ঢাকা, শুক্রবার,০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

চীনের বিশ্ব ব্যাংক ও দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে ইমেজ

গৌতম দাস

০৩ জানুয়ারি ২০১৬,রবিবার, ১৬:৪৯


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

এআইআইবি-চীনের বিশ্ব ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত নাম। সংক্ষেপ ভাঙলে চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের পুরা নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি শুধু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য ব্যাংকই নয়, বলা হয়ে থাকে এআইআইবি জাপান-আমেরিকার নেতৃত্বের এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও প্রতিদ্বন্দ্বী। এখানে নেতৃত্ব কথাটার অর্থ সবচেয়ে বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার ওই রাষ্ট্র, ফলে গঠন ও পরিচালনে সে রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসে গেছে যে, এই ব্যাংকের অপারেশন বা কার্যকারিতা শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, সম্ভবত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে এ মাসেই, ১৬-১৮ জানুয়ারি। 

ও দিকে নতুন এক ইস্যু কয়েক বছর ধরে আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করে সব প্রসঙ্গের মধ্যেই বিঁধতে দেখা যাচ্ছে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর-সমুদ্রপথে চীনের একমাত্র প্রবেশদ্বার। আসলে এই সাগর চীনের কেবল দক্ষিণে নয় বরং পূর্ব অবধিও বিস্তৃত। পূর্বের অংশকে আলাদা করে পূর্ব চীন সাগর বললেও সাগরের দক্ষিণ অংশ আর পূর্ব অংশ এ দুইয়ের মাঝে কোনো দেয়াল বা বিচ্ছেদ নেই। আর প্রবেশদ্বারের মুখ এলাকা হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর অংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশপাশে পড়শি রাষ্ট্রের ভিড়ভাট্টা দক্ষিণ দিকে বেশি। তাই দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কটা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক নামেই পরিচিত। এই দক্ষিণ-পূর্ব কোণটা ছাড়া চীনের সীমান্তের বাকি সব দিক দিয়েই স্থলাবদ্ধ,ল্যান্ড লকড।

এটা আজ সবাই জেনে গেছেন, দিনকে দিন চীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আমেরিকাসহ সবাইকে সব বিচারে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে অথবা ইতঃমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আজ চীন যেমন প্রায় সব বিবেচনায় আমেরিকাকে ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে ১৮৮০ সালে আমেরিকান অর্থনীতি আকারের দিক থেকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ের মধ্যে সব বিবেচনাতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার ওপরে আমেরিকা উঠে যায়। উত্থানের যুগে সেকালের আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রে সমুদ্রপথের প্রবেশের ক্ষেত্রে আশপাশের প্রতিটা সমুদ্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভুগোলের মানচিত্রে আমেরিকার ল্যান্ড লকড উত্তর দিক ছাড়া পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগর, পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগর। কিন্তু দু’দিকের দুই মহাসাগর নিচের দিক এসে মানে আমেরিকার দক্ষিণে এসে দুই মহাসাগর পরস্পরের দিকে প্রবলভাবে এগিয়ে এসেছে যেন মিলে যাবে। কিন্তু শেষে না মিলে দুই মহাসাগরের মাঝখানে চিকন এক ভূমি-অঞ্চলের ফারাক রেখে দিয়েছে। ওই চিকন ভূমি অঞ্চলের শুরুতে মেক্সিকো রাষ্ট্র ও এরপর ক্রমেই নিচে ক্যারিবিয়ান দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর অবস্থিতি। সে কারণে এদের পূর্ব পাশের সাগর-অঞ্চলের নাম মেক্সিকো উপসাগর ও ক্যারিবিয়ান সাগর। এই হলো মোটামুটি আমেরিকার ভূমির তিন পাশের সমুদ্র-ভূগোল। এখন সেকালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু রাষ্ট্র হলো ইউরোপ; যাদের অবস্থান, আমেরিকার পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগরের অপর পাড়ে। ফলে সমুদ্রপথে মেক্সিকো উপসাগরসহ বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে আনাগোনা থেকে ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে দূরে রেখে তা কেবল আমেরিকার জন্য অবারিত (একক রাষ্ট্রের জন্য এই অবারিত নৌ-অঞ্চলের ধারণা থেকেই মেরিন ব্লু-ওয়াটার ধারণাটা এসেছে)। ব্লু-ওয়াটার নেভিগেশন অঞ্চল নিশ্চিত করেছিল আমেরিকা। যাতে উদীয়মান আমেরিকার অর্থনীতিতে আমদানি ও রফতানির কাঁচামাল ও পণ্যের নৌ-চলাচল অবাধ ও ভয়শূন্য থাকে। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের ত্রিশের দশকজুড়ে এবং এর পর থেকেই আমেরিকার জন্য তা নিশ্চিত করে রেখেছিলেন।

