ঢাকা, সোমবার,১৮ মার্চ ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

বৈশ্বিক লেনদেনে চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের স্বীকৃতি

গৌতম দাস

০৭ ডিসেম্বর ২০১৫,সোমবার, ১৫:০৪


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

দুনিয়ার ব্যবসাবাণিজ্যে যেসব মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বেচাকেনা বা লেনদেন চলে একালে এমন শীর্ষ চার মুদ্রার দখলে থাকা বাজারের হাল হলো- আমেরিকান ডলারের ভাগে ৪১.৯ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোর ভাগে ৩৭.৪ শতাংশ, ব্রিটিশ পাউন্ডের ভাগে ১১.৩ শতাংশ আর জাপানি ইয়েনের ভাগে ৯.৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা সংক্ষেপে আইএমএফ এই চার মুদ্রাকে তার ‘বাস্কেট কারেন্সি’ বলে। কারণ চার বাস্কেট কারেন্সির গড় থেকে নির্ণীত এক কাল্পনিক মুদ্রায় আইএমএফ নিজের তহবিলের হিসাব রাখে। উল্টাভাবে বললে, দুনিয়াতে মুদ্রার ঝুড়ি থেকে যে চারটা শীর্ষ বেচাকেনার মুদ্রা আইএমএফ তুলে নিয়ে নিজের হিসাব রাখার মুদ্রার মান যাচাই ও নির্ধারণ করে ওই চার শীর্ষ মুদ্রাকে বাস্কেট কারেন্সি বলে। গত ৩০ নভেম্বর আইএমএফ নির্বাহী বোর্ড সভা চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে আইএমএফের বাস্কেট কারেন্সির পঞ্চম মুদ্রা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে দুটি কথা আরো স্পষ্ট করে কথা শুরু করব- এক, আইএমএফ নিজের তহবিলের হিসাব রাখা মানে কী? আর দুই, কাল্পনিক মুদ্রা মানেই বা কী? 

আইএমএফ নিজস্ব তহবিল মানে হলো, আইএমএফের সদস্য হতে হলে প্রত্যেক হবু সদস্য রাষ্ট্রকে আগে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আইএমএফের তহবিলে জমা রাখতে হয়। ওই পরিমাণ কত সাব্যস্ত হবে তা নির্ভর করে সদস্য হতে চাওয়া রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক কেনাবেচা বা বিনিময়ের বাজারটা কত বড়, এর ওপর। সে বাজারের মোট অর্থমূল্যের একটা আনুপাতিক পরিমাণ অর্থ আইএমএফের কাছে জমা রাখতে হয়। শুধু তাই নয়, পরবর্তী সময়ে সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার যত বড় হবে ততই নতুন করে আরো অর্থ জমা হিসেবে যোগ করতে হবে। আর আইএমএফের কোথায় জমা হয় সে অর্থ? প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের নামে একটা অ্যাকাউন্ট (ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট বা হিসাব খোলার মতো এক একাউন্ট) আইএমএফের কাছে খোলা হয়। সদস্য রাষ্ট্রের নিজস্ব ওই অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখা হয়- ‘ডিপোজিটেড মানি’ বা আগাম জমা রাখা অর্থ হিসেবে। কিন্তু আরো কথা আছে। ওই জমা অর্থের ৭৫ শতাংশ হতে হয় ডলার মুদ্রায় অথবা স¦র্ণে। আর বাকি ২৫ শতাংশ নিজ দেশীয় মুদ্রায়। এভাবে আইএমএফের ১৮৮ সদস্য রাষ্ট্রের সবাইকে সদস্য চাঁদা বা ডিপোজিটেড অর্থ জমা রাখাতে ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় থেকেই ক্রমেই আইএমএফের ভাণ্ডারে বিশাল পরিমাণের স্বর্ণ ও আমেরিকান ডলার জমা হতে থাকে। কারণ, এরপর থেকে যত দিন গেছে প্রত্যেক রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ ততই বড় হয়েছে বলে আরো