ঢাকা, বুধবার,২৪ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

আসামে মুসলমান

আত্মপক্ষ

এবনে গোলাম সামাদ

১৩ জানুয়ারি ২০১৮,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আসামের সবচেয়ে বড় শহর গৌহাটি। এখন এই শহরের দিসপুর নামক শহরতলিতে করা হয়েছে বর্তমান আসাম প্রদেশের রাজধানী। আমরা বাংলায় যে শহরটিকে বলি গৌহাটি, আসামি ভাষায় তার নাম গুয়াহাটি। এর আগের নাম ছিল গুবাক-হাটি। নামটা আসলে ফারসি। ফারসিতে গুবাক বলতে বোঝায় সুপারিকে। আর গুবাক-হাটি বলতে বোঝায় সুপারি বিক্রির হাট। বাংলার স্বাধীন সুলতানেরা গৌহাটি পর্যন্ত দখল করেছিলেন। সম্ভবত সে সময় থেকেই হতে পেরেছিল এই নামটি দেয়া। বাংলার সুলতান শাম্স-উদ-দীন ইলিয়াস শাহ্রে পুত্র সিকান্দার শাহ্্ ১৩৬৭ সালে কামরূপে একটি টাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার পুত্র গিয়াস-উদ-দীন আজম শাহ্্ গৌহাটিতে একটি দুর্গ নির্মাণ করিয়েছিলেন। গৌহাটিতে প্রাপ্ত আরবি ভাষায় লিখিত একটি শিলালিপি থেকে এ তথ্য জানতে পারা যায়। শিলালিপিটি কামরূপ অনুসন্ধান সমিতির জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বাংলার বিখ্যাত সুলতান হোসেন শাহ্্ কামরূপ অধিকার করেছিলেন। কামরূপ বলতে বোঝাত, বর্তমান আসামের পশ্চিম ভাগকে। ব্রিটিশ শাসনামলে কামরূপ বলতে বুঝিয়েছে আসামের একটি জেলাকে। গৌহাটি ছিল এর সদর এবং আসামের সর্বপ্রধান শহর। একসময় কামরূপ বলতে বোঝাত বর্তমান আসমের পশ্চিম ভাগ এবং বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর ভাগের কিছু অংশকে একত্রে। কামরূপের আরেকটি নাম ছিল ‘প্রাগজ্যোতিষ’। মুঘলরা পশ্চিম আসামকে বলতেন কামরূপ। তারা আসাম বলতে বোঝাতেন কেবল বর্তমান আসামের পূর্ব ভাগকে। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তার নিযুক্ত বাংলার নবাব মীর জুমলা আসাম জয় করতে গিয়ে গরগ্রাম পর্যন্ত জয় করেছিলেন। গরগ্রাম তখন ছিল আসামের রাজধানী। কিন্তু বন্যায়, বৃষ্টিতে, খাদ্যাভাব ও সৈন্যদের অসুস্থতার কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন ঢাকায়। এই যুদ্ধে ব্যবহৃত মীর জুমলার একটা কামান এখনো ঢাকায় রক্ষিত আছে।
আসাম নামটির উদ্ভব নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। বিখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ারসনের মতে, আসাম নামটির উদ্ভব হয়েছে সান শব্দ থেকে। সানরা বাস করত বর্তমান চীনের উন-নান (Yun-Nan) প্রদেশে। এখনো তারা সেখানে বাস করে। তাদের একটি শাখা উত্তর বার্মায় (মিয়ানমার) এসে উপনিবিষ্ট হয়। উত্তর বার্মায় উপনিবিষ্ট সানদের একজন নেতা এসে জয় করেন পূর্ব-আসাম; যা এখন শিব সাগর ও ডিব্রুগড় জেলা। এরপর তারা সারা আসামে অর্থাৎ কামরূপ অঞ্চলও দখল করতে সক্ষম হয়। সানরা তিব্বতি চীনা পরিবারভুক্ত (Sino-Tibetan) ভাষায় কথা বলে; আর্য পরিবারভুক্ত ভাষায় নয়। সানদের রাজা চুচেন জাফা (Chuchen Jpha) খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন। তার রাজত্বকাল থেকে আসামি বা অহমিয়া ভাষা সমগ্র আসামের রাজভাষা হয়ে উঠতে আরম্ভ করে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। পুরনো এই