এক বাচ্চার কোচিং খরচ মাসে ২০ হাজার টাকা

পরীক্ষা নিয়ে অস্থিরতা ঘরে ঘরে-৩
মেহেদী হাসান

রাজধানীর কাকরাইলের একজন অভিভাবক জানান, তার পঞ্চম শ্রেণীপড়–য়া এক শিশু শিক্ষার্থীর পেছনে মাসে ২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে শুধু কোচিং বাবদ। এ ছাড়া বাসায় রয়েছে আলাদা গৃহশিক্ষক। স্কুলের কাস, গৃহশিক্ষক থাকার পরও কেন একজন শিশু শিক্ষার্থীর পেছনে শুধু কোচিং বাবদ মাসে ২০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে কেন জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ অভিভাবক জানান, জিপিএ ৫ পেতে হবে যেকোনো মূল্যে। তিনি জানান, তার স্বামী ঢাকার পাশের একটি জেলা শহরে ব্যবসায় পরিচালনা করছেন। তারা সেখানে থাকতে পারতেন। কিন্তু শুধু ছেলের ভালো পড়ালেখা, ভালো রেজাল্টের জন্য ঢাকায় বাসা নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া ঢাকায় থাকার তাদের আর কোনো কারণ নেই বলেও জানালেন তিনি।
ছেলের কোচিংয়ের পেছনে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচের আরো একটি কারণ জানালেন এ অভিভাবক। তার ছেলে ইংলিশ ভার্সনে যে স্কুলে পড়ে সেখানে নতুন ইংলিশ ভার্সন খোলা হয়েছে। স্কুলের শিক্ষকেরা ইংরেজি ভালো জানে না। তা ছাড়া সমাপনী পরীক্ষা হবে সব সৃজনশীল পদ্ধতিতে। ওই অভিভাবকের আশঙ্কা ইংরেজি ভালো করে না জানলে তার ছেলের ভালো রেজাল্ট হবে না। শিশু শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলের কী বোঝে? তারা তো বাংলায়ই ভালো করে লিখতে পারে না। ইংরেজিতে কী লিখবে। তাই ইংরেজি শেখার জন্য মাসে এত টাকা খরচ করতে হচ্ছে তাদের।
এ অভিভাবক জানান, সমাপনী পরীক্ষা না থাকলে আমাদের এত টাকা খরচ করতে হতো না। এত হয়রানিও হতে হতো না। স্কুলে যদি শিক্ষকেরা একটু ভালো করে পড়াতেন তবু রক্ষা হতো। তিনি আফসোস করে বলেন, ভালো স্কুলে পড়ার জন্য ঢাকায় আছি। ভালো স্কুলে ভর্তি হলেও ভালো পড়ালেখা হচ্ছে না। কাসে বসে শিক্ষকেরা যদি শুধু বইটা রিডিং পড়ার ব্যবস্থা করত, তবু কিছু উপকার হতো ছাত্রছাত্রীদের। তারা কী এক সপ্তাহ ধরে একটা অধ্যায়ও ভালো করে পড়াতে পারে না? কিন্তু শিশু শিক্ষার্থীর কাছে যা শুনি, তাতে আমি বিস্মিত, তারা কাসে আসলে কী পড়ায়। কাসে শিক্ষকেরা গাইড দেখে পড়ায়। তা ছাড়া বই খুবই কঠিন। এ অবস্থায় কোচিং প্রাইভেট ছাড়া আমাদের উপায় কী। সমাপনী পরীক্ষা না থাকলে আমরা ঠাণ্ডা মাথায় যতদূর পারি বই পড়ে শিশু শিক্ষার্থীদের শেখানোর ব্যবস্থা করতাম। পরে তারা প্রয়োজনমতো নিজেরা শিখে নিত। কিন্তু এখন সমাপনী পরীক্ষা আর ভালো রেজাল্টের প্রতিযোগিতার কারণে তাদের খুবই কঠিন আর ভারী পড়া জোর করে গেলানো হচ্ছে।
তীব্র ক্ষোভ সৃজনশীলের বিরুদ্ধে
রাজধানীর উইলস লিটল ফাওয়ার স্কুলের অভিভাবক ইসরাত ফেরদৌস সৃজনশীল পদ্ধতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিশু শিক্ষার্থীরা পড়বে বই কিন্তু প্রশ্ন আসবে বাইরে থেকে। এ কেমন ভয়ানক নির্যাতন শিশু শিক্ষার্থীদের প্রতি।
