বরিশালের উজিরপুরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নের কথা উঠলেই সবার আগে আসে গুঠিয়ার সন্দেশের নাম। যা গরুর খাঁটি দুধের ছানা ও চিনির টক-মিষ্টি স্বাদ, টাটকা ঘ্রাণ এবং বিশেষ কড়াপাক ও অতুলনীয় স্বাদের কারণে বছরের পর বছর ধরে এটি মিষ্টিপ্রেমীদের রসনা তৃপ্ত করে আসছে। উপজেলার ছোট্ট জনপদ গুঠিয়া বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন এখন শুধু বরিশালের গর্বই নয়, বরং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি হিসেবে পরিচিত।
প্রতিদিন বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ শুধু এই সন্দেশের স্বাদ নিতে গুঠিয়া বাজারে ছুটে আসেন। ঈদ, পূজা, বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা প্রবাসে আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার; সব ক্ষেত্রেই গুঠিয়ার সন্দেশের আলাদা কদর রয়েছে।
গোড়ার কথা
গুঠিয়ার সন্দেশ তৈরির ইতিহাস শত বছরের চেয়েও বেশি পুরোনো। তবে আরো পুরোনো স্মৃতিতে উঠে আসে মনিন্দ্রনাথ ভদ্র (জুরান ভদ্র) এবং সতীশ চন্দ্র দাসের (খোড়া সতীশ) নাম। তাদের হাত ধরেই প্রায় একশ বছর আগে এ অঞ্চলে সন্দেশ তৈরি ও ব্যবসার সূচনা হয় বলে স্থানীয়দের ধারণা।
৬০ বছর আগে ১৯৬২ সালে সতীশ চন্দ্র দাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা থেকে সন্দেশ তৈরির বিশেষ কৌশল শিখে এসে গুঠিয়া বাজারে নিজের অভিজ্ঞতা ও রন্ধনশৈলীর সমন্বয়ে নতুন স্বাদের এক অনন্য সন্দেশ তৈরি শুরু করেন। অল্প সময়েই সেই সন্দেশ জনপ্রিয়তা পায়।
রেসিপি ও ব্যবসাগুলো আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে
পরে তিনি কলকাতায় চলে গেলেও তার রেখে যাওয়া রেসিপি ও ব্যবসাগুলো আমাদের ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত যত্নের সাথে টিকিয়ে রেখেছে। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজও একই স্বাদ ও মান ধরে রেখেছেন গুঠিয়ার মিষ্টি প্রস্তুতকারীরা।
দেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী রনজিৎ দাস জানান, তিনি তার মামা পরিমল ভদ্রের সাথে এই ব্যবসায় যুক্ত হন। সে সময় মাত্র ৩০ টাকা কেজি দরে সন্দেশ বিক্রি হতো। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে উৎপাদন খরচ বাড়লেও স্বাদের ঐতিহ্য অটুট রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই সন্দেশের আসল শক্তি হলো খাঁটি দুধের ছানা ও নিখুঁত প্রস্তুত প্রণালী। স্বাদের সাথে আমরা কখনো আপস করিনি।’
গুঠিয়ার সন্দেশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন প্রবীণ কারিগর বাদশা হাওলাদার। বর্তমানে তার ছেলে শাওন হাওলাদারসহ নতুন প্রজন্ম একই নিষ্ঠায় এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দক্ষ হাতে এখনো তৈরি হচ্ছে সেই পুরোনো স্বাদের বিখ্যাত সন্দেশ।
কেন এতো আলাদা গুঠিয়ার সন্দেশ?
গুঠিয়ার সন্দেশের বিশেষত্ব এর উপাদান ও প্রস্তুত প্রণালীতেই। এতে খাঁটি ছানা ও চিনি ছাড়া অন্য কোনো কৃত্রিম উপাদান কিংবা ময়দা ব্যবহার করা হয় না। প্রতিটি সন্দেশের ওপরে একটি করে কিশমিশ বসানো হয়, যা দেখতে অনেকটা ডালিতে সাজানো শিউলি ফুলের মতো।
এক কেজি ছানা তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ছয় থেকে সাত কেজি গরুর খাঁটি দুধ। এরপর সেই ছানার সাথে সমপরিমাণ চিনি মিশিয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হালকা আঁচে ধীরে ধীরে পাক দেয়া হয়। নিখুঁতভাবে পাকানো ছানা ও ক্ষীরের মিশ্রণ কাঠের ছাঁচে চেপে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী ও সুন্দর নকশার সন্দেশ। এছাড়া এখন দুধ এবং ছানার সাথে চিনির পরিবর্তে গুড় মিশিয়েও সন্দেশ তৈরি করা হয়।
ছানার পরিমাণ বেশি হওয়ায় সন্দেশটি শক্ত হলেও মুখে দিলেই সহজে গলে যায়। অতিরিক্ত মিষ্টি নয়, বরং পরিমিত মিষ্টতা এবং দুধের প্রাকৃতিক সুবাসই এটিকে অন্য সব সন্দেশ থেকে আলাদা করেছে।
দাম বেড়েছে, কমেনি চাহিদা
একসময় ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া গুঠিয়ার সন্দেশ বর্তমানে মানভেদে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ মানের সন্দেশের দাম প্রতি কেজি ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতি পিস সন্দেশ ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়। দাম বাড়লেও ক্রেতাদের আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং উৎসবের সময় আগাম অর্ডার ছাড়া অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ সন্দেশ পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
বরিশালের গর্ব, দেশের সম্পদ
স্থানীয়দের দাবি, গুঠিয়ার সন্দেশ শুধু একটি মিষ্টি নয়; এটি বরিশালের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। পর্যটকরা বরিশালে এসে যেমন দুর্গাসাগর, গুঠিয়া বায়তুল আমান জামে মসজিদ কমপ্লেক্স কিংবা অন্য দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন, তেমনি গুঠিয়ার সন্দেশের স্বাদ নেয়াকেও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন।
ঐতিহ্য, স্বাদ ও গুণগত মানের অনন্য সমন্বয়ে গুঠিয়ার সন্দেশ এখন বরিশালের একটি বিশেষ ব্র্যান্ড আইটেম। এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবায়েদুল হক চান বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও যথাযথ স্বীকৃতি পেলে গুঠিয়ার সন্দেশ আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে।’



