২২ নভেম্বর ২০১৯

জলাতঙ্কের জীবাণু নিয়ে ঢাকার রাস্তাঘাটে কয়েক হাজার কুকুর

-

জলাতঙ্কের জীবাণু বহন করে ঢাকার রাস্তা ও অলিগলিতে ঘুরছে কয়েক হাজার কুকুর। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকাসহ দেশের ৩৯টি জেলায় জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু শুধু ঢাকা শহরেই এখনো এর আওতার বাইরে রয়ে গেছে কয়েক হাজার কুকুর। সাধারণ পথচারীরা বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বের হয় কুকুরে কামড়ানোর আতঙ্ক নিয়ে। রাস্তায় কিংবা গলিতে কুকুর দেখা মাত্রই সবার মধ্যেই ভয় কাজ করে। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনই বলছে, তারা স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহায়তায় চলতি বছরেই ৯০ শতাংশ কুকুরের শরীরে ভ্যাকসিন দিয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে শতভাগ কুকুরকে জলাতঙ্ক নিরোধ প্রকল্পের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
এ দিকে শুধু ঢাকা শহরেই নয়, গ্রামের পাড়া মহল্লাতেও কুকুরের উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। জেলা শহর ও বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় কুকুরের এ উপদ্রব দিনকে দিন আরো বাড়ছে। আবার কিছু এলাকায় বেড়ে গেছে পাগলা কুকুরের আক্রমণও। এ অবস্থা উত্তরণে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের উদ্যোগে ফ্রান্স থেকে আনা হয়েছে বিশেষ ধরনের ভ্যাকসিন। এ ভ্যাকসিন শহরের পাশাপাশি গ্রামপর্যায়েও প্রশিক্ষিত লোকের মাধ্যমে কুকুরের শরীরে পুশ করা হচ্ছে।
অবশ্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে, শহরের প্রতিটি এলাকায় আলাদা আলাদা দিনে কুকুরের শরীরে ভ্যাকসিন পুশ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রতিটি কুকুর বিশেষ কায়দায় ধরে এই ভ্যাকসিন পুশ করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন থেকে প্রাপ্ত হিসাব মতে, গত ১৪ মে থেকে দুই সিটি করপোরেশনের ৪২ হাজার ৯৩৫টি কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের জরিপে ঢাকা শহরে কুকুরের সংখ্যা অর্ধ লক্ষাধিক। সেই হিসাবে ঢাকার রাস্তায় এখনো দশ হাজারের বেশি কুকুর ভ্যাকসিনের বাইরে অর্থাৎ জলাতঙ্কের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় কিংবা অলিগলিতে ঘুরছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন এবং অন্য আরো পাঁচ সিটি করপোরেশনসহ দেশের ৩৯ জেলায় সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনের অফিসের মাধ্যমে এ ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে। গত ৬ অক্টোবরের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, এখনো দেশের ২৫ জেলায় জলাতঙ্কের এ ভ্যাকসিন পৌঁছেনি। তবে এই প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও অন্য দু’টি হাসপাতালে ফ্রিজিং করে রাখা আছে, আর কিছু ভ্যাকসিন এ মাসেই ফ্রান্স থেকে দেশে আসছে। বাকি ২৫ জেলাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ ভ্যাকসিন পৌঁছে যাবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট শাখার দেয়া তথ্য মতে, ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৯ জেলায় মোট ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৮৫টি কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। একই সাথে ঢাকার দুই সিটিতে দেয়া হয়েছে মোট ৪২ হাজার ৯৩৫টি ভ্যাকসিন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৯ হাজার ২০৩টি কুকুরকে এবং দক্ষিণ সিটিতে ২৩ হাজার ৭৩২টি কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় গত ১১ জুলাই এক দিনেই আট দর্শনার্থীকে পাগলা কুকুরে কামড়ানোর পর কিউরেটর ডা: নজরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছিলেন, কুকুর মেরে ফেলার কোনো বিধান নেই। আইন অনুযায়ী কুকুর নিধনও করা যাবে না। ভ্যাকসিন দিয়ে কুকুরকে জলাতঙ্ক মুক্ত করতে সরকারিভাবেই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অবশ্য পরে ওই দিনই প্রশিক্ষিত টিম এনে চিড়িয়াখানার বেওয়ারিশ কুকুর ধরে সবগুলোকেই ভ্যাকসিন দেয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফরের ‘কমিউনিক্যাবল ডিজিস কন্ট্রোল ইউনিট’-এর ‘জুনোটিক ডিজিস কন্ট্রোল প্রোগ্রাম’-এর ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা: উম্মে রোমান সিদ্দিকী গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে, এই এলাকায় ২০১৯ সালের প্রথম দিকে মোট কুকুরের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২ হাজার ২৫৩টি। আর স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ভ্যাকসিন নিয়ে ১৯ হাজার ২০৩টি কুকুরের গায়ে সরাসরি প্রয়োগ করা হয়েছে। শতকরা হিসাবে ঢাকা উত্তর সিটিতে ভ্যাকসিন দেয়ার এ হার শতকরা ৮৯ ভাগ। অন্য দিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে তাদের ইস্টিমেটেট কুকুরের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬ হাজার ২৫৯টি। ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে ২৩ হাজার ৭৩২টি কুকুরের শরীরে। এখানেও ভ্যাকসিন-প্রাপ্ত কুকুরের সংখ্যা শতকরা ৯০ ভাগ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই কর্মকর্তা আরো জানান, এর আগে কুকুরের এই ভ্যাকসিন বাংলাদেশকে সরবরাহ করত ‘ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল অর্গানাইজেশন’ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। তবে এখন আমরা নিজেরাই নিজস্ব ফান্ড থেকে এই ভ্যাকসিন তৃতীয় একটি সংস্থার মাধ্যমে ফ্রান্স থেকে নিয়ে আসছি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগের উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: মো: এমদাদুল হক এ প্রতিবেদককে জানান, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের প্রশিক্ষিত লোকের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডভিত্তিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে কুকুরের এ ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে আমরা শুধু কুকুরের এ ভ্যাকসিন কার্যক্রম মনিটরিং করেছি মাত্র।
অন্য দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল (ডা:) মো: শরীফ আহমেদ বিএসপি, এমবিবিএস, এফসিজিপি, এমপিএইচ (পিএইসএ), এমফিল (এইচএইচএম) মোবাইলে নয়া দিগন্তকে জানান, কুকুরের ভ্যাকসিনের বিষয়ে নগরভবনের লোক সরাসরি জড়িত ছিলেন না। তাই ভ্যাকসিন দেয়া কুকুরের সঠিক পরিসংখ্যানটি এভাবে বলা যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যবস্থাপনায় ডিএসসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারাই ভ্যাকসিন দেয়ার কাজটি দেখভাল করেছেন বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র আরো জানায়, ঢাকার দু’টি ও বাইরের পাঁচটিসহ মোট সাতটি সিটি করপোরেশন এলাকা ছাড়াও মোট ৩৯ জেলা শহরে কুকুরের এই ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জনের সহায়তার স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিজস্ব প্রশিক্ষিত লোকের মাধ্যমেই এই ভ্যাকসিন দেয়া হয়। ৩৯ জেলার প্রতিটি উপজেলা শহর পর্যায়েও এই ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। সূত্রটি জানায়, ৩৯ জেলায় ভ্যাকসিন-প্রাপ্ত কুকুরের সংখ্যা ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৮৫টি। শতকরা হিসাবে এই হার ছিল ৮১ ভাগ। এখনো বাকি আছে ২৫ জেলা। এ বছরের মধ্যেই সব জেলাকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।


আরো সংবাদ