অনেক অভিভাবক বলেন, বাইরে থেকে প্রশ্ন আসায় শিশু শিক্ষার্থীরা এখন আর মূল বই পড়তে চায় না। কারণ তারা বলে বই পড়ে কী হবে। বই থেকে প্রশ্ন আসবে না। অভিভাবকেরা বলেন, মূল বই থেকেই প্রশ্ন করা উচিত এবং শিশু শিক্ষার্থীরা মূল বই পড়ে যেন উত্তর দিতে পারে সে অনুযায়ী প্রশ্ন করা উচিত।
রাজধানীর বিভিন্ন নামকরা স্কুলের সামনে বসে অভিভাবকদের সাথে কথা বলার সময় সৃজনশীলের ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকেরা। তাদের মতে, নামকরা স্কুলের শিক্ষকেরা সৃজনশীল বোঝেন; কিন্তু এত ছোট শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর সৃজনশীল চাপিয়ে দেয়ায় অতিষ্ঠ অভিভাবকেরা। তারা বলেন, সৃজনশীলের নামে শিশু শিক্ষার্থীদের মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। বইয়ে বিভিন্ন বিষয় খুবই সংক্ষিপ্ত করে রাখা হয়েছে। বইয়ে এক লাইন লিখে শিশু শিক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে এটিকে তিন লাইন কর। বড় কর। এটি কেমন কথা। আবার বইয়ে আদৌ নেই এমন বিষয় শিশু শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে। শিশু শিক্ষার্থীরা তা কোথায় পাবে। যে বিষয়ে কখনো তাদের পড়ানোই হয়নি, সে বিষয়ে তারা কেমন করে লিখবে? একজন অভিভাবক বলেন, সৃজনশীলের কারণে বই এমনভাবে লেখা হয়েছে যে, চতুর্থ শ্রেণীর শিশু শিক্ষার্থীরা এখন কয়েক বছর আগের চতুর্থ শ্রেণীর বই সংগ্রহ করে পড়তে হবে উত্তর শেখার জন্য। তিনি বলেন, এটি খুবই আশ্চর্য বিষয় যে, বইয়ে নেই তেমন বিষয় জানতে চাওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে।
রোখসানা ও শাহানারা বেগম নামে দুইজন অভিভাবক বলেন, এত ছোট শিশু শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলের কী বোঝে? শিশু শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা নিয়ে বিরাট ঝামেলায় আছি ভাই।
অভিভাবকেরা বলেন, সমাপনী পরীক্ষা আর সৃজনশীলের কারণে কোচিং ছাড়া কোনো উপায় নেই। আবার স্কুলের শিক্ষকদের কাছে কোচিং প্রাইভেট না পড়লে নানাভাবে হয়রানি করেন শিক্ষকেরা। কাসে সরাসরি শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য বলেন অনেক শিক্ষক।
একজন অভিভাবক বলেন, আগে বাংলা এবং ইংরেজি পরীক্ষায় একটি করে রচনা লিখতে হতো। কিন্তু এখন সৃজনশীলের নামে যে নিয়ম করেছে, তাতে সব প্রশ্নের উত্তরই একটি করে রচনা। এ কেমন সৃজনশীল।
আরেকজন অভিভাবক বলেন, আমার শিশু শিক্ষার্থী স্কুলের একটি মডেল টেস্টে সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েও ৮০ নম্বরের মধ্যে ৪০ পেয়েছে। কারণ জানতে চাওয়ায় শিক্ষক বলেছেন, উত্তর আরো বড় লিখতে হবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উত্তর দেয়া হয়ে গেলেও ইনিয়ে বিনিয়ে লিখতে হবে- এটা কেমন কথা?
অভিভাবকেরা জানান, সৃজনশীলের জন্য যে সময় দেয়া হয় তাতে কোনো অবস্থাতেই শিশু শিক্ষার্থীরা সব প্রশ্নের ঠিকমতো উত্তর লিখতে পারবে না।
সব মিলিয়ে ছোট শিশু শিক্ষার্থীদের এ পরীক্ষার কারণে আমরা ভীষণ অস্থিরতার মধ্যে আছি বলে জানান অভিভাবকেরা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.