পানি ও চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখা এবং ভয়াবহ শারীরিক নিপীড়ন চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এমনকি চলতি বছরের এপ্রিলে থিয়াগো অ্যাভিলা ও সাইফ আবুকেশেক নামের দুই কর্মীকে গোপন তথ্যের অজুহাতে দিনকে দিন যোগাযোগের বাইরে রেখে শেষমেশ দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়।

তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি বাহিনীর অমানবিক অবরোধে গাজার পরিস্থিতি দিন দিন এক চরম সংকটে রূপ নিচ্ছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, গাজার ৮২ শতাংশের বেশি পরিবার এখনও নিরাপদ পানির চরম সংকটে ভুগছে এবং সেখানকার পানীয় জল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ৯০ শতাংশই ইসরাইলি বোমায় গুঁড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও গাজার হাসপাতাল, ত্রাণাগার ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর হামলা থামায়নি ইসরাইলি সেনারা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, গত অক্টোবরে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলের নির্বিচার গুলিবর্ষণে ১,৩০০-রও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ হয়ে আছেন। ইসরাইলের এই চলমান হত্যাযজ্ঞ ও শ্বাসরুদ্ধকর অবরোধের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতেই ফের উত্তাল ঢেউয়ের বুকে ভেসে চলেছে ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’।