সৌদি রাজকুমারী নোরা বিনতে ফয়সাল আল-সৌদ
সৌদি রাজকুমারী নোরা বিনতে ফয়সাল আল-সৌদ

সৌদি ফ্যাশন জগতের নতুন মুখ রাজকুমারী নোরা

জিও নিউজ

কেবল মাত্র কালো পোশাকে শরীর ঢেকে বাইরে বের হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল সৌদি আরবের নারীদের। তবে সম্প্রতি এই ঐতিহ্যবাহী কালো পোশাকের পরিবর্তে দেশটিতে রঙিন পোশাক চালু হয়েছে। তাদের স্বাভাবিক পোশাকে পরিণত হতে যাচ্ছে রঙিন আবায়া (সৌদি আরবের নারীদের বিশেষ পোশাক)। আর এবার আরো এক বদল আনলেন রাজকুমারী নোরা বিনতে ফয়সাল আল-সৌদ। সৌদি ফ্যাশন জগতের নতুন মুখ তিনি।

চলতি মাসের শুরুর দিকে দেশটিতে আয়োজন করা হয়েছিল একটি ফ্যাশন উইকের। তবে এটি ছিল শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য। সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল দেশে এই ধরনের কোনো অনুষ্ঠান এই প্রথম। সেখানে র‌্যাম্পে হেঁটেছেন মূলত বিদেশি মডেলরাই। সৌদি নারীরা ছিলেন দর্শকের আসনে।

 

এই উদ্যোগের পিছনে ছিলেন ৩০ বছর বয়সী এই রাজকুমারী নোরা। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতার প্রপৌত্রী তিনি।

সৌদি আরবে পোশাক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উৎসাহ দেয়ার বিষয়টি এর আগে কখনওই সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু নোরা আরব ফ্যাশন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট পদে আসার পর ছবিটা বদলাচ্ছে। জাপানের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন রাজকুমারী। সেখানে থাকার সময় থেকেই ফ্যাশন দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি।

 

সৌদির রক্ষণশীল সমাজে মহিলাদের পোশাক বিধি নিয়ন্ত্রণ করে শুধুমাত্র পুলিশ এবং বিচারবিভাগ। সম্প্রতি পোশাকের এই বদলকে রক্ষণশীলতার বিরোধিতা হিসেবে মানতে নারাজ তিনি। কেউ কেউ নারীদের পোশাকের এই পরিবর্তনের বিরোধীতা করছেন। এ ব্যাপারে এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নোরা বলেন, 'আমি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী বুঝতে পারছি। সৌদি আরবের একজন নাগরিক হিসেবে আমি আমার সংস্কৃতিকে সম্মান করি, সম্মান করি আমার ধর্মকে।'

তিনি আরো বলেন, 'আবায়া অথবা আমাদের পোশাক পরার ধরণের কারণে কেউ যদি আমাদের রক্ষণশীল বলেন তাহলে বলব এটা আমাদেরই অংশ। এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ... এমনকি কোথাও বেড়াতে গেলেও আমরা এভাবেই যাই, এটাই আমাদের জীবন।'

 

নোরা আয়োজিত ফ্যাশন উইকে শুধুমাত্র মহিলাদেরই প্রবেশাধিকার ছিল। ক্যামেরাতেও ছিল নিষেধাজ্ঞা। এ নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। কিন্তু নোরা সেই সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, 'রক্ষণশীল হওয়ার জন্য নয়, বরং মহিলারা যাতে স্বচ্ছন্দে শো-গুলো উপভোগ করতে পারেন, তার জন্যই এই ব্যবস্থা করেছি।'

নোরা বলেন, 'এখানে এসে আমি নিরাপদ বোধ করেছি। কারণ ক্যামেরা নিষিদ্ধ থাকায় এখানে কেউ আমার ছবি তুলতে পারছে না। আমি এই ব্যাপরটিতে খুব মজা পেয়েছি।'

 

গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সিবিএস টিভিকে নারীদের পোশাকের ব্যাপারে বলেন, 'ইসলামে শরীয়া আইন খুবই স্পষ্ট। নারীরা পুরুষদের মতোই মার্জিত ও শালীন পোশাক পরবেন।'

তিনি বলেন, 'ইসলামে কালো রঙের আবায়ার বাধ্যবাধ্যকতা নেই। নারীদের ইচ্ছেমতো তাদের সম্মানহানী না হয় এমন শালীন ও মার্জিত পোশাক পছন্দ করার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে।'

