যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে ‘ভদ্র আচরণ করা উচিত’ বলে সতর্ক করার পর বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী ‘জাহাজগুলোকে হুমকি দিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ব্যবহার’ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এছাড়া ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে জারি করা অবরোধ লঙ্ঘনের চেষ্টার পর পৃথক একটি জাহাজে গুলি চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ইরান হামলা চালিয়েছে- এমন দাবি করার পর এই পদক্ষেপ নেয়া হয়।
এদিকে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, তেহরান যদি এই চুক্তি থেকে উপকৃত না হয় তাহলে এটি মেনে চলার ‘কোনো কারণ নেই’।
মঙ্গলবার ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি আগামী সপ্তাহে আলোচনায় ফিরে না আসে তাহলে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে।
বুধবার দিনের শেষে সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে জানতে চান এমন করার আগে ইরানকে কোনো ডেডলাইন দেয়া হবে কি-না। তিনি বলেন, ‘আমি ডেডলাইন দিতে পছন্দ করি না। কিন্তু তারা খুব ভালো করেই জানে, তারা পুরো বিষয়টাই জানে.... তাদের ভদ্র আচরণ করা উচিত।’
পরে একটি প্রতিরক্ষা সম্মেলনে আসা প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ইরান ‘এই মুহূর্তে ভালো নেই’।
ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সমাধান করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমরা যা করছি তারা তা পছন্দ করছে না। তাদের সাথে মীমাংসায় যাব, নাকি বিষয়টি পুরোপুরি শেষ করে দেবো- আমরা দেখব।’
গালিবাফ অবশ্য বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের ‘ইরানি আধিপত্য’ বজায় রাখার ওপর দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা নির্ভর করছে।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ লড়াইয়ে যুদ্ধের পাশাপাশি আলোচনা চালানোও ইরানের প্রতিরোধ কৌশলের একটি অংশ।
হরমুজ প্রণালীতে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে হুমকি তিনি দিয়েছিলেন তার পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ‘বিশাল’ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করা হবে বলে জানানোর পর ট্রাম্পের এমন বক্তব্য আরো বেড়ে যায়।
এর আগে, এপ্রিল মাসে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় বোমা হামলার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, সেটি নিয়ে তখন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ফলকার টার্ক নিন্দা করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক এবং বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালানো একটি যুদ্ধাপরাধ।’
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ এই হামলাগুলো ছিল দ্বিতীয় দফার হামলা যেটি বুধবার দিনের আলোর মধ্যে চালানো হয়েছে বলে তাদের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে।
তারা জানিয়েছে, দিনের শুরুর দিকে তারা ‘হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা আরো কমিয়ে দিয়েছে’।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আরো জানিয়েছে, গ্রেটার টুনব দ্বীপে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে ৯০ মিনিট একনাগাড়ে হামলা চালানো হয়েছিল।
সেন্টকম জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় অবরোধ আরোপ করার পর থেকে তারা দু’টি বাণিজ্যিক জাহাজের পথ ঘুরিয়ে দিয়েছে।
এই অবরোধের কারণে কোনো জাহাজ ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে যাতায়াত করতে পারছে না।
গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে এর আগে এই অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছিল।
ওই স্মারকের লক্ষ্য ছিল মাসব্যাপী চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো। তবে, এই প্রণালী নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধটি এখন একটি বড় দ্বিমতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরোপের জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছে, তারা যাতে ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের স্বার্থে ব্যবহৃত অন্যান্য তেল ও গ্যাস রফতানির রুট বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় থাকে’।
কিন্তু কোন কোন রুট এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি তারা।
চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বৈরিতা বৈশ্বিক অর্থনীতির কাছে এই প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের রুটে ট্যাঙ্কার চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় তেলের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়।
সূত্র: বিবিসি