বেশি পরিমাণ করে আইএমএফে সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে ডিপোজিটেড অর্থ রাখতে হয়েছে। কিন্তু দুনিয়াতে স্বর্ণ ও ডলার তো অফুরন্ত নয়। ফলে এই সঙ্কট মিটাতে ১৯৬৯ সালে অন্যান্য কিছু মুদ্রায়ও ডিপোজিটেড অর্থ রাখা যাবে, এমন সংশোধিত আইন করা হয়। তখন থেকেই কেবল আর ডলার কারেন্সি নয়, বরং এক ‘বাস্কেট কারেন্সি’র ধারণা চালু করা হয়। অর্থাৎ যেসব কারেন্সি বাস্কেট কারেন্সি হিসেবে আইএমএফ আগে স্বীকৃতির ঘোষণা দেবে ওসব কারেন্সিতেও সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে ডিপোজিটেড অর্থ রাখা যাবে। এখানে বলে রাখা ভালো, অনেকেই জানেন, জন্মের সময় থেকেই আন্তর্জাতিক বিনিময় বাণিজ্যের মুদ্রা হিসেবে আইএমএফ স্বীকৃত মুদ্রা ছিল একমাত্র আমেরিকান ডলার। তবে আজকের মতো, যেমন আজ ডলারের রেট কত এমন বলা কথার কোনো অর্থ হতো না। কারণ তখন ডলারের বিনিময় হার কখনোই পরিবর্তিত হতো না। এক আউন্স সোনার দাম ৩৫ ডলার- এই ফিক্সড রেট ধরে নিয়ে আইএমএফের জন্ম হয়েছিল। সেকালে সব দেশের মুদ্রারই স্থির বিনিময় হারের মুদ্রা ছিল এবং তা স্বর্ণের সাপেক্ষে। ফলে আইএমএফে সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টগুলোও ছিল কেবল ডলার মুদ্রার অ্যাকাউন্ট হিসেবে। কিন্তু বাস্কেট কারেন্সি ধারণা চালু হওয়াতে ডলার ছাড়াও আইএমএফে সদস্যদের অন্যান্য মুদ্রায় রাখা ডিপোজিটেড অর্থের হিসাবও রাখার দরকার পড়ল। ফলে হিসাব বিভিন্ন কারেন্সিতে রাখার জটিলতা কমাতে ‘বাস্কেট কারেন্সি গুলোর’ এক গড় মান বের করা শুরু হয়। আর এই গড় মানের নাম দেয়া হয় আইএমএফের এসডিআর। এই এসডিআর হলো যেন এক কাল্পনিক মুদ্রা, আইএমএফের নিজের মুদ্রার নাম যেন। এখানে ‘যেন’ শব্দটা খুব হিসাব করে সাথে রাখা হয়েছে। কারণ কঠিন স্বরে বললে এটা ঠিক আইএমএফের মুদ্রা নয়, কারণ আইএমএফের মুদ্রা বলে কিছু নেই। আর এসডিআরÑ এটা কোনো বাজারেরই মুদ্রা নয়, এতে কোনো পণ্য বিনিময়ও হয় না। এটা কেবল হিসাব রাখার একটা ইউনিট। তাও কেবল আইএমএফে ব্যবহৃত। আইএমএফে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্ট এসডিআর মূল্যে হিসাব করা ও রাখা হয়। প্রত্যেক দিনের এক এসডিআর সমান কত ডলার তা আইএমএফের ওয়েব সাইটের প্রথম পাতায় টাঙানো থাকে। যেমন আজ ০৪ ডিসেম্বর এক এসডিআর = ০.৭২১১২৭ ডলার। এই হিসাবে এক এসডিআর = ১০৮.৪০ টাকা। প্রতিদিনের সবচেয়ে বেশি লেনদেনের শীর্ষ চারটা মুদ্রার গড়টাই এসডিআর এর হারে প্রতিফলিত হয়। তবে ১৯৬৯ সালে বাস্কেট কারেন্সি ধারণা চালু হওয়ায় শুধু এ জন্য এসডিআরে সম্পদ হিসাব শুরু হয়নি। এর আরেকটা কারণ ছিল। আগেই বলেছি, জন্মের সময় আইএমএফের স্বীকৃত একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা হলো ডলার, যা আবার স্থির বিনিময় হারের ডলার। এক আউন্স স্বর্ণ সমান ৩৫ ডলার, এবং প্রত্যেক ব্যাংক কাগুজে মুদ্রার সমপরিমাণ স্বর্ণ ভল্টে জমা রেখে তবেই নোট ছাপাত। ফলে সে সময়ের কাগুজে নোটকে বলা হতো গোল্ড-ব্যাকড ডলার। কিন্তু আমেরিকা বিশ্বাস ভঙ্গ করে স্বর্ণ না রেখে ডলার ছাপানোর কারণে সেসব ভেঙে যায়। বহু ঝগড়াবিবাদের পরে ১৯৭৩ সালে আইএমএফের ১৯৪৪ সালের ম্যান্ডেট বা ঘোষণাপত্র বদল করা হয়। মূল কারণ আগের ম্যান্ডেটে ডলার