যুবরাজরে পাশাপাশি বিশিষ্ট আলেম শেখ আহমেদ বিন কাশিম আল-গামদিও ইসলামে শুধু কালো রঙের আবায়ার অনুমোদনের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। পবিত্র মক্কা নগরীর ধর্মীয় পুলিশের সাবেক এই প্রধান সৌদি মালিকানাধীন আল-অ্যারাবিয়া টেলিভিশনকে বলেন, 'ইসলামে বর্ণিত ঢিলাঢালা পোশাকের অর্থ মার্জিত ও শালীন পোশাক পরা। শুধু কাল রঙের পোশাক পরা নয়।'

 

এখন থেকে রঙিন 'পোশাক' পরতে পারবেন সৌদি নারীরা

সৌদি আরবে খেলাধূলার উপযোগী ও রঙ্গিন আবায়া খুব দ্রুত নারীদের স্বাভাবিক পোশাকে পরিণত হচ্ছে। এক সময় দেশটির কট্টর রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় এই পোশাককে সাংস্কৃতিক বিপ্লব হিসেবে দেখা হতো। গত মাসে লোহিত সাগর তীবরর্তী নগরী জেদ্দায় নারী দৌড়বিদদের ছবি ভাইরালে পরিণত হয়েছিল। খবর এএফপি’র।

ঐতিহ্যবাহী সম্পূর্ণ কালো পোশাকের পরিবর্তে দেশটিতে রঙ্গিন পোশাক চালু হওয়ায় নতুন করে এই পোশাক বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

সৌদি আরবে জনসম্মুখে নারীদের সম্পূর্ণ শরীর কালো পোশাকে ঢাকা বাধ্যতামূলক।

কেউ কেউ অনলাইনে ক্ষোভ প্রকাশ করে একে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন।

কিন্তু নারীদের পোশাক সম্পর্কে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর বিরোধীরা আর মুখ খোলেনি। তিনি বলেছেন, ইসলামে আবায়া বাধ্যতামূলক নয়।

নতুন ধরনের পোশাকের ডিজাইনার ইমান জোহারি জেদ্দায় তার ফ্যাশন স্টুডিও থেকে বলেন, ‘এই ধরনের পোশাকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’

এই নারী ডিজাইনার আরো বলেন, ‘বিভিন্ন রঙের কাপড় পরাও নারীদের এক ধরনের ক্ষমতায়ন।’

৪৩ বছর বয়সী এই ডিজাইনার সবুজ, বাদামী-ধূসর ও সাদা রঙকে প্রাধান্য দেন। তিনি ফরাসী পপলিনসহ ন্যাচারাল ফেব্রিক্সের ওপর কাজ করেন। কারণ এগুলো ক্রীড়াবিদদের ঘর্মাক্ত শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে না বলে তাদের জন্য আরামদায়ক।

ইমান ২০০৭ সালে নারীদের জন্য এই স্পোর্টস আবায়া ডিজাইন করেন।

তিনি বলেন, ‘এখানে কিছুটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বিষয় রয়েছে। কিন্তু আমি এটা আমার নিজের জন্য করছি।’

ইমান সৌদি আরবের প্রচলিত ধারণা ‘কালো না হলে আবায়া নয়’ ভেঙ্গে দিয়েছেন।

নতুন এই ফ্যাশনটি ব্যাপক চলছে।

সৌদি আরবে নারীদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটছে।

কর্তৃপক্ষ ঐতিহাসিক ডিক্রি জারি করে এ বছরের জুন মাস থেকে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছে।

এটি কর্তৃপক্ষের একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। এছাড়াও প্রথমবারের মতো নারীদের স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা উপভোগ করার অনুমতিও দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও সরকার নারীদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালু করতে চাইছে এবং মেয়েদের জন্য শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে।

২০১৪ সালে দেশটিতে নারীদের খেলাধূলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়।

সৌদি কর্মকর্তারা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, নারীরা আগামী বছর রিয়াদ আন্তর্জাতিক ম্যারাথনে অংশ নিতে পারবে। এর আগে এতে শুধু পুরুষরাই অংশ নিতে পারত।

দীর্ঘ দিন ধরেই ধর্মীয় পুলিশ জনসম্মুখে নারীদের শরীর চর্চায় বাধা দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় পুলিশের ক্ষমতা কমানো হয়েছে।

যুবরাজ সালমান গত মাসে সিবিএস টিভিকে বলেন, ‘ইসলামে শরীয়া আইন খুবই স্পষ্ট। নারীরা পুরুষদের মতোই মার্জিত ও শালীন পোশাক পরবেন।’ (১৮ এপ্রিল ২০১৮ প্রকাশিত সংবাদ)

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.