১৫ হাজার কিমি পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে ইরান : প্রযুক্তি দিচ্ছে কে?

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে হামলা চালানো সম্ভব।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
খোররমশাহর ক্ষেপণাস্ত্র
খোররমশাহর ক্ষেপণাস্ত্র |ইরানের প্রেসটিভি

সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) তৈরির পরিকল্পনা করছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার এক প্রতিনিধির বক্তব্য থেকে এই তথ্য সামনে এসেছে। বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হলো 'খোররামশহর', যার সর্বোচ্চ পাল্লা ৪ হাজার কিলোমিটার। তবে হুট করে এই পাল্লা বাড়িয়ে ১৫ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার উদ্দেশ্য মূলত মার্কিন ভূখণ্ডকে সরাসরি নিশানা করা।

ইউক্রেনের কিয়েভভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন সামরিক মিডিয়া ও কনসালটিং কোম্পানি 'ডিফেন্স এক্সপ্রেস' সম্প্রতি এই খবরের বিস্তারিত সামরিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মূলত সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প নীতি, অস্ত্রশস্ত্রের বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে হামলা চালানো সম্ভব।

চলতি মাসের ৭ তারিখে জুম্মার খোতবায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির প্রতিনিধি, তেহরানের জুম্মার নায়েবে ইমাম আবদুল-নবী মুসাভি ফার্দ প্রথম এই ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে সরাসরি অসীম পাল্লার আইসিবিএম তৈরিতে হঠাৎ এই লাফ দেয়া স্বাভাবিক ও প্রচলিত কৌশলের সাথে ঠিক মেলে না। সাধারণত ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে প্রথম ধাপের আইসিবিএম এবং এরপর মার্কিন ভূখণ্ডের ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্কে আঘাত হানার জন্য ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার প্রযুক্তি তৈরি করা হয়। সেখান থেকে সরাসরি ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার কথা ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান হয়তো আগের মতোই অন্য কোনো মিত্র দেশের তৈরি প্রযুক্তি হাতে পেতে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি নেয়ার এই ইতিহাস ইরানের জন্য নতুন নয়। উদাহরণস্বরূপ, তাদের 'খোররামশহর' ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত উত্তর কোরিয়ার 'হুয়াসং-১০' (মুসুদান)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এদিকে এ ক্ষেপণাস্ত্র আবার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের 'আর-২৭' সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা থেকে নেয়া।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া অন্তত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে যার পাল্লা ১৫ হাজার কিলোমিটার বা তার বেশি। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১২ জুলাই উৎক্ষেপণ করা হয় 'হুয়াসং-১৮।' এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ছিল ১৫ হাজার কিলোমিটার। এছাড়া, আরো শক্তিশালী 'হুয়াসং-১৯' ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৭ হাজার কিলোমিটারের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার 'হুয়াসং-১৮' তৈরিতে সরাসরি রাশিয়ার ভূমিকা ছিল পরিষ্কার। রাশিয়ার তিন স্তরের কঠিন জ্বালানিচালিত 'তোপোল-এম' আইসিবিএমের নকশা অনুকরণেই এটি তৈরি, ধারণা করা হয়। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার তরল জ্বালানিচালিত ১৫ হাজার কিমি পাল্লার 'হুয়াসং-১৭' ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি হয়েছে সোভিয়েত আমলের 'আর-৩৬' ক্ষেপণাস্ত্রের ভিত্তিতে। ন্যাটো এ ক্ষেপণাস্ত্রের নাম দিয়েছিল 'শয়তান।'

উত্তর কোরিয়ায় অত্যন্ত দ্রুত ও সফলভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিকাশ প্রমাণ করে যে এতে পরীক্ষিত রুশ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারও একই পথ ধরে রাশিয়া থেকে উত্তর কোরিয়া হয়ে সেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ইরানের হাতে পৌঁছানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অথবা আন্তর্জাতিক কোনো চাপ না মেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে তেহরানকে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জনে এবার সরাসরি সহায়তা দিতে পারে মস্কো।