শতবর্ষের ঝড়-ঝাপটা জয়

সোনারগাঁওয়ের 'বড় সরদার বাড়ি'র টিকে থাকার প্রাচীন প্রকৌশল রহস্য

​সুরকি-চুন আর কড়ি-কাঠের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক প্রাসাদের স্থায়িত্ববিদ্যা এবং আধুনিক স্থাপত্য কৌশলের রূপান্তর।

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল
সোনারগাঁওয়ের বড় সরদার বাড়ি
সোনারগাঁওয়ের বড় সরদার বাড়ি |সংগৃহীত
  • মোহাম্মদ ফাহাদ

​বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁওয়ের পাশেই লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে মহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক 'বড় সরদার বাড়ি'। প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার বর্গমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং ৮৫টি কক্ষবিশিষ্ট এই প্রাসাদটি কেবল এক জমিদার বংশের প্রাচুর্যের প্রতীক নয়, বরং প্রাচীন বাংলার জলবায়ু-বান্ধব ও নিখুঁত টেকটনিক স্থাপত্যের এক জলন্ত দৃষ্টান্ত। দেড় শতাধিক বছর ধরে বর্ষার আদ্রতা, ভূমিকম্প এবং আবহাওয়ার তীব্র পরিবর্তন সহ্য করে প্রাসাদটির টিকে থাকা আধুনিক সিভিল প্রকৌশলীদের জন্য এক অপার বিস্ময়।

​শতবর্ষ ধরে টিকে থাকার প্রাচীন প্রকৌশলগত ভিত্তি

​উনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত এই প্রাসাদটি কোনো আধুনিক রড বা সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ছাড়াই তৈরি করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এটি যুগ যুগ ধরে ধসে পড়েনি। এর পেছনে কাজ করেছে বিশেষ কিছু দেশীয় ও বৈজ্ঞানিক নির্মাণ পদ্ধতি:

​চুন-সুরকির গাঁথুনি ও পুডিং (Lime-Surkhi Mortar): ইটের গুঁড়ো (সুরকি) এবং পোড়াচুন মিশিয়ে তৈরি এই মসলা সময়ের সাথে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ক্যালসিয়াম কার্বনেটে রূপান্তরিত হয়। এটি সময়ের সাথে দুর্বল হওয়ার বদলে আরও শক্ত হয়ে ওঠে।

​জৈব প্রাকৃতিক সংমিশ্রণ (Organic Additives): মসলাকে ওয়াটারপ্রুফ এবং নমনীয় করতে ছাই, গুড়, অড়হড় ডাল, মেথি এবং ডিমের সাদা অংশ মেশানো হতো, যা আধুনিক প্লাস্টিকাইজার বা কেমিক্যাল এডমিক্সচারের কাজ করত।

​লোহার রডের পরিবর্তে কড়ি-কাঠের ছাদ (Burgah-Kori System): ছাদে লোহা বা রডের বদলে শাল বা মেহগনি কাঠের তৈরি ভারী কড়ি বা বর্গার ওপর পাতলা ইট বিছিয়ে তার ওপর চুন-সুরকি দিয়ে সংকুচিত করে ‘ছাদ পেটানো’ করা হতো। এটি প্রাকৃতিক তাপমাত্রার সাথে সংকোচন-প্রসারণ সামলাতে পারত।

​মোটা লোড-বেয়ারিং ওয়াল (Load-Bearing Wall): কোনো আরসিসি কলাম ছাড়াই প্রায় ২০ থেকে ৩০ ইঞ্চি পুরু দেওয়াল তৈরি করা হয়েছিল। এতে ওপরের ওজন সমভাবে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ত এবং ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে ঠাণ্ডা পরিবেশ বজায় থাকত।

​প্রাচীন প্রযুক্তির পরিবর্তে বর্তমানে ব্যবহৃত আধুনিক বিকল্প প্রযুক্তি

​সময়ের বিবর্তনে এবং শিল্পায়নের প্রসারে প্রাচীন এই প্রাকৃতিক নির্মাণ কৌশলগুলোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে দ্রুতগতির, টেকসই এবং উচ্চ সহনশীলতার আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তি:

​চুন-সুরকির মসলার পরিবর্তে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট (OPC/PCC): সুরকি ও জৈব উপকরণের দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার বদলে এখন ব্যবহার করা হয় দ্রুত জমাট বাঁধা পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট এবং উচ্চ কার্যক্ষমতাসম্পন্ন কেমিক্যাল এডমিক্সচার।

​কড়ি-কাঠের ছাদের পরিবর্তে আরসিসি (Reinforced Concrete Construction): মেহগনি বা শাল কাঠের বর্গার বদলে এখন ছাদ ও কাঠামো তৈরিতে টিএমটি (TMT) স্টিল রড এবং কনক্রিটের ঢালাই দিয়ে ভূকম্পন-সহনশীল আরসিসি বা প্রি-স্ট্রেসড কনক্রিট ব্যবহার করা হয়।

​পুরু লোড-বেয়ারিং ওয়ালের পরিবর্তে কলাম-বিম ফ্রেমড স্ট্রাকচার: ৩০ ইঞ্চি পুরু দেওয়ালের বাধ্যবাধকতা সরিয়ে এখন পাতলা ৫ ইঞ্চি ইটের দেওয়াল বা গ্লাস কার্টেন ওয়াল ব্যবহৃত হয়, যা আরসিসি বা স্টিল কলাম-বিমের কাঠামোর ওপর ভর করে থাকে।

​ঐতিহ্যবাহী চুন-সুরকির ওয়াটারপ্রুফিংয়ের বদলে পলিমারিক কেমিক্যাল মেমব্রেন: ডাল-গুড়ের ওয়াটারপ্রুফিংয়ের পরিবর্তে বর্তমানে অ্যাপক্সি কেমিক্যাল, পলিউরেথেন এবং আর্দ্রতারোধক কেমিক্যাল মেমব্রেন ব্যবহার করা হয়।

​ঐতিহ্য রক্ষা ও আধুনিকতার শিক্ষা

​কোরিয়ান বায়ো-প্রকৌশল কোম্পানি ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনের সহায়তায় সম্প্রতি বড় সরদার বাড়িটিকে বৈজ্ঞানিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ঠিক মূল নকশায় সংস্কার করা হয়েছে। প্রাচীন এই নির্মাণ পদ্ধতি কেবল ইতিহাস নয়, বরং আধুনিক প্রকৌশলীদের শেখায় কীভাবে ভারী কেমিক্যাল ছাড়া সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী