সিসির সামনে ২ পথ

ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়ানো অথবা অস্তিত্ব রক্ষা

সিসির সামনে এখন দুই পথ। হয়তো ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়াবে। অথবা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ট্রাম্পের বাস্তুচ্যুতি প্রস্তাবনার প্রতি সমর্থন জানাবে।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি |ছবি : মিডল ইস্ট আই

১৯৭৮ সালে মিসর ও ইসরাইলের মাঝে স্বাক্ষরিত হয় গোপন ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি। এর মধ্য দিয়ে ইসরাইলের সাথে সরাসরি সংঘর্ষের সমীকরণ থেকে বেরিয়ে আসে মিসর। এরপরও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কিছুটা হলেও প্রভাব বজায় রাখে মিসর। সামরিক অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি স্বার্থের পক্ষে মিসরকে সোচ্চারও দেখা গিয়েছিল।

২০১৩ সালে হঠাৎ মিসরে সামরিক অভুত্থান হয়। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি তাতে নেতৃত্ব দেন। এরপর তিনি দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। ধীরে ধীরে মিসরের অর্থনীতিতে এর প্রভাব লাগে। ভঙ্গুর হতে শুরু করে তাদের শক্তিশালী অর্থনীতি। আর রাষ্ট্র পড়তে শুরু করে ঋণের গভীর খাদে। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব হারায় দেশটি। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো কায়রোকে আর্থিক জীবনরেখা প্রদান করে তার উপর প্রভাব বিস্তার করে। এরপর ফিলিস্তিন ইস্যুতে নতুন খেলোয়াড় হয়ে ওঠে সৌদি আরব। তারা কেবল আঞ্চলিকভাবেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। কিন্তু তাদের উদ্যোগ বেশি দূর এগুলো না। এরই মধ্যে ইসরাইলের সাথে আব্রাহাম চুক্তির অধীনে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে জড়িয়ে পড়ে আরব আমিরাত ও বাহরাইন। ফলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে নতুন আরো খেলোয়াড় যুক্ত হলো। তারা ক্রমেই মিসর ও জর্ডানের ঐতিহ্যবাহী ভূমিকাকে ছাড়িয়ে যায়। গাজার তহবিল প্রদানের মাধ্যমে অথবা ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রাজনৈতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার উল্লেখযোগ্য প্রভাব অর্জন করে।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর কায়রোর পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসে। এতে মিসরের জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পায় সিসির ব্যক্তিগত ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থ। তিনি রিয়াদের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে কৌশলগত তিরান ও সানাফির দ্বীপপুঞ্জ সৌদি আরবের কাছে হস্তান্তর করে। এতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সিসি শাসনের প্রাথমিক পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে। এরপর উপসাগরীয় পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থের উপর ভদিত্তি করেই পুনর্নির্ধারণ করা হয় মিসরের জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা।

কঠোর নিয়ন্ত্রণ

উপসাগরীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। মিসরও ওই বৃত্তে গিয়ে ঠাঁই নেয়। এতে ইসলামপন্থী প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই প্রসারিত হয়। তারা হামাসকেও প্রতিপক্ষ হিসেবে শামিল করে। তারা একে মুসলিম ব্রাদারহুডেরই অঙ্গ সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্কও ছিন্ন করে। ২০১৭ সালে তাদের ১৯৮৮ সালের প্রতিষ্ঠাতা সনদে গোষ্ঠীটির নাম কেটে সংশোধনী আনা হয়। এরপরও মিসরী কর্তৃপক্ষ হামাসকে প্রতিপক্ষ হিসেবেই বিবেচনা করতে থাকে।

এবার ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যখন হামাস ইসরাইলের অভাবনীয় হামলা চালায়, এরপর ইসরাইল গাজায় আগ্রাসন শুরু করে, তখন মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরাইলের সাথে তাদের স্বার্থের মিল খুঁজে পায়। কারণ, তারা আশঙ্কা করছিল যে হামাসের যেকোনো বিজয় আরব বিশ্বে সশস্ত্র সংগ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। এতে তাদের শাসনব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে। ফলে তারা ইসরাইলকে হামাসকে নির্মূল করার সুবিধা দেয়। এই কৌশলের অংশ হিসেবেই মিসর গাজাকে আরো বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেয়। তারা রাফার সীমান্ত ক্রসিংয়ের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো পাকাপোক্ত করে নেয়। একইসাথে সিসি হামাসকে নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এর সাথে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষেরও আঁতাত থাকতে পারে।

গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে বাইডেন প্রশাসন। তার ওয়াশিংটন ত্যাগ করার পরে পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ, ক্ষমতায় আবারো ফিরে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তার প্রথম মেয়াদে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে একটি চুক্তির প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। সেটিকে তিনি শতাব্দির সেরা চুক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনে আবারো ওই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হচ্ছে। এদিকে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে ট্রাম্প সম্প্রতি যে প্রস্তাবনা দিয়েছে, এতে স্পষ্ট হয় যে তিনি আগের চুক্তিতে অগ্রসর হবেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সিসি কথিত ওই ‘শতাব্দির সেরা চুক্তির’ প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে মিসর। ট্রাম্প গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের মিসর ও জর্ডানে ঠেলে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু এই প্রস্তাব জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করে মিসরের সামরিক বাহিনী তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আশঙ্কা করছে যে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সিনাই উপত্যকায় স্থানান্তরিত করা হলে ওই অঞ্চলের জনসংখ্যাগত পরিচয় বদলে যাবে। আর এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। আর এতে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যেকোনো সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গাজা থেকে সিনাইতে ব্যাপকভাবে স্থানান্তরিত হলে শরণার্থী সমস্যা ধীরে ধীরে দূর হয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বপ্ন কার্যকরভাবে শেষ হয়ে যাবে।

উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি

মিসর যদি ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাবনা মেনে নেয়, তাহলে মিসরের আঞ্চলিক প্রভাব ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ, তখন মিসরকে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থকে ধ্বংস করার সহযোগী হিসেবে দেখা হবে। পরবর্তীতে এই শরণার্থীরা মিসরের জন্য একটি স্থায়ী চাপেরও কারণ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া এর মধ্য দিয়ে তাদের উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যেও পড়তে হবে।

এই উদ্বেগের মধ্যে সিসি ২০৩০ সালের পরে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। বর্তমান

সংবিধান অনুসারে, তিনি কেবল সেই সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। তার শাসনের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আরো

কোনো সাংবিধানিক সংশোধন এবং সম্ভবত ট্রাম্পেরও সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।

সেজন্য এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে নিজের শাসন নিশ্চিত করার জন্য সিসি কি ট্রাম্পের নতুন বাস্তুচ্যুতি পরিকল্পনা মেনে নেবে? এটি এখন মিসরের রাজনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর সমাধান আংশিকভাবে মিসরীয় শাসনকে সমর্থনকারী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উপর নির্ভর করে।

মিসরীয় সামরিক বাহিনী যদিও বাস্তুচ্যুতি পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে, তবুও তারা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিকল্পনাই মেনে নেবে। যদি মিশরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো চুক্তি হয়েই যায়, তাহলে সামরিক বাহিনীকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিয়ে মিসরের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে বাফার জোন প্রতিষ্ঠার মতো আপস গ্রহণ করতে হতে পারে।

গাজা কেবল মিসরের জন্য একটি সীমান্ত এলাকাই নয়; এটি তার জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক নীতি এবং অর্থনীতির

একটি মূল উপাদান। গাজা সম্পর্কিত যেকোনো পরিস্থিতি -যুদ্ধ, পুনর্গঠন বা স্থানচ্যুতি- সরাসরি মিসরের উপর প্রভাব ফেলবে এবং আঞ্চলিক শক্তির গতিশীলতার কেন্দ্রে স্থান পাবে।

অতএব, কায়রোকে গাজায় একটি প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে তার ভূমিকা বজায় রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। একইসাথে এমন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কাজ করতে হবে, যা ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে অন্যদের পক্ষে স্থানান্তর করতে পারে।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ আবু সাঈদ