বলতে গোল্ড-ব্যাকড ডলার বোঝানো হতো। এরপর নতুন করে আইএমএফ পুনর্গঠন করে নেয়া হয়; তবে সেই নতুন আইএমএফ আর স্থির বিনিময় হারের ডলারের ওপর দাঁড়ানো নয়। যেহেতু তখন থেকে ডলারের পিছনে আর স্বর্ণ রাখা নেই, তাই আইএমএফে ডলার বলতে ওই দিনের ডলারের বিনিময় হার যা প্রতিদিনের বাজার দরের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। সেই সাথে শুধু আর ডলার নয়, ওই বাস্কেট কারেন্সি ধারণার ওপর আরো বেশি নির্ভরতা বাড়ে। আইএমএফ স্বীকৃত শীর্ষ চার বাস্কেট কারেন্সির প্রতিদিনের বাজারমূল্য থেকে ওদের গড় বের করে তা থেকে প্রতিদিনের এসডিআরের হার বা মান নির্ধারণ শুরু হয়। তবে ভুল ধারণা এড়ানোর জন্য একটা কথা মনে রাখা ভালো। যে আজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন সবচেয়ে বেশি হয়েছে এমন শীর্ষ চার মুদ্রা কোন কোনটি- আইএমএফ প্রতিদিন তা ঠিক করে না। আসলে আইএমএফ এ বিষয়টি মূল্যায়নে বসে প্রতি পাঁচ বছর পরপর; যেমন ২০০০, ২০০৫, ২০১০ সালে এভাবে। সে হিসাবে এবার ২০১৫ অক্টোবর ছিল আইএমএফের মূল্যায়নের বছর। আর মূল্যায়নের সময়ে বিগত পাঁচ বছরে যদি কোনো মুদ্রার দাম বারবার পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, যার অর্থ ওই মুদ্রা শীর্ষ বাস্কেট কারেন্সি থেকে বারবার বেরিয়ে যাওয়া আর ঢোকার ঘটনা ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে ওই মুদ্রার বাস্কেট কারেন্সির স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয়া হবে, পরের পাঁচ বছরের জন্য। অর্থাৎ প্রতি পাঁচ বছর ধরে মুদ্রার মানের ধারাবাহিকতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
তাহলে এবার আমাদের কাছে অনেক স্পষ্ট যে- আইএমএফ গত ৩০ নভেম্বরের বোর্ড সভায় চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে বাস্কেট কারেন্সির স্বীকৃতি দিয়েছে- এই কথা বলতে কী বুঝতে হবে। এটা আগের চার বাস্কেট কারেন্সি ডলার- ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েনের পাশাপাশি পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকেও দেয়া স্বীকৃতি। এর আরো অর্থ, আইএমএফে প্রত্যেক রাষ্ট্রকে যে ডিপোজিট অর্থ রাখতে হয়, তা ইউয়ানকে দেয়া স্বীকৃতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে যেকোনো রাষ্ট্র ইউয়ান মুদ্রাতেও তার ডিপোজিট অর্থ রাখতে পারবে। এই অর্থে আইএমএফের চোখে এবার ইউয়ানও রিজার্ভ সম্পদ রাখার ক্ষেত্রে স্বীকৃত এক মুদ্রা। তবে নিয়ম অনুসারে, আইএমএফের এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা আগামী বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হবে। সারকথা হিসেবে এখন আমরা জেনেছি যে, আইএমএফে সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্ট এসডিআর ইউনিটে হিসাব করা ও রাখা হয়। কিন্তু এসডিআর- এই বিদঘুুটে নাম কেন? এ ছাড়া আইএমএফের সদস্য ফি মানে আগাম ডিপোজিটেড অর্থ জমা দেয়ার ব্যবস্থাটাই বা কেন? এর সুবিধা কী? এই দুই প্রশ্নের জবাব প্রায় একই। তাই একসাথে জবাব টানব। নিজের ঘোষণাপত্র অনুসারে, আইএমএফের ম্যান্ডেটরি কাজ হচ্ছে মূলত দুইটি। বিভিন্ন সদস্য দেশের মুদ্রার মান নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্য