আমেরিকান এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে অনুষঙ্গ হিসেবে ওই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সমুদ্র-চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া জাহাজের বাধাহীন, ভয়হীন ‘ব্লু-ওয়াটার’ নেভিগেশন এলাকা পাওয়ার, নির্ভয়ে জাহাজ চলাচলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ কারণে এ বিষয়টাকে দুনিয়াতে অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া রাষ্ট্র যে কোনোভাবে হোক নিজের জন্য নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে।

আজ চীনের প্রবেশপথ দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের অবস্থানও সে রকম। সে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবাধ নৌবাণিজ্য জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ দক্ষিণ চীন সাগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক দ্বীপের মালিকানা দখলে নিতে ও রাখতে মারমুখী হয়ে উঠেছে। আর তা থেকে চীন পড়শি রাষ্ট্রগুলোর প্রায় সবার সাথে দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। সামরিক-কূটনৈতিক উত্তেজনা মারাত্মক হয়েছে কয়েক বছর ধরে। জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ইত্যাদির সাথে ছোট-বড় দ্বীপ মালিকানা বিরোধ সবার সাথে তৈরি হয়েছে। এ বিরোধের সুযোগে আমেরিকা বিরোধী রাষ্ট্রগুলোকে তাল দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে বলে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছে। আমেরিকার এশিয়া নীতির মূল প্রতিপাদ্যই এটা। ফলে দক্ষিণ চীন সাগর শব্দটা হয়ে উঠেছে যেন দ্বীপ মালিকানা বিরোধের প্রতীক। চীনা নেতৃত্বের এআইআইবি উদ্যোগে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে, অন্তত অংশগ্রহণে দ্বিধা করার ক্ষেত্রে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ বিষয়টি অনেকের কাছেই তাই একটা ইস্যু।

তা হলে চীনের বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে উত্থানের সাথে আমরা দুইটা ইস্যু এআইআইবি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক জড়াজড়িভাবে হাজির হয়েছে দেখতে পাচ্ছি, যার একটা অন্যটার ওপর প্রভাব ফেলার অবস্থা তৈরি করছে মনে হচ্ছে। যেমন এখানে প্রশ্ন হলো, চীনের কোনো পড়শি রাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে চীনের সাথে জড়িয়ে গেছে সে কি একই সাথে চীনের নেতৃত্বে এআইআইবি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে?

চীনের তেমনই এক পড়শি ফিলিপাইন। দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে ফিলিপাইনের অবস্থান চীনের আর সব দ্বীপ মালিকানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়া পড়শিদের মতোই। কেবল বাড়তি দিকটা হলো, ফিলিপাইন ইতোমধ্যে সমুদ্রাঞ্চল মালিকানা-বিষয়ক বিতর্ক মীমাংসার প্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ডের হেগে ‘আন্তর্জাতিক সালিশ ট্রাইব্যুনালে’ অভিযোগ দায়ের করেছে। এ কারণে ফিলিপাইন এআইআইবি ব্যাংকে যোগদান-বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বেশি। এআইআইবির উদ্যোক্তা সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ইচ্ছা প্রকাশ করে ফিলিপাইন স্বাক্ষর করেছিল আগেই। কিন্তু ব্যাংকের মালিকানা শেয়ার কেনার জন্য তার ভাগে পড়া শেয়ার মূল্য ১৬৫ মিলিয়ন ডলার যেটা পাঁচ বছরে কিস্তিতে জমা দিতে হবে তা দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িয়ে সে এখনো পরিশোধ করেনি । এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর শেষ দিন ছিল গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫। আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ব্লুমবার্গ ও সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের ৩০ ডিসেম্বরের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ফিলিপাইনের পরিপূর্ণভাবে যোগদানের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্তের খাতায় তাদের প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করেছেন। ওই সিদ্ধান্তের পর ফিলিপিনো অর্থসচিব এটাকে ব্যাখ্যা করে যা বলছেন তার সারকথা হলো, এআইআইবি ব্যাংকের ঋণ পাওয়া ফিলিপিনো অর্থনীতির বিকাশের জন্য খুব জরুরি গণ্য করে অর্থনৈতিক বিবেচনাকে মুখ্য করে সে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই মিডিয়া রিপোর্টে সেই সাথে এক চীনা মুখপাত্রের বরাতে এ বিষয়ের এক মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘ফিলিপাইন বা কোনো সদস্য রাষ্ট্র ঋণ পাবে কি না সেটা এআইআইবি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের গঠনতন্ত্র ও ম্যান্ডেটে যেভাবে লেখা আছে, যেটা সব সদস্য রাষ্ট্র মিলে ইতোমধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে লিখেছে, তা অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

