ঢাকা, সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

ভারতের নেপালনীতির পরিণতি

গৌতম দাস

০৮ নভেম্বর ২০১৫,রবিবার, ১৯:১৪


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

নেপালে গত সাত বছরের মধ্যে দুইবার কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা সংবিধান সভার নির্বাচন ও সে সভা পরিচালনা শেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নতুন কনস্টিটিউশন বা সংবিধান গৃহীত হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। এর ভেতর দিয়ে নেপাল রিপাবলিক জনরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু ভারত প্রকাশ্যেই এর বিরুদ্ধে নিজের আপত্তি ও অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন সমাপ্তি ও গৃহীত হওয়ার ঘোষণা একান্তই সে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিজস্ব ব্যাপার। এটা ভিন রাষ্ট্রের গ্রহণ করা-না-করার কিছু নেই, বিষয়ও নয়। এরপরও এ নিয়ে ভিন রাষ্ট্রের আপত্তি করার এক উদাহরণ দেখলাম আমরা। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে নতুন নেপাল রাষ্ট্র সাত প্রদেশে বিভক্ত ও ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্র। যদিও প্রদেশগুলোর সীমানাবিষয়ক বিতর্ক আছে, সীমানা টানার কাজ চূড়ান্ত করা হয়নি। করা হবে। কিন্তু এই বিতর্ক নিয়ে নেপাল-ভারত সীমান্তের মাধেসি ও তরাই সমতল অঞ্চলে অসন্তোষকে উসকে দিয়ে ভারতও নেপালের ক্ষমতার এক ভাগীদার সে প্রমাণ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কারণ নেপালের রাষ্ট্রক্ষমতার করিডোরে ভারত আজ কোথাও নেই, কারো পেছনে নেই, কেউই তাকে নিজের পেছনে রাখতেও দরকার মনে করছে না। ফলে যেন সংবিধান প্রণয়নের কাজ সমাপ্ত হয়নি এবং হয়নি বলার ভেতর দিয়ে নেপালের রাষ্ট্রগঠন ও ক্ষমতা তৈরিতে ভারতের স্টেক হাতছাড়া হওয়াকে উল্টাতে পারবে! ভারতের এই অক্ষম প্রচেষ্টাটাই এখনকার রাজনৈতিক অসন্তোষের মূল কারণ। 

নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকদের সরকার (মিলিত মোট সংসদীয় আসন সংখ্যা ৯৪%), এরাই সংবিধান ঘোষণার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এদের অভিযোগ ভারত নেপালের মাধেসি ও তরাইদের মধ্যে অসন্তোষ ও উসকানি ছড়াচ্ছে। ভারত শেষ পর্যন্ত নেপালের বিরুদ্ধে অঘোষিতভাবে অবরোধ আরোপ করেছে। ল্যান্ড-লকড নেপাল, পণ্য চলাচলের দিক থেকে সম্পূর্ণ ভারতের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষত তেল-গ্যাস জ্বালানির সরবরাহের দিক থেকে শতভাগ নির্ভরশীল। এই অবরোধ আরোপ করে ভারত নেপালের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কতটা তা জাহির করছে। নিঃসন্দেহে ভারতের দিক থেকেও এই অবরোধ ছিল সব হারিয়ে মরিয়া শেষ প্রচেষ্টা। যদিও এই প্রচেষ্টার ভাগ্য অনেক আগেই নির্ধারণ হয়েছে। এ কথা ঠিক যে, অবরোধের প্রথম ৪২ দিনে নেপালের প্রত্যেক নাগরিক তা হাড়ে হাড়ে নিজের জীবনে বুঝেছে যে ভারতের কত শক্তি। তবে ভারতের এই শক্তির ব্যবহার নেপালিদের কাছে অত্যাচারী বা নির্যাতনকারীর শক্তি হিসেবেই হাজির। এরই প্রতিক্রিয়ায় ভারতের প্রাপ্তি পুরো নেপালি জনগোষ্ঠীর ভারতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। নেপালের জনগণ আশা করে না যে, ভারত তাদের বসিয়ে খাওয়াবে। আবার এটাও আশা করে না যে, ভারত তাদের স্বাভাবিক জীবন আরো কঠিন কষ্টকর এবং দুর্বিষহ করে তুলবে।