রাষ্ট্রের ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’-এর দিকে নজর রাখা। কোনো রাষ্ট্রের বার্ষিক আমদানি-রফতানিতে আয়-ব্যয়ের চলতি হিসাবের খাতায় আয়ের তুলনায় ব্যয়- সেটা ঘাটতি বা বাড়তির দিকে যা-ই থাকে, এটাকেই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বলা হয়। আইএমএফের দ্বিতীয় কাজ সে দিকে নজর রাখা এবং এ ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিলে তা মোকাবেলার জন্য ওই রাষ্ট্রকে ঋণ ও পরামর্শ দেয়া ইত্যাদি। আইএমএফ সদস্য রাষ্ট্রকে কেবল এই একটা খাতেই ঋণ দিতে পারে। এখানে লক্ষণীয় যে, নিজ রাষ্ট্রের অর্থনীতি চালাতে গিয়ে ঘাটতি ফেলালে তবেই ধার নিতে হবে। নইলে নয়। আর ধার নেয়া মানেই আইএমএফের দেয়া শর্ত-পরামর্শও শুনতে হবে। মানে ঘাটতি নেই তো উটকো পরামর্শও নেই। আর আইএমএফের প্রথম কাজ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ- এটা সব সময় এসডিআরের মূল্য বা বিনিময় হার ঘোষণার ভেতর দিয়ে নিরন্তর হতেই থাকে। এ ছাড়া অনেক সময় ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতিতে দেয়া ঋণের পূর্বশর্ত হিসেবে ঋণখাতক সদস্য রাষ্ট্রকে নিজ মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে বাধ্য করা হয়।
আবার ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ বা সদস্য রাষ্ট্রের চলতি হিসাবে আয়-ব্যয়ের মধ্যে যে ঘাটতির কথা বলছিলাম তেমন কোনো পরিস্থিতি হাজির হলে সেই ঘাটতি মিটাতে আইএমএফ ওই সদস্য রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ কত পরিমাণ ঋণ দেবে, তা হিসাব করা হয় এভাবে যে, আইএমএফে সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থের ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত। ইংরাজি এসডিআর কথার সংক্ষেপ ভাঙলে হয় স্পেশাল ড্রয়িং রাইট। কোন রাষ্ট্র কত দূর ঋণ পাবে মানে কী পরিমাণ ঋণের অর্থ তোলার অধিকার রাখে, এই অর্থে ‘ড্রয়িং রাইট’ কথাটা এসেছে। এর মানে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের জমাকৃত বা ডিপোজিটেড অর্থই যেহেতু ঘাটতির বিপদে পড়া রাষ্ট্রের ঋণের অর্থ তোলার অধিকারের সাথে সম্পর্কিত; সেই সূত্রে এসডিআর কথাটা আইএমএফে রিজার্ভে রাখা সদস্য রাষ্ট্রের সম্পদেরও ইউনিট বলে নাম দেয়া হয়েছে। তাই এই বিদঘুটে নাম। এসডিআর হলো, আইএমএফের কাছে রিজার্ভ রাখা সদস্য রাষ্ট্রের ডিপোজিটেড সম্পদের ইউনিট।
তাহলে আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড সভায় চীনা ইউয়ানকে বাস্কেট কারেন্সির স্বীকৃতি দেয়ায় এতে এখন বাংলাদেশের লাভ কী? চীনকে অথবা অন্য কোনো রাষ্ট্রকে গার্মেন্টস বা অন্য কিছু বিক্রি করতে চাইলে আমরা সরাসরি তা ইউয়ান মুদ্রায় করতে পারি। আর এভাবে হাতে পাওয়া ইউয়ান মুদ্রাকে আমরা আবার আইএমএফে আমাদের সঞ্চিত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবেও রাখতে পারি; এবং তা কোনো স্তরেই ইউয়ানকে ডলারে রূপান্তর করা ছাড়াই। আর ইউয়ানে রাখার কারণে ডলারের চেয়ে ভালো দরও পেতে পারি। বিপরীতে ওই ইউয়ান দিয়ে চীন থেকে আবার কোনো পণ্য আনার সময় ডলারের চেয়ে ইউয়ানে দাম পরিশোধ করে বাড়তি সুবিধাও পেতে পারি। অন্য দিকে চীনের কী লাভ হবে?
