১৯ নভেম্বর ২০১৯
এগুলো হলো অর্থের অপচয় : ড. জাহিদ

‘লামসাম’ খরচই ৯৫ কোটি টাকা

-

দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অর্থ ব্যয়ের জন্য নানান নামে ব্যয়ের খাত সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্যান্য ব্যয়, অপ্রত্যাশিত ব্যয়, লামসাম ব্যয়। আর এসব ব্যয়ের অঙ্কও হতবাক করার মতো। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এগুলো হচ্ছে অর্থের অপচয়। ভারতীয় তৃতীয় এলওসি ঋণে পায়রা বন্দরে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে ৯৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে লামসাম ব্যয়। আর ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পরামর্শক খাতে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্পের এই লামসাম ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের আকার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। মাস্টার প্ল্যান ছাড়া নতুন এই বন্দরের দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বন্দরের প্রধান প্রকৌশলী জানান, মাস্টার প্ল্যানের কাজ চলছে। দ্রুতই তা চূড়ান্ত হবে। আর প্রকল্প ব্যয়ের বিষয়টি বুয়েট ও রয়েল হ্যাসকনিং করেছে।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তাদের খাতভিত্তিক ব্যয়ের আকার নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা থেকে আপত্তি জানানো হয়। পায়রা সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিচালনা আরো দক্ষ করতে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০১৯ সালেই স্বল্প পরিসরে পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের কার্যক্রম চালু করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের এই পদক্ষেপ। এই টার্মিনালের পাঁচ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২৭ কোটি টাকা। আর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে তিন হাজার ৯৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে বন্দরে প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প চলমান আছে। তবে পরিকল্পনা কমিশন এই ধরনের ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প না করে আগে মাস্টার প্ল্যান করার সুপারিশ করেছে বলে পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রের তথ্যানুযায়ী, বন্দরকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদিÑ এই তিন ভাগে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আছে বহির্নোঙরে ক্লিংকার, সার ও অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজ আনা-নেয়ার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন করা। আর মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ১০ মিটার গভীরতার চ্যানেল ড্রেজিং, একটি কনটেইনার, একটি বাল্ক ও একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে ১৬ মিটার ড্রাফটসহ বন্দরটি পরিপূর্ণভাবে পরিচালনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্যতম জরুরি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল। এই টার্মিনালের মাধ্যমে পাথর, বালু, কনটেইনার থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য খালাস করা হবে।
ব্যয় বিভাজন থেকে জানা গেছে, পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক শ’ কোটি টাকা। কিন্তু পরামর্শকের শিক্ষাগত যোগ্যতা সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। পরামর্শকদের জনমাস হিসেবে মানভিত্তিক বেতন-ভাতাদি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কমিশন বলছে, ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে জলযান কেনা হবে। এই জলযান কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে তার রেফারেন্স ডিপিপিতে সংয্ক্তু করতে হবে। জেটি নির্মাণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পাইল ডেক কাঠামো উপযুক্ত মর্মে সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় অভিজ্ঞতায় এই বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণে কনক্রিট পাইল কাঠামো নির্মাণ সমীচীন হবে বলে অভিমত দেয়া হয়েছে।
সরঞ্জামাদির মূল্যের তারতম্য বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, পায়রা বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা প্রকল্পে ৩৪ কোটি ৪৯ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটি বয়া লেইং ভেসেল, ২৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় একটি জরিপ বোট এবং ৩৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় একটি টাগবোটের দাম ধরা হয়েছে। আর প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রায় ৯ কোটি টাকা বেশিতে একটি বয়া লেইং ভেসেল, প্রায় ২৬ কোটি টাকা বা দ্বিগুণ দরে একটি জরিপ বোট এবং ৪০ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা দ্বিগুণ বেশি দরে ৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকায় একটি করে মোট দুইটি টাগবোট কেনা হবে। এই ব্যয় পার্থক্য অনেক বেশি। অন্য দিকে জলযানের কোনো স্পেসিফিকেশন ও ডিজাইন ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি।
