হালদা শুধু একটি নদীর নাম নয়, বরং একটি অর্থনীতির স্পন্দন

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল
  • ময়নুল সোহান

চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা একটি ছোট্ট ঝর্ণাধারা কীভাবে গোটা একটা দেশের মৎস্য অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে - হালদা নদীর কথা শুনলে এই প্রশ্নটাই প্রথমে মাথায় আসে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী পাহাড়শ্রেণী থেকে জন্ম নেওয়া এই নদী ফটিকছড়ি, হাটহাজারী আর রাউজান উপজেলার বুক চিরে বয়ে গিয়ে অবশেষে মিশেছে কর্ণফুলীর সঙ্গে। দৈর্ঘ্যে খুব বড় নয়, আশি কিলোমিটারের মতো - কিন্তু এই ছোট্ট নদীটিই আজ পরিচিত এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক কার্প মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে।

কেন হালদা এত আলাদা

পৃথিবীতে এমন নদী খুব কমই আছে যেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল বা কালিবাউশের মতো কার্প জাতীয় মাছ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, প্রাকৃতিক নিয়মেই ডিম ছাড়ে। হালদা তার মধ্যে একটি - বরং বলা ভালো, এটিই একমাত্র উদাহরণ। বর্ষার শুরুতে বজ্রবৃষ্টি আর জোয়ার-ভাটার একটা বিশেষ সমন্বয় ঘটলে নদীর পানির তাপমাত্রা, অক্সিজেনের পরিমাণ আর স্রোতের গতিতে এমন এক পরিবর্তন আসে, যা মা মাছদের ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে। মৎস্যবিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে রীতিমতো জীবন্ত জীবাশ্মের সঙ্গে তুলনা করেন, কারণ পৃথিবীর আর কোথাও এমন প্রাকৃতিক প্রজনন প্রক্রিয়া এত নিয়মিতভাবে ঘটতে দেখা যায় না।

অর্থনীতিতে হালদা এক প্রজন্মের নির্ভরতা

হালদাকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে, তা একদিনের নয় - প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক জীবিকার ধারা। ডিম ছাড়ার মৌসুমে নদীর তীরে সমবেত হন শত শত ডিম সংগ্রহকারী, যাঁদের পূর্বপুরুষরাও একই কাজ করে গেছেন। নৌকা, জাল আর মাটির কুয়া ব্যবহার করে তাঁরা নদী থেকে নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করেন, এরপর নিজস্ব পদ্ধতিতে সেই ডিম ফুটিয়ে রেণু তৈরি করেন। এই রেণু দেশের বিভিন্ন হ্যাচারি ও মাছ চাষের পুকুরে সরবরাহ হয়ে গোটা মৎস্য খাতকে সচল রাখে।

সংখ্যাটা শুনলেই বোঝা যায় হালদার গুরুত্ব কতটা। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, হালদার একটি একক মা মাছ থেকে বছরে গড়ে প্রায় চার কোটি টাকা সমমূল্যের পোনা উৎপাদন সম্ভব। শুধু ডিম আর রেণু উৎপাদনই নয়, এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হ্যাচারি ব্যবসা, নৌকা তৈরির কারিগর, জাল বোনার শিল্প, স্থানীয় বাজার আর পরিবহন খাত - সব মিলিয়ে একটা পুরো অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র। দেশের স্বাদুপানির মাছ চাষের একটা বড় অংশই আজও নির্ভর করে হালদার এই প্রাকৃতিক জিন ব্যাংকের ওপর, যা একে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

যে নদী শুধু মাছের নয়, সৌন্দর্যেরও

তবে হালদাকে শুধু মৎস্য সম্পদের হিসাবে বেঁধে ফেললে ভুল হবে। এই নদীর পানির প্রবাহ, তীরের সবুজ, আর মাঝে মাঝে ভেসে ওঠা গাঙ্গেয় ডলফিনের ঝাঁক - এই দৃশ্যগুলো যে কাউকে মুগ্ধ করবে। শুশুক নামে পরিচিত এই বিরল প্রজাতির ডলফিন একসময় বাংলাদেশের অনেক নদীতে দেখা যেত, এখন তাদের আশ্রয়স্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে - হালদা তাদের অন্যতম শেষ আশ্রয়। ভোরবেলা বা বিকেলের নরম আলোয় নৌকায় চড়ে নদী ঘুরে দেখা, স্থানীয় জেলে ও ডিম সংগ্রহকারীদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা - এসব অভিজ্ঞতা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অন্যরকম আকর্ষণ তৈরি করে।

হাটহাজারী ও রাউজানের বিভিন্ন ঘাট থেকে সহজেই নৌকা ভাড়া করা যায়, আর প্রজনন মৌসুমে (সাধারণত এপ্রিল-মে থেকে বর্ষার শুরু পর্যন্ত) নদীর তীরে গেলে দেখা মেলে ডিম সংগ্রহের জীবন্ত দৃশ্য, যা এক ধরনের সাংস্কৃতিক পর্যটনও বটে। স্থানীয় সংস্কৃতিতে হালদাকে ঘিরে গান, লোককথা আর প্রবাদও কম নেই - এই নদী চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে অনেকটা রক্তের মতোই। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে দাবি উঠছে হালদাকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার, যা বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রেও জায়গা করে নেবে এই নদী।

সংকট আর সম্ভাবনার মাঝামাঝি

কিন্তু বাস্তবতা হলো, হালদা আজ হুমকির মুখে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, শিল্পবর্জ্য আর দূষণ ক্রমেই কমিয়ে দিচ্ছে এই নদীর স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, হালদাকে বাঁচাতে হলে একে যতটা সম্ভব তার নিজস্ব প্রাকৃতিক নিয়মে চলতে দিতে হবে - ড্রেজিং, বাঁক কাটা বা পাড় থেকে মাটি সরানোর মতো কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

আশার কথা হলো, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নদীর কিছু অংশ খনন করে প্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, আর স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। হালদা শুধু একটা নদী নয় - এটি বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের প্রাণভোমরা, স্থানীয় মানুষের রুটি-রুজির উৎস, আর একইসঙ্গে প্রকৃতির এক বিরল উপহার, যা ঠিকমতো সংরক্ষণ করা গেলে অর্থনীতি আর পর্যটন - দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে দিতে পারে বাড়তি কিছু।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।