এ ব্যাপারে আইএমএফ নিজে হিসাব করে বলছে, অক্টোবর ২০১৬ থেকে কার্যকরভাবে ইউয়ান বাস্কেট কারেন্সিতে অন্তর্ভুক্ত পঞ্চম কারেন্সি হয়ে গেলে কোন মুদ্রা লেনদেন বাণিজ্যের বাজারে কত ভাগ দখল করে থাকবে, তা হিসাব করে বলছে, ইউয়ানের অবস্থান হবে তৃতীয়। তখন বাজার শেয়ার ভাগ হবে- ডলার ৪১.৭৩ শতাংশ, ইউরো ৩০.৯৩ শতাংশ, ইউয়ান ১০.৯২ শতাংশ, পাউন্ড ৮.০৯ শতাংশ আর ইয়েন ৮.৩৩ শতাংশ। এটা গেল কার কত বাজার শেয়ার দাঁড়াবে কেবল শুরুতে এর হিসাব। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া একযোগে যে কথাগুলো বলছে যেমন, আইএমএফের স্বীকৃতি চীনের দিক থেকে ‘বিরাট রাজনৈতিক অর্জন’ এবং চীনের ওপর আস্থা ও চীনের জন্য এটা ‘প্রেস্টিজিয়াস বিষয়’। এ ছাড়া মুদ্রা যেহেতু শুধু পণ্য বিনিময়েই কাজে লাগে তাই নয়। সম্পদ ধরে রাখার মুদ্রা হিসেবেও এর কদর আছে। বিশেষত যে আন্তর্জাতিক মুদ্রার মান বা হার স্থিতিশীল, বাজারের উঠতি মুদ্রা এবং আস্থার মুদ্রা সেই মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সম্পদ রাখতে মানুষ আগ্রহী হবেই। এই বিচারে ব্লুমবার্গ ম্যাগাজিন আগাম অনুমান করে বলছে, প্রথম বছরেই ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখার জন্য বাজারে এক প্রবল জোয়ার উঠবে। এর ধাক্কায় আবার পণ্য বিনিময় বাজারে ইউয়ানের বাজার-শেয়ার বেড়ে যাবে। আর ততটাই ডলার বাজার হারাবে। এ রকম কিছু চেন রিয়াকশন বা চক্রাকার প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার কিছু মিডিয়ার ঈর্ষা ছড়ানোর প্রপাগান্ডাও আছে। যেমন কেউ কেউ সন্দেহ বাতিকের রিপোর্ট করেছে, আইএমএফ কি আসলেই ঠিক মতো যাচাই করে দেখে বোর্ডের কাছে সুপারিশ করেছে? এ রকম। তবে খোদ আইএমএফ এ দিকটা আগেই আঁচ করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার দিনেই আইএমএফ নিজ ওয়েব সাইটের প্রথম পাতায় ‘সহসাই যেসব প্রশ্ন উঠে’ শিরোনামে নিজেই প্রশ্নোত্তরে এসব সন্দেহ-কৌতূহলেরও বহু আগাম প্রশ্নের বাড়তি জবাব দিয়ে রেখেছে। অনেক বেশি আন্তরিক আর খোলামেলাভাবে সেসব জবাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের মতো বহুরাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানের চীন ও আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান বিরোধের বেলায় সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকেই আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের ভূমিকা কী হলে সঠিক হবে, সে প্রশ্নে এপর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা একেবারেই প্রফেশনাল অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা পক্ষ নিতে চাননি। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যক্তিনিরপেক্ষভাবে যা সত্য, যা সঠিকÑ এর পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। যেমন, আইএমএফের সংস্কারের দাবি বিষয়ে তাদের অবস্থান সংস্কারের পক্ষে। আর তাদের সুপারিশের ফাইল আমেরিকান সিনেটে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। চীনা ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নেও আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের একই ধারাবাহিকতার অবস্থান দেখা গিয়েছে। ইউয়ানকে আমলে নিয়ে আইএমএফের সম্পদের ইউনিট গণনা আগামী বছর থেকে শুরু হবে বলা হলেও বিভিন্ন ব্যক্তি কোম্পানির ধরে রাখা সম্পদ ইউয়ানে রূপান্তর করে রাখার ঝোঁক এ বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাস্তবে কি দাঁড়ায় সেটি দেখা যাক।


লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