১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

স্থিতির স্বার্থে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা উচিত

অভিমত বিশিষ্ট আইনজীবীদের
-

সারা দেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামে দায়েরকৃত হাজার হাজার মামলাকে হয়রানিমূলক বলে উল্লেখ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীরা। দেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এসব ‘গায়েবি মামলা’ বিশেষ বিবেচনায় প্রত্যাহার করা উচিত বলে তারা মনে করেন। আইনবিদরা বলেন, এসব মামলার পেছনে মহল বিশেষের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে কিছুই জানে না। এসব মামলার অধিকাংশ নাশকতার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা। আইনজীবীরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের দায়ের করা রাজনৈতিক মামলাগুলো বিশেষ বিবেচনায় প্রত্যাহার করেছিল। দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে করা মামলাও প্রত্যাহার করা উচিত।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এ বিষয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাদের কয়েক শ’ নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহার করে। খুনের মামলাও প্রত্যাহার করে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ বলে। দেশের উন্নতির জন্য স্থিতিশীল সরকার যেমন দরকার তেমনি গণমানুষের সমর্থনও দরকার। আওয়ামী লীগ পরপর দুটি নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়েছে সেটা ভিন্ন কথা। তবে এই নির্বাচনের আগে হাজার হাজার বিরোধী দলের নেতাকর্মীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় জড়িত করা হয়েছে। যার ফলে সারা দেশে এখনো হাজার হাজার মানুষ এসব মামলায় হয়রানি ও নির্যাতিত হচ্ছে। এর একটি প্রতিকার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সরকারের দেখা উচিত বলে আমি মনে করি।
খন্দকার মাহবুব বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অতি উৎসাহী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেসব ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এমনকি সাজা মাথায় নিয়ে যারা কারাগারে বন্দী থাকেন তাদেরও সাজা ক্ষেত্রবিশেষে রেয়াত দিয়ে মুক্তি দেয়া হয়। তাই আমি মনে করি দেশের বর্তমান অবস্থায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যে হাজার হাজার মামলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী করেছে ওইসব মামলা আইনি প্রক্রিয়ায় শেষ হতে বহু সময় প্রয়োজন হবে। তাই এই হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করে দেশে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ আনার একমাত্র পথ প্রশাসনিক আদেশে প্রয়োজনবোধে একটি কমিটি করে এই মামলাগুলো প্রত্যাহার করা উচিত। বিএনপি সরকারে নেই বর্তমান সরকারকেই উদ্যোগী হয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, একটি দলকে দমনের জন্য এরকম মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা অতীতে কেউ দেখেনি। মামলাগুলোর ধরন এমন যে মামলাগুলো উচ্চপর্যায় থেকে ঠিক করে দেয়া হয় এবং কিভাবে মামলা করলে বিএনপি নেতাকর্মীদের আটক ও হয়রানি করা যাবে সেটা তাদের জানা আছে। দেশের মানুষ এসব মামলায় আজ জর্জরিত। নির্বাচনের আগে ও পরে সব মিথ্যা মামলায় ২ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মামলা হয়েছে। নির্বাচনের পরে বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করেছে, নির্বাচনের পর হয়তোবা তারা এ ধরনের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু নির্বাচনী এলাকায় বিভীষিকাময় অবস্থা বিরাজ করছে। পুলিশের হয়রানির কারণে বহু লোক হৃদরোগে মারা গেছে। এটা হৃদয়বিদায়ক। এসব মামলার পেছনে মহল বিশেষের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে কিছুই জানে না।