অর্থাৎ প্রকারান্তরে বলা হলো যে, চীনের সাথে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের কোনো বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে ফেলে রেখে, ব্যাংকের ম্যান্ডেটই লোন পাওয়া বা না পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনার ভিত্তি হবে। নিঃসন্দেহে তাই হওয়া উচিত। রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ নিয়ে পারস্পরিক বিবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই একটা ভালো পথ। এখন বাস্তবে অপারেশনের সময় এআইআইবি ব্যাংকের পরিচালনায় তা প্রতিফলিত হতে দেখার অপেক্ষা করতে হবে আমাদেরকে।

ন্যায়-ইনসাফের সাথে থাকা
মানুষে মানুষে স্বার্থবিরোধ আছে। এ ছাড়া পরিবার পড়শি সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যেও স্বার্থ বিরোধ হয়ে নানাভাবে তা হাজির হয়, হওয়ারই কথা। তবে সমস্যা স্বার্থবিরোধ থাকা নয়, সমস্যা হলো স্বার্থবিরোধ মীমাংসার উপযুক্ত উপায় বা পথ বের করতে না পারা। মানুষ বা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধগুলোর মোটাদাগে দু’ভাবে সমাধান হয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। এর একটা হলো বলপ্রয়োগ। অর্থাৎ বলশালীর ইচ্ছার পথে মীমাংসাকে চাপে ফেলে দুর্বলের ওপর চাপিয়ে দেয়া। আর একটা হলো, একটা ন্যায়নীতির সাহায্যে বা ইনসাফের ভিত্তিতে বা সেই ফর্মুলায় বিরোধ মীমাংসা করা। প্রথমটার ক্ষেত্রে কোন দুর্বল ভবিষ্যতে কোনো কারণে সবল হয়ে উঠলে সেও একই ফর্মুলায় পাশা বদলে দিতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে সব সময় এমন এক বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাকে মাথায় নিয়েই চলতে হয়। এর তুলনায় দ্বিতীয়টার সুবিধা হলো, এমন সম্ভাবনা এখানে থাকে না, এটা স্থায়ী। দীর্ঘ পথপরিক্রমা, দীর্ঘ সময় ধরে চলতে চাইলে, চিরস্থায়ী হতে চাইলে স্বার্থবিরোধ মীমাংসায় ন্যায়নীতি ইনসাফের বিকল্প নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে শুরু হয়ে দুনিয়াকে এক সাম্রাজ্যের মতো করে পরিচালনার সুযোগ হাতে পেয়েছিল বা নিয়েছিল আমেরিকা। আজ দিনকে দিন দুনিয়া-সাম্রাজ্য পরিচালনার মুরোদ আমেরিকা হারিয়ে ফেলছে। আর এর জায়গা নিতে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে চীন এক বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও আমেরিকার হাতে দুনিয়া-সাম্রাজ্য পরিচালনার ভিত গড়ার কাজটা ঘটেছিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে। বিষয়টা তিনি যেভাবে কল্পনায় আগাম দেখে বা ভিজুয়ালাইজ করে এগিয়ে নিয়েছিলেন আর পরে তা বাস্তবে যা হয়ে হাজির হয়েছিল তা একেবারেই আলাদা। তার স্বপ্নের হবু জাতিসঙ্ঘ ছিল রাষ্ট্র স্বার্থগুলোর বিরোধে মধ্যস্থতাকারী আর বিরোধ মীমাংসার নীতি, কনভেনশন ঐকমত্য ইত্যাদি দাঁড় করানোর এক উদ্যোগী প্রতিষ্ঠান। চতুর্থবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পরের ছয় মাসের মধ্যে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। ফলে বাকি সাড়ে তিন বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। পরের ১৯৪৮ সালের নির্বাচনেও হ্যারি ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই মোট সাড়ে সাত বছর ট্রুম্যান রুজভেল্টের নীতি স্বপ্নের ভিত্তিতে তার সরকারের নীতি পরিচালিত করেছিলেন; ফলে জাতিসঙ্ঘ গঠনের স্বপ্ননীতিও সেভাবে তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ওই সময়ের নতুন করে রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো মার্চ ১৯৫১ সালের ইরানে অ্যাঙ্গলো-পারসিয়ান তেলের খনি নিয়ে বিতর্ক। বিতর্কের মূল বিষয় ইরান ওই তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করেছিল আর ব্রিটিশ কোম্পানি মালিকেরা এ ঘটনাকে ‘অবৈধ’ মনে করেছিলেন। ট্রুম্যান সত্যসত্যই নিজের প্রশাসন, কূটনীতি এবং জাতিসঙ্ঘকে এই বিরোধে মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, রুজভেল্টের জাতিসঙ্ঘ স্বপ্ননীতিতে। ব্রিটিশ সরকারের সামরিক হস্তক্ষেপের পরামর্শ ট্রুম্যান নাকচ করেছিলেন এবং তার জন্যই তা আটকে যায়। কিন্তু আপস মীমাংসার বহু দেন-দরবার আলোচনা চলা অবস্থায় ট্রুম্যানের প্রেসিডেন্সির সময়কাল শেষ হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালে নতুন প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ক্ষমতায় এসে ইরানে সিআইএ পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করে শাহের রাজতন্ত্রকে পুনর্বাসিত করেছিলেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবার তেলের খনিগুলো থেকে তেল তোলার অধিকার ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়া হয় কেবল ব্রিটিশ কোম্পানি নয়, সাথে আমেরিকা, ডাচ-নেদারল্যান্ড ও ফ্রান্সের কোম্পানির এক কন্সোর্টিয়ামে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমেরিকা দুনিয়া-সাম্রাজ্য পরিচালনায় আসলে কী ভূমিকা নিতে চায় তা একেবারে স্পষ্ট হয়ে যায়; সেটা হলো, মধ্যস্থকারী থেকে বানরের রুটি ভাগকারী। অনেকে হয়তো এটাকেই আমেরিকার ‘সাম্রাজ্যবাদী’ ভূমিকা বলে চিনাতে চায়।