ভারত নেপালকে জ্বালানি সরবরাহ না করে মারবে এই সিদ্ধান্ত খোদ ভারতের জন্যই বিশাল বিপদ হিসেবে হাজির হয়েছে। সরবরাহহীন পরিস্থিতি নেপালকে মরিয়া হয়ে বিকল্পের সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছে। গত সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার মনে পড়েছে যে ট্র্যাডিশনালি নেপালের একমাত্র জ্বালানিদাতা ছিল ভারত, এখন আর নেই। সে জায়গা পূরণে এখন চীন হাজির হয়ে গেছে। ভারতের মিডিয়ার শিরোনাম এখন এই হারানোর ব্যথা প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছে।
ভারতের সাথে নেপালের বহিঃবাণিজ্যের আনা-নেয়া বেশি। কিন্তু এটা এখন বিস্মৃত অতীত হতে যাচ্ছে। কারণ এবারের ভারতের নেপাল অবরোধ বিপরীত ফল বয়ে আনতে শুরু করেছে, নেপালে পণ্য সরবরাহে ভারতের একচেটিয়াত্বের অবসান ঘটাতে যাচ্ছে। নেপাল-চীনের সীমান্তে চার স্থানের মধ্যে সবচেয়ে চালু ও যোগাযোগ সুবিধাজনক হলো, ‘তাতোপানি’ এবং ‘কেরুঙ’ স্থল সীমান্ত। গত ভূমিকম্পে দুটো সীমান্তেই পাহাড়ের পাথর ধস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে তা পরিষ্কার করে এখন রাস্তা উন্মুক্ত করা হয়েছে। জ্বালানি তেল সরবরাহের চুক্তি নিয়ে কথা চলছে, মূল চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দরদাম আর বিস্তারিত খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। তার আগে চীন থেকে শুভেচ্ছাস্বরূপ অনুদান হিসেবে দেয়া ১০০০ টন জ্বালানির চালান আসা শুরু হয়ে গেছে গত ১ নভেম্বর থেকে। নেপালের মোট চাহিদার কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নেপাল চীন থেকে আমদানির স্থায়ী চুক্তি করতে চায়। এই অবস্থা দেখে ভারতের মিডিয়ার সুর নরম ও হতাশার। নেপালকে চাপ দিয়ে ধরার অস্ত্র ভোঁতা অকেজো হয়ে এখন উল্টা তা ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করছে। ভারতের ভুল নেপালনীতির কারণে নেপালকে চীনের দিকে নিজেরাই ঠেলে দিয়েছে বলে এখন কোনো কোনো মহল থেকে অভিযোগ ওঠা শুরু হয়ে গেছে। অথচ ২০ সেপ্টেম্বর ভারতের অবরোধ আরোপের পর ভারতের সব মিডিয়া ভারতের নেপালনীতির পক্ষে প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল। চীন থেকে জ্বালানি এসে পড়ায় এই অবস্থায় প্রতিযোগিতা অনুভব করে এবং দোষ কাটাতে বা হালকা করতে ভারত কিছু কিছু সীমান্তে অবরোধ শিথিল করে তেল ট্যাঙ্কার নেপাল প্রবেশ করতে দেয়া শুরু করেছে।
ভারতের চাপের কৌশল ভাঙতে নেপাল সরকার প্রাথমিক সফলতা পেয়েছে। এখন ক্রমেই বাকি পণ্যে অবরোধ দুর্বল হতে থাকবে। ভারতের পক্ষে অবরোধ টেকানোও দিনের পর দিন কঠিন হয়ে উঠবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের নেপালনীতি এত দিন যে সুরে পরিচালিত হয়েছে এর প্রাপ্তি কী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ফলাফল ও ভবিষ্যৎ নিয়েও মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।

দুই
ভারতের দিক থেকে ভারত-নেপালের সম্পর্ককে শুরু থেকেই অধস্তন কলোনি সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়েছিল। শুরু থেকে মানে ১৯৫০ সালের ৩১ জুলাই স্বাক্ষরিত ভারত-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে। কলোনি মাস্টার ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া ও নেপাল সরকারের মধ্যকার চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রয়োজনে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। কলোনি মাস্টারের সাথে নেপালের রাজার সর্বশেষ চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়েছিল ১৯২৩ সালে যেখানে ওই চুক্তির কার্যকারিতা সমাপ্তির তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। সে কারণেই স্বাধীন ভারতের নেহরু ও নেপালের রানা রাজবংশের রাজার মধ্যে ওই ৩১ জুলাই ১৯৫০ তারিখেই এক নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে ভারতের সাথে নেপালকে চুক্তি করতে