জয়নুল আবেদীন বলেন, আমাদের বিচারব্যবস্থা আজ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, সরকার নি¤œ আদালতকে করায়ত্ত করে তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছা চরিতার্থ করছে। আদালতগুলো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিচারকসুলভ মনোভাব নিয়ে বিচার দিতে পারছে না। মানুষ মনে করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গেলে তারা অন্তত বিচার পাবে। সাময়িকভাবে উচ্চ আদালত আগাম জামিন দিচ্ছেন। কিন্তু যারা আগাম জামিন নিচ্ছেন তারা নি¤œ আদালতে আত্মসমর্পণ করলে এই জামিন বহাল থাকবে কি না। তারপরও সাময়িক প্রতিকারের জন্য দেশের দূরদূরান্ত থেকে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার মানুষ খেয়ে না খেয়ে হাইকোর্টের বারান্দায় ঘুরছে। আইনজীবীদের কাছে ধরনা দিচ্ছে কখন তাদের জামিন আবেদনের শুনানি হবে। আইনজীবীরাও চেষ্টা করেন কিভাবে এই অসহায় মানুষগুলোকে কিছুটা হলেও রিলিফ দিতে পারে। আদালত সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে আগাম জামিন দিয়ে থাকেন। মানুষগুলো এই সাময়িক রিলিফে সন্তুষ্ট হয়ে চলে যাচ্ছে, কিন্তু সামনে তাদের ভবিষ্যৎ কি তা তারা জানে না। একদিকে তাদের ভোটের অধিকার ডাকাতি করা হয়েছে, অন্যদিকে তাদের বাঁচার অধিকারও আজ হরণ করা হচ্ছে। কোথায় দাঁড়াবে মানুষ? দেশের এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে দেশকে বাঁচাতে হলে সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, সাধারণত সিআরপিসিতে রাজনৈতিক মামলাগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেহেতু এই ভৌতিক মামলাগুলো দায়েরের সাথে জড়িত তাই প্রত্যাহারের কোনো সম্ভাবনা দেখি না।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, একটি মামলা হলে নিয়ম অনুসারে তদন্ত হবে, চার্জশিট হবে, বিচার হবে। অপরাধ হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাইকোর্ট চার সপ্তাহের আগাম জামিন দিতে পারেন। তবে মামলা হলে নি¤œ আদালতে যেতে হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতি করতে যেয়ে যেসব অপরাধ করা বা পেট্রল বোমা মারা, বাস পোড়ানো এগুলো রাজনৈতিক মামলা নয়। তিনি বলেন, মামলা হতে পারে, ভুল হতে পারে; কিন্তু এ পর্যন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো মামলা হয়নি।
প্রসঙ্গত সারা দেশে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, আইনজীবীসহ প্রায় ৩ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৪ হাজার মামলার তদন্ত করতে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিশন চেয়ে রিটে বিভক্ত আদেশ দেন হাইকোর্ট। গত ৯ অক্টোবর বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো: আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদশ দেন। হাইকোর্ট বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশসহ রুল জারি করলেও বিচারপতি মো: আশরাফুল কামাল রিট খারিজ করে আদেশ দেন। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী আদেশে আইজিপিকে গায়েবি ও কাল্পনিক মামলাগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এসব মামলা কেন হলো তা তদন্ত করতে আইজিপিকে নির্দেশ দেয়া হয়। একই সঙ্গে এসব (গায়েবি ও কাল্পনিক) ফৌজদারি মামলা করা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং এ ধরনের কল্পিত মামলা দায়েরে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। তবে বিভক্ত আদেশ হওয়ায় নিয়ম অনুসারে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি সুরাহার জন্য হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চ (তৃতীয় বেঞ্চ) গঠন করে দেন। হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ রিটটি খারিজ করে দেন। প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ কয়েকজন আইনজীবী রিটটি দায়ের করেন।
এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সারা দেশে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার নাশকতার মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিএনপি। এসব মামলার ঘটনা ও অভিযোগ সম্পর্কে আসামিরা কিছুই জানে না। আর নাশকতার এসব মামলা থেকে প্রতিকার পেতে সম্প্রতি হাজার হাজার মানুষ হাইকোর্টে আগাম জামিন নিতে আসছেন।


আরো সংবাদ