টার্মিনালে পণ্য খালাসের সুবিধায় একটি মোবাইল হারবার ক্রেন, ১৮টি ট্রাক্টর, ৩৬টি ট্রেইলার, পাঁচটি ফর্ক লিফট ও ছয়টি ছোট ইয়ার্ড ক্রেন ক্রয় করা হবে। এক হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ মাল্টিপারপাস টার্মিনালে ব্যয় হবে ৫ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ ৪ হাজার ৪০১ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং সরকারি অর্থায়ন ৭৪৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। মূলত ভারতীয় ঋণেই নির্মিত হবে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল। প্রস্তাবনায় বলা হয় এই টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরো উন্নত করা হবে। আমদানি-রফতানিযোগ্য পণ্য নিরাপদে বড় জাহাজে আনানেয়া, পণ্যগুলো প্রত্যাশিত স্তরে আপগ্রেডসহ পরিবহন ও ব্যবসায় ব্যয় কমানোই অন্যতম লক্ষ্য। এই টার্মিনাল নির্মাণের ফলে বন্দর খাতে বাংলাদেশের অবস্থান সারা বিশ্বে আরো উন্নত হবে। চলতি অর্থবছর থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মেয়াদেই এই টার্মিনাল নির্মাণ করবে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।
প্রস্তাবনা ও কার্যপত্রে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ১২ শ’ মিটার প্রয়োজনীয় সুবিধাসহ ব্যাক-আপ জেটি নির্মাণ করা হবে। ৪.৮০ লাখ বর্গমিটার ব্যাক-আপ ইয়ার্ড নির্মাণ, ১০ কিলোমিটার সেøা প্রটেকশন কাজ, ৩৩ কেভি প্রধান বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ, ১০ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার লাইন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট, গ্যান্ট্রি ক্রেনের জন্য ২.৪ কিলোমিটার রেলাইন নির্মাণ, ৫ কিলোমিটার মহাসড়ক, মাঝারি সেতু নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং ৩৯০ টাকা, নাব্যতা সংরক্ষণে ১০০ কোটি টাকা, ৪০০ কোটি টাকায় সাইলো নির্মাণ, ১২ কোটি টাকায় ওয়াটার রিজার্ভার, সাড়ে ১৭ কোটি টাকায় মেডিক্যাল সেন্টার করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, পায়রাবন্দরের জন্য মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের আগে প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বলা হয়, গত ২০১৮ সালের ৮ জুলাই পিইসিতে জিওবি অর্থায়নে পায়রা বন্দরে প্রথম টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। আবার এখন একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হচ্ছে। দুইটিই পাশাপাশি হবে। একই রাস্তা দ্বারা মূল মহাসড়কে যুক্ত হবে। তাই প্রকল্পটিও জিওবিতে বাস্তবায়ন করা উচিত হবে। তবে এই মুহূর্তে দুইটি টার্মিনাল একই সাথে ব্যবহৃত হবে কি না সেটাও ভাবতে হবে। অন্য দিকে ১০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যরে সেতু নির্মাণ ও নদীর তীর সংরক্ষণে হাইড্রোলজিক্যাল, মরফোলজিক্যাল ও নেভিগেশনাল সমীক্ষার সুপারিশ করেছে কমিশন। যাতে বুঝা যাবে এই দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এ মুহূর্তে প্রয়োজন রয়েছে কি না। কারণ এখনো এই বন্দর ব্যবহারের চাহিদা ব্যবহারিক অর্থে নিরূপণ করা যাচ্ছে না।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী ওয়াসিফ আহমাদের কাছে লামসাম ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এই প্রকল্পের কস্টিং যৌথভাবে করেছে বুয়েট ও রয়েল হ্যাসকোনিং ডিএইচভি। পিইসি সভায় এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বুয়েটকে চিঠি দেয়া হচ্ছে। পরামর্শক খাতে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় কতজন পরামর্শকের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে দুই ধরনের পরামর্শক রয়েছে। ১ দশমিক ২ কিলোমিটার যে ব্যাকআপ জেটি নির্মাণসহ এলওসির অর্থায়নে যেসব কাজ হবে তার জন্য পরামর্শক। আর এদের জন্য ৮৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে ঋণের অর্থ থেকেই। পরামর্শক খাতে বাকি ১৫ কোটি টাকা যাবে জিওবি খাত থেকে। জিওবি অর্থায়ন থেকে জলযান কেনাসহ বেশি কিছু সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করা হবে।
এ দিকে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই ধরনের ব্যয়ের বিষয় সুস্পষ্ট থাকা দরকার। লামসাম নামে প্রকল্পে কোনো প্রভিশন আমি শুনিনি। সরকারি ডিপিপিতেও কখনো দেখিনি এই ধরনের ব্যয়ের খাত। আর পরামর্শকের ক্ষেত্রে কী ধরনের কাজে পরামর্শক লাগবে তা পরিষ্কার থাকা দরকার। তিনি বলেন, এগুলো হলো প্রকল্পের নামে অর্থের অপব্যবহার ও অপচয়। তিনি বলেন, পায়রা সমুদ্রবন্দরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সেখানকার নাব্যতা ধরে রাখা। যাতে জাহাজগুলো সঠিকভাবে নোঙর করতে পারে পণ্য খালাসের জন্য। ওই নাব্যতা ধরে রাখার কাজকে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার। যদি নাব্যতাই না থাকে, জাহাজগুলো পণ্য খালাসে টার্মিনালে পৌঁছতেই না পারে, তাহলে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল করে কী হবে? দেখা যাবে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালে জাহাজই ভিড়তে পারছে না নাব্যতার অভাবে।

 


আরো সংবাদ