পালাবদলে আগামীতে চীন যদি আমেরিকার জায়গাটা নিতে চায় বা পায় সে ক্ষেত্রেও চীনকে- সে কী ভূমিকা নিতে চায় এর পরিকল্পনা করতে হবে, দেখাতে হবে। দুনিয়া থেকে অসম সম্পর্ক, জবরদস্তি, অসম লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়- এগুলো রাতারাতি বদলে যাবে না। কিন্তু অন্তত আমেরিকা যে ভূমিকা নিয়ে এত দিন চালিয়েছে সেটারই কপি অথবা সেটার চেয়ে খারাপ কোনো ভূমিকা চীন নিলে তা নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য ও অচল বলে সবার কাছে মনে হবে। কিন্তু এসব বিষয়ে চীনের অবস্থান কতটা ভালো, কোন কোন ক্ষেত্রে কী উপায়ে তা- এসব বিষয়গুলো আমাদের কড়া নজর রেখে আগামীতে বুঝতে হবে।

বর্তমান দ্বীপ-মালিকানা বিতর্কে আমেরিকার নেয়া অবস্থান চীনের চেয়ে সুবিধাজনক। আমেরিকা বলছে, জাতিসঙ্ঘের অধীনে প্রচলিত সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার যে প্রতিষ্ঠান আছে তার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করতে হবে। বিপরীতে চীনের অবস্থান আপাতত কোনো নীতির দিকে নয়, তবে কোনো এক পুরনো ম্যাপের বরাতে ওই এলাকার দ্বীপগুলোতে নিজের মালিকানার দাবির ওপর দাঁড়িয়ে সে বলপ্রয়োগকারী বলে হাজির হয়েছে। ফলে অন্তত আপাত দেখা নীতি, নৈতিকতার লড়াইয়ে আমেরিকার ইমেজ চীনের চেয়ে ভালো, এ দিক বিচারে চীনের জন্য এই ইস্যুটি খুবই বিপদের। যদিও আপাত এসব প্রকাশিত ঘটনা থেকে চীনের সম্পর্কে চূড়ান্ত কিছু বলার, সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু একটা ন্যায়নীতি ইনসাফের ভিত্তি দাঁড় করানোর স্বপক্ষে যে চীনকে দাঁড়াতে হবে সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। চীনকে অবশ্যই দেখাতে হবে সে দুনিয়াতে (প্রচলিতের সম্পর্কের চেয়ে) এক তুলনামূলক ভালো বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক হাজির করার পক্ষে, তা দিতে সক্ষম।

[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