পর্দায় জেমস বন্ডের রাজকীয় চালচলন আর ফরাসি থ্রিলার সিরিজের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা—বাস্তবের গোয়েন্দা দুনিয়া নাকি ঠিক এই দুইয়ের মেলবন্ধন। দ্যা গার্ডিয়ান (৮ আগস্ট) জানিয়েছে, পর্দার গল্প কাল্পনিক হতে পারে, তবে ইউরোপের সেরা গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় ব্রিটিশ সংস্থা এমআইসিক্সের শীর্ষে উঠে আসার তথ্যটি একেবারেই বাস্তব।
ফরাসি সাময়িকী 'ল'এক্সপ্রেস' ইউরোপের সাবেক ও বর্তমান ৬০ জন গোয়েন্দার মধ্যে একটি গোপন ভোটাভুটির আয়োজন করেছিল। এর মধ্যে ১৭ জনই ছিলেন বিভিন্ন সংস্থার সাবেক বা বর্তমান প্রধান। ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের 'সিআইএ' ও ইসরাইলের 'মোসাদ'-এর সদস্যরাও এতে অংশ নেন। গোপন ওই ভোটে ২৫১ পয়েন্ট পেয়ে ইউরোপের সেরা গোয়েন্দা সংস্থার তকমা জিতে নিয়েছে যুক্তরাজ্যের এমআইসিক্স। ১৬৯ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থা 'ডিজিএসই'।
লন্ডনের ভক্সহলে এমআইসিক্স-এর সদর দপ্তরে এই অর্জন নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কোনো টু-শব্দ করেননি। বর্তমান প্রধান ব্লেজ মেট্রেভেলি নীরব বজায় রাখলেও পর্দার আড়ালে এক ধরনের নীরব সন্তুষ্টি কাজ করছে। কারণ, গোয়েন্দা দুনিয়ায় সুনাম বা সুনামের প্রভাব যে বিরাট বিষয়!
হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স ও দীর্ঘমেয়াদী খেলা
ল'এক্সপ্রেস-এর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, উপগ্রহ নজরদারি বা বার্তা আড়িপাতার যুগেও ব্রিটিশদের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে মানুষ দিয়ে তথ্য সংগ্রহ বা 'হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স'-এ। তারা কয়েক দশক ধরে মেধা আর ধৈর্য দিয়ে উচ্চপর্যায়ের গুপ্তচর তৈরি করে আসছে। একজন সাবেক ফরাসি গোয়েন্দা স্বীকার করেছেন, 'রাশিয়ানদের মতো ব্রিটিশদেরও দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কোনো উৎসের ওপর বাজি ধরার ধৈর্য আর ক্ষমতা রয়েছে।'

১৯৮৩ সালের চলচ্চিত্রে এমআইসিক্স-এর 'জেমস বন্ড' চরিত্রে রজার মুর
অবশ্য সমালোচকরাও রয়েছেন। কারো মতে, এমআইসিক্স-এর বর্তমান দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, আবার কেউ কেউ মনে করেন ব্রিটিশ আড়িপাতা ও তথ্যপ্রযুক্তি গোয়েন্দা সংস্থা 'জিসিএইচকিউ'-এর অবদান হয়তো এই মূল্যায়নে ঢাকা পড়ে গেছে।
ইতিহাসের রোমাঞ্চ ও বড় পতন
এমআইসিক্স-এর এই দীর্ঘ ঐতিহ্যে জড়িয়ে আছে শিহরণ জাগানো সব ইতিহাস। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে কেজিবি কর্মকর্তা ওলেগ গোরদিয়েভস্কিকে দলে টেনেছিল তারা। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে গোপন ফাঁদ নস্যাৎ করে নাটকীয়ভাবে ফিনল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে তাকে বের করে আনা হয়। এই গোরদিয়েভস্কির দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার বুঝেছিলেন যে, মিখাইল গর্বাচেভকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
সব মিশন অবশ্য সফল হয় না। ইরানের বেলায় এমআইসিক্সের জারিজুরি সুবিধা করতে পারেনি। দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, সাবেক উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলিরেজা আকবারি এমআইসিক্সের চর ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বও গোপনে পেয়েছিলেন। ২০১৯ সালে ইরানে ফিরে গ্রেপ্তার হন এবং ২০২৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ২০০৮ সালে ইরানের ফোরদো পারমাণবিক চুল্লির খবর ফাঁস হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে এমআইসিক্স-এর সুনাম মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছিল। সে সময় সাদ্দাম হোসেন '৪৫ মিনিটের মধ্যে' হামলা চালাতে পারেন—এমন তথ্য তৈরি করে তারা যুদ্ধের সপক্ষে সাফাই গেয়েছিল, যা পরে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও বন্ড জাদু
তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের ঠিক আগে এমআইসিক্স নিজেদের মান ফিরিয়ে আনে। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ-এর সাথে মিলে তারা নিখুঁতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করতে যাচ্ছে। যেখানে ফ্রান্স ও জার্মানির গোয়েন্দারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি রাশিয়ার আক্রমণের ঠিক আগের দিনও জার্মানির গোয়েন্দা প্রধান যখন ইউক্রেনের রাজধানী কিইভে পৌঁছান, তখন দেখে মনে হচ্ছিল—২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে, এমন কোনো বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র ধারণাই ছিল না!
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত 'ফাইভ আইজ' জোটের সাথে কাজ করার সুবিধা এমআইসিক্সকে আরো শক্তিশালী করে তুলেছে।
তবে রূপালী পর্দার পপ-কালচার জেমস বন্ডের প্রভাবকেও খাটো করে দেখার উপায় নেই। বহু বছর আগে যখন এক তরুণ ব্রিটিশ গোয়েন্দা দূর কোনো দেশে অপরিচিত উৎসের সাথে দেখা করতে যান, তখন তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে সেই লোকটির সাথে কথা বলার ভাষা কী হবে। ঘরে ঢোকা মাত্রই লোকটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, 'হ্যালো, মিস্টার বন্ড!'
গোয়েন্দা দুনিয়ায় এই একটা নামই অনেক দরজা সহজে খুলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।