হবেই কেন? আর সেটা আসলে কিসের বা কী বিষয়ক চুক্তি? সংক্ষেপে এর জবাব হলো, পুরনো কাল থেকেই নেপাল এক ল্যান্ড-লকড ভূখণ্ড; অর্থাৎ এ ভূখণ্ড সমুদ্র যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন; নেপালকে অন্য রাষ্ট্রের ভূমি মাড়িয়ে তবে সমুদ্রের নাগাল পেতে হয়। একমাত্র এভাবেই দুনিয়ার তৃতীয় যেকোনো দেশের সাথে নেপালের বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্ভব করতে পারে। ফলে ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকেই ভারতের ভূমি ব্যবহার করে সমুদ্রে প্রবেশ করে তবেই নেপালকে বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় চালু রাখতে হয়েছে। আর তাই এই প্রয়োজনের কথা খেয়াল রেখে সব সময়ই নেপালকে ভারতের ভূমি ব্যবহারের চুক্তির ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়েছে। নির্ভর মানে আক্ষরিক অর্থেই বিষয়টা শুরু থেকেই সব সময় ভারতের ইচ্ছাধীন থেকেছে। প্রত্যেকবার চুক্তির ভারসাম্য ভারতের পক্ষে থেকেছে, এমন শর্ত মেনে চুক্তি করতে হয়েছে যেন দাসখত লিখে দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে প্রথম চুক্তি হয়েছিল ১৮১৬ সালে (Treaty of Sugauli 1816)। সে সময় নেপালের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি ব্রিটিশ-ভারত কলোনি মাস্টারকে দিয়ে দেয়ার বিনিময়ে এই চুক্তি করা হয়েছিল। ব্রিটিশ রাজ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সদয় সন্তুষ্ট হয়েই তুলনামূলক ছাড় দেয়া এক নতুন চুক্তি করেছিল ১৯২৩ সালে। কিন্তু তবুও সে চুক্তির পঞ্চম দফাতেও লেখা ছিল যে, নেপাল সরকার অস্ত্রশস্ত্রসহ সব কিছুই আমদানি করতে পারবে যতক্ষণ ব্রিটিশ সরকার সন্দেহাতীতভাবে সন্তুষ্ট থাকবে (British Government is satisfied that the intentions of the Nepal Government are friendly)। কিন্তু কী হলে কিসে ব্রিটিশ সরকার সন্তুষ্ট হবে এর কোনো তালিকার তাল ঠিকানা সেখানে দেয়া হয়নি। বিষয়টা সরকারের খেয়ালি ইচ্ছাধীন থেকেছে। অথবা সুনির্দিষ্ট করে কোনো তালিকা আগেই করে দিয়ে বলা হয়নি যে, কী কী জিনিষ নেপাল আমদানি করতে পারবে।
কেন এ রকম করে রাখা হয়েছিল, রাখতে পারে কি না- এমন প্রশ্ন করার সুযোগ সেকালে ছিল না। এগুলোসহ অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে কলোনি দাস বানিয়ে রাখা অন্যায়- এমন কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন বলতে কোনো কিছু ১৯৪৪-৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘ গঠিত হওয়ার আগে দুনিয়াতে ছিল না। ফলে কলোনির পক্ষে জোর যার ধরনের সাফাইয়ের ইঙ্গিত তখন কাজ করত। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ গঠিত হয়েছিল আটলান্টা চার্টার চুক্তির ওপর ভর করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালে ওই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। দুনিয়াতে আর কলোনি শাসন চলবে না- ঠিক এই ভাষায় না লিখে কলোনি শব্দটা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল বটে তবে ওই চুক্তির সার কথা ওটাই ছিল। লেখা হয়েছিল, ‘প্রত্যেক জনগোষ্ঠী নিজের ইচ্ছাধীনের সরকার গঠন করবে, কার দ্বারা শাসিত হবে তা নির্ধারণের সার্বভৌম অধিকার থাকবে’ এই ভাষায় লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ যুদ্ধশেষে জাতিসঙ্ঘ গঠন হয়ে যাওয়ার পরে যে কলোনি দখল ও শাসন যে বেআইনি ও নিন্দনীয় হয়ে যাবে সেটা বুঝা যাচ্ছিল। হয়েছিলও তাই।
