ঢাকা, শুক্রবার,০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

ধর্ম-দর্শন

ইসলামবিহীন বিশ্ব

গ্রাহাম ই ফুলার

০২ জানুয়ারি ২০১৬,শনিবার, ১৮:০৭


প্রিন্ট

ইসলাম ও মুসলিম এখনকার বহুল আলোচিত দু’টি শব্দ। সমাজতন্ত্র পতনের পর ইসলামকেই
পাশ্চাত্যের সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের অনেকেই ইসলামকে বর্তমান
সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে অভিহিত করছে। অনেকে তো ইসলামকে
সন্ত্রাসবাদের প্রতিশব্দ হিসেবেও উল্লেখ করছে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাশ্চাত্যের আগ্রাসন,
ভুলনীতির কারণেই ক্ষুব্ধ হচ্ছে মুসলিমরা। এমন এক প্রেক্ষাপটেই গ্রাহাম ই ফুলারের ‘এ ওয়ার্ল্ড
উইথআউট ইসলাম’ বইটি অনুবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। লেখক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা
সিআইএ’র ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, র‌্যান্ডের সাবেক
সিনিয়র রাজনীতিবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে সাইমন ফ্রেসার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাজাঙ্কক্ট প্রফেসর।
তিনি প্রায় দুই যুগ মুসলিম বিশ্বে বসবাস করেছেন, কাজ করেছেন। এ বইয়ের প্রতিটি বক্তব্য
লেখকের একান্ত নিজস্ব। এখানে কেবল অনুবাদ করা হয়েছে। এর ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ
হাসান শরীফ
(গত সংখ্যার পর)

আরব দেশ
এমনকি আরব ভূখণ্ড নিজেও কোনো বিচ্ছিন্ন স্থান ছিল না, বরং ধর্মীয় চিন্তাধারা ও উত্তেজনার
তীব্র আঞ্চলিক আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল। আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম
কোণে থাকা ইয়েমেন ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতাকেন্দ্র এবং সম্ভবত সেমেটিক সব
জনগোষ্ঠীর আদি বাসস্থান। সেমিটিক উপজাতিগুলো সেখান থেকে প্রথমে মেসোপটেমিয়ায় যায়,
বিসিইতে (প্রচলিত সাল গণনার আগে) সুমেরিয়া জয় করে সেটাকে সেমিটিক সংস্কৃতিতে
রূপান্তরিত করে। লোহিত সাগর উপকূল থেকে মিসর, সিরিয়া (লেভেন্ট) এবং ভূমধ্যসাগরীয়
(মেডিটেরানিয়ান) এলাকাজুড়ে সমৃদ্ধ মসলা ও বস্ত্র ব্যবসা ছিল। আদিকাল থেকে ইয়েমিনিদের
সাথে ফিনিশীয়দের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেবার রানী ইয়েমেনে বাস
করতেন, ইথিওপিয়ার অক্সাম রাজ্যের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। ইয়েমেনে খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের
বিপুল জনগোষ্ঠী ছিল। কিছু সময় সেখানে পারসিকরা (ইরানি) ছিল।
আরো উত্তরে লোহিত সাগর উপকূলে (হিজাজ) থাকা চার হাজার বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ মক্কা
ছিল আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলোর অন্যতম। নবী হজরত মুহাম্মদের সা: সময় পর্যন্ত
প্রাচীন ইতিহাসগুলোতে মক্কার ঐতিহাসিক উল্লেখ (অন্তত বাইরের সূত্রগুলোতে) দেখা যায় অতি
সামান্য। তবুও নগরীটি সিরিয়াগামী লোহিত সাগরীয় বাণিজ্য রুটে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে
পরিণত হয়েছিল। হিজাজের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী বিশেষ করে মদিনায় উল্লেখযোগ্য
সংখ্যক ইহুদি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ছিল। বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টান ভূখণ্ড ছিল ঠিক উত্তরে,
বর্তমানে সিরিয়া ও জর্ডান ছিল এর প্রধান দু’টি কেন্দ্র।
আরব দেশ অনেকটা আদিকালের ইহুদিসহ অন্যান্য সেমিটিক জনগোষ্ঠীর মতো স্থানীয় বা
গোত্রীয় দেব-দেবীদের নিয়ে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ধর্ম বিকশিত করেছিল। প্রার্থনার প্রধান কেন্দ্র
ছিল মক্কার কাবায়, সেখানে ছিল প্রায় ৩৬০টি দেবতার অবস্থান। এমনকি যিশু ও মেরির (হজরত
ঈসা আ: এবং মা মরিয়ম) মূর্তি ছিল বলেও প্রচলিত রয়েছে। ধর্মীয় স্থাপনাগুলো মক্কাকে বেশ
ভালোরকম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়েছিল : উপদ্বীপের জটিল আন্তঃগোত্রীয়
রাজনীতি তদারকি এবং উপজাতীয় যুদ্ধ সীমিত করার লক্ষ্যে গঠিত বিশাল গোত্রীয়
কনফেডারেশনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই অঞ্চল দিয়ে বাণিজ্য অব্যাহত রাখার
জন্য নগরীটি বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে সন্ধিভিত্তিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলত। মক্কার সমৃদ্ধি
ছিল নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার প্রত্যক্ষ উৎস, একই সাথে তা নতুন কিছুর জন্য
শূন্যতাও সৃষ্টি করেছিল। কারণ উদীয়মান পুঁজিবাদী বাজারভিত্তিক অর্থনীতির চাপে পুরনো
গোত্রগত কাঠামো ও বংশগত সমর্থনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছিল; পুরনো সামাজিক মূল্যবোধ ম্লান হয়ে
যাচ্ছিল।
এমনই ছিল ৬১০ সালে মক্কার তরুণ বণিক হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওহি লাভ করে
একেশ্বরবাদী ধারণার চলমান প্রবাহে নতুন অধ্যায় যোগ করার সময় ভৌগোলিক ও
ধর্মতাত্ত্বিকভাবে এলাকাটির অবস্থা। শৈশবে হজরত মুহাম্মদ সা: এতিম হয়েছিলেন, তিনি তাঁর
চাচার সাথে ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, ৪০ বছর বয়সে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতায় পর্বতের গুহায়
ধ্যান করার সময় বেশ নতুন এক অভিজ্ঞতা লাভ করেন : কয়েকবার তাঁর কাছে আসা ফেরেশতা
জিব্রাইল আল্লাহর কাছ থেকে আনা বাণী তাঁকে অবগত করেন। তাঁকে আল্লাহ এক- এই বাণী
প্রচার করতে বলা হয় এবং এই বাণী আঞ্চলিক গোত্রগুলো এবং পৌত্তলিক ও বহু দেবতায়
বিশ্বাসী মক্কার কলুষিত সমাজে পৌঁছাতে বলা হয়। হজরত মুহাম্মদ সা: ওই বাণী প্রচার এবং
নির্দয় ও বৈষম্যপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থা এবং মক্কার কর্তৃত্ব ও বাণিজ্যের প্রধান প্রতীক কাবায় বহু
ঈশ্বরবাদের এসব দেবতার পূজনীয় উপস্থিতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে উদ্যোগী হন। যিশু
ও মহাজনেরা ছিল তার আশু লক্ষ্য। তবে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর রাজনৈতিক ভিশনও ছিল।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হজরত মুহাম্মদ সা: শুরুতেই ইসলামে প্রথম নবী হজরত আদম
আ: এবং হজরত ইব্রাহিম আ:সহ তাওরাতে (ওল্ড টেস্টামেন্ট) বর্ণিত অতীত নবীদের সারিতে
নিজেকে স্থাপন করেন। বস্তুত এসব ওহি নিয়ে গ্রন্থিত পবিত্র কুরআন এসব ব্যক্তিত্বকে ‘প্রথম
মুসলমান’ হিসেবে শনাক্ত করে, যদিও প্রচলিত ধারণা অনুসারে তারা তা ছিলেন না। অবশ্য ওই
সময়ের মুসলিম হিসেবে তাদের পরিচিত করানো হয় স্রেফ এ কারণে যে তারা ছিলেন আল্লাহর
একত্ব ও ক্ষমতার অভিজ্ঞতা ও স্বীকারকারী প্রথম মানুষ। হজরত মুহাম্মদ সা: জোর দিয়ে বলেন,
তিনিও আল্লাহর রাসূল ও নবী ছাড়া আর কিছুই নন, তার কোনো খোদায়ি প্রকৃতি নেই। বস্তুত,
ওই অঞ্চলের লোকজনের কাছে তাঁর বাণী নাটকীয়তাপূর্ণ নতুন কিছু ছিল না, বরং তা ছিল
আল্লাহর একত্ববাদের শাশ্বত বাণী নতুন আকারে প্রবল কণ্ঠে ঘোষণা। হজরত মুহাম্মদ সা: স্পষ্ট
ও দ্ব্যর্থহীন একটি ধর্মতত্ত্ব ঘোষণা করলেন, ছয় শ’ বছর ধরে প্রাচ্যের খ্রিষ্টান ধর্মের ধর্মতাত্ত্বিক
কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যিশুর প্রকৃতি সম্পর্কিত দুর্বোধ্য ও সাংঘর্ষিক তত্ত্বগুলো নাকচ করে দিলেন।
তিনি নৈতিক সমাজ গঠনের জন্য আল্লাহর নির্দেশে ফিরে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিলেন। ইসলাম
গ্রহণের নির্দেশিকা ছিল খুবই সহজ : নবাগতদের কেবল বিশুদ্ধ হৃদয়ে এই সাক্ষ্য দেয়ার দরকার
হতো : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ- ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো প্রতিপালক নেই,
মুহাম্মদ তাঁর বার্তাবাহক।’ সব মুসলমানের কাছ থেকে পাঁচটি স্তম্ভ বা কর্তব্য পালন করার
প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। এগুলো হচ্ছে : সাক্ষ্য দান করা, দিনে পাঁচবার নামাজ পড়া, রমজান
মাসে রোজা রাখা, জীবনে একবার হজ করা এবং জাকাত প্রদান।
(চলবে)

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