ঢাকা, সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭

প্রথম পাতা

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ঘাটতি ১০ বছরে চারগুণ

আমদানি ৫৯৭ কোটি রফতানি ১৬০ কোটি; ক্রমেই প্রতিকূলে যাচ্ছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য; বিনিয়োগকারী দেশের তালিকায় ভারত ৭ম

জিয়াউল হক মিজান

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৬০ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। ১০ বছরের ব্যবধানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসে ঘাটতির এ পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৯৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আট বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় চার গুণ। ক্রমেই বাংলাদেশের প্রতিকূলে যাচ্ছে বাণিজ্যিক ভারসাম্য। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩৩.৭৬ শতাংশ। যদিও এ সময়টায় ট্রানজিট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করার সুযোগসহ অনেক কিছু পেয়েছে ভারত। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক কেবলই দেয়ার। ত্যাগে আনন্দিত এ দেশের সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকেরা।
বাংলাদেশ-ভারত পণ্য বাণিজ্য তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ভারত থেকে পণ্য আমদানি হয়েছে ১৮৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার সমমূল্যের, যার বিপরীতে বাংলাদেশ রফতানি করেছে মাত্র ২৪ কোটি ২১ লাখ ডলারের। ওই অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ১৬০ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ২২২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য, যার বিপরীতে রফতানি করে ২৮ কোটি ৯৪ লাখ ডলার সমমূল্যের পণ্য। এ সময় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ১৫৩ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৩৩৮ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পণ্য, যার বিপরীতে রফতানি করে ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। ওই বছর বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ২৮৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য, যার বিপরীতে রফতানি করে ২৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৩২১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার সমমূল্যের পণ্য। সেই বছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক বৈষম্য এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পৌঁছে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০১০-২০১১ সালে বাংলাদেশ আমদানি করে ৪৫৭ কোটি ডলার মূল্যের পণ্যসামগ্রী এবং ভারতে রফতানি করে মাত্র ৫০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৬৫২ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আর ভারতে রফতানি করে ৫৫ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। এই বছরে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়াল ৫৯৭ কোটি ডলার, যা টাকার অঙ্কে প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত দণি এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ। শুধু বাংলাদেশই নয়, দণি এশিয়ার অন্য দেশগুলোয়ও ভারতের প্রচ্ছন্ন আধিপত্য রয়েছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে এক ধরনের অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে থাকে। এ েেত্র প্রতিবেশীর ন্যূনতম স্বার্থকেও ভারত মাঝে মধ্যে ছাড় দিতে রাজি হয় না। বাণিজ্য, অর্থনীতি সব দিক থেকেই ভারত আঞ্চলিক সংহতি ও বৃহৎ আঞ্চলিক স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজ দেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করে বেশি।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরী পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ মাত্র কয়েকটি পণ্য ভারত নেয়। অন্য দিকে পেঁয়াজ, মরিচ, আদা, জিরা থেকে শুরু করে মোটরযানসহ আড়াই শতাধিক পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। ২৫টি পণ্য বাদে অন্যগুলোয় শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে রফতানি আশানুরূপ বাড়ছে না। সাথে যুক্ত হয়েছে রাজ্য সরকারগুলোর তীব্র অনাগ্রহ এবং বাংলাদেশের রফতানিকারকদের স্বল্প প্রস্তুতি। মূলত ভারতের রণশীল বাণিজ্য নীতির কারণেই ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে। সাফটা চুক্তিতে বেশ কিছু পণ্যের ব্যাপারে শুল্ক হ্রাসের কথা বলা হলেও ভারত তা কার্যকর করছে না। বাংলাদেশের সাথে ভারতের এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় বলেও মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকায় প্রতিবেশী দেশটির সাথে বাংলাদেশের রফতানি-বাণিজ্য স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ভারতে যেসব কারণে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি ব্যাহত হয় তার মধ্যে রয়েছেÑ প্রতিটি চালানের ল্যাবরেটরি পরীা, পরীার ফল পেতে বিলম্ব, বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব শুল্ক, এন্টি ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ডিউটি ইত্যাদি। এর বাইরে রয়েছে স্থলপথে পণ্য রফতানির বাধা যেমন গুদামব্যবস্থার অপ্রতুলতা, রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, ভারতীয় কাস্টমসের স্বেচ্ছাচারিতা, পণ্যবাহী যানবাহনের পার্কিংয়ে অসুবিধা, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডের অপ্রতুলতা ইত্যাদি।
এ দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে জানান, ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি আট গুণ। তিনি বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশ গত পাঁচ মাসে পণ্য আমদানি করেছে ১৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকা আর রফতানি করেছে দুই হাজার ৭৪ কোটি টাকা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাথে অন্য দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৭৩ হাজার ৮৬ কোটি টাকা (৯৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বাণিজ্য সম্প্রসারণের ল্েয ৪৮টি দেশের সাথে চুক্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি দেশের সাথে দ্বিপীয় চুক্তি আছে। এ ছাড়া তিনটি দেশের সাথে চুক্তি করা হলেও তার কার্যকারিতা নেই। এ ছাড়া আরো সাতটি দেশের সাথে চলমান বাণিজ্যের পাশাপাশি সম্প্রসারণের চুক্তি রয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের অধীন সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে, যার পরিমাণ ১৮ কোটি ৯ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দণি কোরিয়া। দেশটির বিনিয়োগ ১৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তান। এ দেশে ২০১৪ সালে পাকিস্তানের বিনিয়োগ ১৩ কোটি সাত লাখ ডলার। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। এ সময়ে দেশটির বিনিয়োগ ১১ কোটি ৭১ লাখ ডলার। বিদেশী বিনিয়োগে পঞ্চম অবস্থানে থাকা হংকংয়ের বিনিয়োগ ১১ কোটি ৪১ লাখ ডলার। বাংলাদেশে শীর্ষ বিনিয়োগকারী এই পাঁচটি দেশের তালিকায় ভারতের নাম নেই। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিনিয়োগের েেত্র ভারতের অবস্থান ৯ নম্বরে। এ ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রত্যাশার বিপরীতপ্রাপ্তি। মূলত বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে ভারতে রফতানির মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতীয়রা এ দেশে বিনিয়োগ করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। উৎপাদিত পণ্য ভারতে রফতানি করার পরিবর্তে এ দেশের বাজার ধরতেই বেশি ব্যস্ত ভারতীয় কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম নয়া দিগন্তকে বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিশাল এ ঘাটতি দীর্ঘ দিনের। আশঙ্কার দিক হলো, ঘাটতির এ পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ঘাটতি কমানোর জন্য চোখে পড়ার মতো কিছু উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। কমিয়ে আনা হয়েছে স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এ জন্য আমাদের বুঝতে হবে ভারত সরকার সত্যি সত্যিই চায় কি না বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধি পাক। আর যদি তাই হয়, এমন সুবিধা দিতে হবে যেগুলো গ্রহণ করার ক্ষমতা আমাদের রফতানিকারকদের আছে। আবার এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে, যা টপকে যাওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের রফতানিকারকদের নেই। অন্যথায় ব্যবধান বাড়বেই।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