১৯৫০ সালে নেপাল-ভারত শান্তি চুক্তির নামে নতুন আর এক দাসখত চুক্তি করেছিল। দাসখত বলছি এ জন্য যে, ১৯২৩ সালের চুক্তিতে তাল ঠিকানাহীন ব্রিটিশ সরকারের ‘সন্তুষ্টির’ ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল। আর ১৯৫০ সালের চুক্তিতে পঞ্চম দফায় সন্তুষ্টি কথাটা সরিয়ে আরো অস্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, কী শর্তে নেপাল অস্ত্রশস্ত্র আনতে পারবে, তার প্রক্রিয়া কী হবে তা চুক্তির বাইরে কেস টু কেস ভিত্তিতে পরে দু’সরকার বসে ঠিক করবে। এ ছাড়া ষষ্ঠ দফায় নেপালে ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে নেপালিদের মতো সুযোগ সুবিধা দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। অর্থাৎ আরো জটিল অস্পষ্টতা। এ ছাড়া সপ্তম দফায় ভারতে নেপালিরা বসবাস করা, সম্পত্তির মালিক হওয়া, ব্যবসায় করা, চলাচল ইত্যাদির সুবিধা পাবে বলে এর ‘রেসিপ্রোকাল’ বা পালটা নেপালে ভারতীয়দেরও একই সুবিধা দেয়ার শর্ত রাখা হয়। সুবিধা দেয়া আর তা নিতে পারার মধ্যে বিরাট ফারাক আছে। এমন সুবিধা অর্থহীন যা নেপালিরা নিতে পারবে না। মূলত নেপালের অর্থনীতির ক্ষমতা ও সাইজ ভারতের তুলনায় নস্যি বলে শেষের ষষ্ঠ ও সপ্তম দফার মাধ্যমে রেসিপ্রোকাল সুবিধার কথা বললেও এর সুবিধা নেয়ার যোগ্যতার দিক থেকে ভারতীয়রাই এগিয়ে থাকবে, ভারতের ব্যবসায়ীরাই তা নেয়ার যোগ্য হবে, হয়েছেও। ফলে এই ছলে কৌশলে চুক্তিটাকে ভারতের পক্ষে কান্নিমারা ভাবে হাজির করা হয়েছে। এসব কারণে ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতে নেহরুর করা চুক্তিকেও নতুন ধরনের এক কলোনি চুক্তি বলা যায়।
আবার ভারতের দিক থেকে দেখলে প্রথমত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় সেকালে নেপালের সাথে চুক্তিতে কলোনি দাসখতের বিষয়াদি থাকতে পারে। কিন্তু চুক্তি ভারতের সাথে সম্পন্ন হওয়ার কালে ভারতের পুরনো চুক্তি অনুসরণ করা উচিত নয়। কেন? এটা ভালোমানুষির প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রস্বার্থ ভালোমানুষির কাজ বা বিষয় নয়। বিষয়টা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়াটা নতুন কী আকার নিলো প্রথমে এটা সম্যক উপলব্ধিতে বুঝে নেয়া। এর বৈশিষ্ট্যসূচক দিকগুলো আঙ্গুলে গুনে নোট নেয়া। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবেÑ ইমাজিন করে কল্পনায় এঁকে দেখার ক্ষেত্রে রুজভেল্ট চেয়েছিলেন যে, আগের কলোনি ধরনের দখল ও শাসনের কারণে বিশ্ববাণিজ্য বিনিময় খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়ে গিয়েছিল। কলোনি সম্পর্কের উচ্ছেদ ঘটিয়ে রুজভেল্ট ব্যাপকতর বিশ্ববাণিজ্য বিনিময়, পণ্য ও পুঁজি চলাচলের এক নতুন দুনিয়া দেখতে চান। শুরুর ইমাজিনেশন সব সময় পরবর্তী সময়ে বাস্তবে হাজির হয় এমন না। কিন্তু কলোনি সম্পর্ক উচ্ছেদের বিষয়ের ক্ষেত্রে তা হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠানও অনেক সীমাবদ্ধতা, অকেজো ঠুঁটো হয়ে থাকা, কান্নি মেরে থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নর্মস হাজির করতে পেরেছে। শুধু তাই নয়, ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রগুলোর তৃতীয় রাষ্ট্র মাড়িয়ে সমুদ্রে প্রবেশের বিষয়কে কতকগুলো বিশেষ আগাম শর্তে রাষ্ট্রগুলোর অধিকার হিসেবে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ডেকে স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘের সদস্য এমন ৩১টা ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্র এই উদ্দেশ্যে জাতিসঙ্ঘের আঙ্কটাডের অধীনে সমবেত হয়েছে। ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরকে যেন পড়শি রাষ্ট্রের কলোনি-খায়েশের খোরাক না হতে হয় এর জন্য নতুন আইন বা কনভেনশন আনা ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এসব পরিবর্তন দেখে এর সাধারণ অভিমুখকে চিনিয়ে বলা যায়, দুনিয়া অন্তত আর কলোনি দখল ও শাসনকে আইনি ন্যায্যতা দেবে না। এমনকি ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্র বলে পড়শির কলোনি-খায়েশের শিকার না হতে হয়, সমুদ্র পর্যন্ত প্রবেশ যেন তারও অধিকার হিসেবে দেখা হয় সে চেষ্টা চলছে।
কাজেই পুরনো কলোনি চুক্তি সূত্রে নেপালের ওপর আবার কলোনি চুক্তি চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ পাওয়া গেছে বলেই ১৯৫০ সালে নেহরুর ভারতকে তা নিতে হবে সেটা কোনো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের কথা নয়। এ ছাড়া কলোনি সম্পর্কের বিরোধিতা করা সেকালের একটা নীতিগত ইস্যুরও বিষয়। নিশ্চয় ভারতের বেলায় ব্রিটিশ কলোনিকে খারাপ বলতে হবে আর নেপালের বেলায় তাকে ভারতের কলোনি খায়েশ ভালো- এটা কলোনি প্রসঙ্গে কোনো নীতিগত অবস্থান হতে পারে না। এ কথা ঠিক যে, কোনো রাষ্ট্রেরই পড়শি রাষ্ট্রের ভেতর নিজের স্বার্থ দেখতে পাওয়া দোষের নয়। কিন্তু তা পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন এসবের সীমা বজায় রেখে। আর সবচেয়ে ভালো হবে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের তৎপরতায় বল প্রয়োগ করে তা পাওয়ার পথের বিপরীতে সদিচ্ছায় পড়শি নাগরিকের মন জয় করে, বা দেয়া-নেয়ার বিনিময় ও বাণিজ্যের মাধ্যমে পাওয়ার চেষ্টা।
গত ৬০ বছরে ভারতের কূটনীতি চর্চা হয়েছে নেপালে একটা বশংবদ দল ও নেতা তৈরি করে নেপালকে নিজের অধীনে রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করতে হবে মনে করে। একালে বশংবদ কারো কাজে লাগে না। আজ দেখা যাচ্ছে নেপালের রাজনৈতিক শক্তি সবাই এক এক করে ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে, নেপালে একমাত্র মাধেসি তরাই জনগোষ্ঠীই ভারতের ভরসা। দুনিয়ার রাজনীতি ও রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ে গ্লোবাল ট্রেন্ড বুঝার ক্ষেত্রে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা যে নাদানিতে আছে এ ব্যাপারটা বুঝতে নেপাল একটা ভালো উদাহরণ। রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা ব্রিটিশ কলোনি এম্পায়ার হতে স্বপ্ন দেখে। একালে এম্পায়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখা মানেই তার দুনিয়ার গতিপ্রকৃতির খবর নেই। বরং এখন এম্পায়ার না হয়েও বহু কিছু ভোগ বা অর্জন করা সম্ভব। বল থাকলেই বড়ভাই সেজে, ক্ষমতা দেখিয়ে এই পথে সব কিছু আদায় করতে হবে বা আদায় হবেই এটা খুব কাজের কথা নয়।
ইতিহাস সাক্ষী নেপালের বিরাট তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ও একটা রিপাবলিকের পক্ষে নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সমবেত করে দেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা ছিল নির্ধারক, অনুঘটকের এবং ইন্টারলকেটর হোস্টের। এমনকি ভারত এমন ভূমিকা না নিলে আমেরিকার পক্ষেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব ও সহজ হতো না। তা হলে এটা আজ জ্বল জ্বল করা প্রশ্ন সেই ভারতকে আজ নেপালের মূলধারার তিন দলসহ সব রাজনৈতিক দল বাদ দিয়ে একমাত্র ভরসা কেন করতে হচ্ছে নাম ও যোগ্যতাহীন মাধেসিদের ওপর? মাধেসিরা নিজেরাই এখনো কোনো পরিপক্ব রাজনৈতিক শক্তি নয়, নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা গঠনে গোনায় ধরে এমন স্টেকহোল্ডার তারা হয়ে উঠতে পারেনি।
এটাই ভারতের রাজনীতিক, আমলা-গোয়েন্দাদের যোগ্যতার সঙ্কটের ইঙ্গিত। গভীর অসুখের ইঙ্গিত। এরা নিজেরা ভালো থাকে না, পড়শিদেরও ভালো থাকতে দেয় না।

[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