আসামি ভাষা ছিল কামরূপী বাংলার আধারে গঠিত। কিন্তু বর্তমান আসামে যে ভাষা চলেছে, তাতে আছে শিব সাগর ও ডিব্রুগড়ের কথ্যভাষার শব্দের প্রাধান্য। অর্থাৎ সান ভাষার কিছু প্রবণতা। কিন্তু মানবধারার দিক থেকে গোটা আসামে রয়েছে মঙ্গোলীয় মানবধারার বিশেষ প্রভাব। আর্য বলতে সাধারণত যে ধরনের মানুষের চেহারা আমাদের মনে আসে, অধিকাংশ আসামির চেহারার মিল তার সঙ্গে হয় না। আসামবাসীর মাথার চুল সাধারণত ঋজু ও খড়খড়ে। অর্থাৎ তাদের মাথার চুল মাটিতে পড়লে সোজা হয়ে থাকে। দুই মাথা সামান্য একটু বাঁকা হয় মাত্র। এদের মুখে দাড়িগোঁফ হতে দেখা যায় কম। এদের চোখের উপরের পাতায় থাকতে দেখা যায় বিশেষ ধরনের ভাঁজ। এ জন্য এদের চোখকে দেখায় ছোট এবং বাঁকা। এদের গণ্ডের হাড় হতে দেখা যায় উঁচু। এর ফলে সাধারণভাবে এদের মুখমণ্ডলকে মনে হয় সমতল। এদের গায়ের রঙ হতে দেখা যায় হরিদ্রাভ-বাদামি। তবে ভারত সরকার এখন এদের আর্য বলে প্রমাণ করতে চাচ্ছে। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিকেরা আসামি ভাষাকে বাংলার মতো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারে (আর্য) স্থাপন করলেও বলেন না যে, এদের উদ্ভব হয়েছে আদি আর্য মানবধারা থেকে। গ্রিয়ারসনের মতে, বাংলা ও আসামি ভাষার উদ্ভব হয়েছে একই মাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে। এদের সম্বন্ধ খুবই কাছের। গ্রিয়ারসনের মতে- ভোজপুরী, মাগধী, মৈথিলি, উড়িয়া, আসামি এবং বাংলা হলো এতই কাছের ভাষা যে, এদের সবার জন্যই একটি ব্যাকরণ রচনা করা যেতে পারে। আগে মৈথিলি, বাংলা ও অহমিয়া ভাষা একই অক্ষরে লিখা হতো। কিন্তু এখন বিহারে মৈথিলি ভাষা লেখা হচ্ছে নাগরিতে। তবে বাংলা ও অহমিয়া আগের মতোই এখনো লিখা হচ্ছে একই অক্ষরে। যার উদ্ভব হয়েছিল বর্তমান বিহারের ত্রিহুতে (মিথিলা)। বাংলা ও অহমিয়া অক্ষরের মধ্যে পাথর্ক্য হলো, অহমিয়া ‘ব’ অক্ষর হলো অন্তস্থ ‘ব’ এবং অহমিয়া ভাষায় ‘র’ লেখা হয় এই অন্তস্থ ‘ব’-এর পেট কেটে। অহমিয়া ভাষায় ‘খ’-এর উচ্চারণ হয় কতকটা ফারসি ‘খে’ অক্ষরের মতো।
আসামে শতকরা ৬১.৪৭ জন হলো হিন্দু। মুসলমান শতকরা ৩৪.২২ জন। বাদবাকিরা অন্যান্য ধর্মের লোক। আসামের ৩২ জেলার মধ্যে ৯টি জেলা হলো মুসলিমপ্রধান। এগুলো হলো : ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বড়পেটা, মরিগাঁও, নওগাঁও, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দী, দারাঙ্গ এবং বনগাইগাঁও। আসামে সব মুসলমান যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া, নিশ্চয় তা নয়। অনেক মুসলমানকে চেহারার দিক থেকে আসামিদের থেকে আলাদা করে চেনা যায় না। বাঙালিদের গায়ের রং কালো। মাথার আকৃতি সাধারণত মাঝারি। চোখ আয়ত এবং মুখে দাড়িগোঁফের প্রাধান্য থাকতে দেখা যায়। কাছাড় জেলায় অনেক মুসলমানের বাস। তাদের পূর্বপুরুষ সেখানে গিয়েছিল সিলেট জেলা থেকে। ব্রিটিশ শাসনামলে ধুবড়ি ও গোয়ালপাড়া জেলা রংপুর থেকে কেটে যোগ করা হয় আসামের সঙ্গে। এ দু’জেলার ভাষা হলো বাংলা। আসামে ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার কিছু দিন পর ১৯৫০ সালে গোয়ালপাড়ায় আরম্ভ হয় ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন। অথচ গোয়ালপাড়া একসময় ছিল বাংলাদেশেরই অংশ। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মে আসামের শিলচরে একদল বাঙালি হিন্দু দাবি করেন, আসামে কেবলমাত্র অহমিয়া ভাষাকেই প্রাদেশিক সরকারি ভাষা করা যাবে না এবং বাংলা ভাষাকে করতে হবে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা। এই বিক্ষোভকারীদের ওপর আসাম সরকার গুলি চালায়। ফলে ১১ জন নিহত হয়। কিন্তু আসাম সরকার শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয় আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিতে। ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার আসাম দখল করার পর আসামকে করেছিল তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ। ১৯০৬ সালে গঠিত হয় Eastern Bengal And Assam Province। এরপর আসামকে একটি চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশ হিসেবে গঠন করা হয়, যার রাজধানী হয় শিলং। ইস্টার্ন বেঙ্গল-আসাম প্রভিন্সের রাজধানী করা হয়েছিল ঢাকা। নবগঠিত আসাম প্রদেশের সাথে যুক্ত করা হয় সাবেক সিলেট জেলাকে। ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমা ছাড়া আর সব ক’টি মহকুমা গণভোটের মাধ্যমে যোগ দেয় পাকিস্তানে। অর্থাৎ আসাম ও বাংলাদেশের মধ্যে নানাভাবেই হতে পেরেছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। হঠাৎ করেই যে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে মুসলমানেরা গিয়ে উপস্থিত হয়েছে, তা-ও বলা সঙ্গত নয়।
বাংলাদেশ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর দলে দলে বাংলাভাষী মুসলমানরা আসামে গেছে, এমন প্রমাণ নেই। যেখানে এখনো বাংলাদেশ থেকে মানুষ বেআইনিভাবে ভারতে যেতে বিএসএফের গুলি খেতে হচ্ছে, সেখানে এত মুসলমান ভারতের আসামে কী করে যেতে পারে, সেটা আমাদের উপলব্ধিতে আসে না। আসামের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশেরও সীমান্ত আছে। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ থেকে বাংলাভাষী মুসলমান একরাষ্ট্র বলে সহজেই আসামে ঢুকতে পারে। তাদের গুলি করে মারার কোনো আইন কার্যকর নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের তাড়াবার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেননা, এদের একটি বিরাট অংশ হতে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নয়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলা থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসাম রাজ্য সরকারের সমালোচনা করার পর, আসাম রাজ্য সরকার তার বিরুদ্ধে আসামের আদালতে মামলা রুজু করেছে। ভারতের সংবিধান অনুসারে এ রকম মামলা আদৌ করা যায় কি না, তা আমরা জানি না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ব্রিটিশ শাসনামলে আসাম প্রদেশে কোনো হাইকোর্ট ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। থাকার কথা নয় কোনো সমুদ্রবন্দর। আসামকে ব্যবহার করতে হতো কলকাতা ও চট্টগ্রাম বন্দর। এর মাধ্যমে তাদের মূল অর্থকরী রফতানিপণ্য চা বিদেশে রফতানি হতো। আসামে বর্তমানে হাইকোর্ট আছে। এই হাইকোর্ট কেবল আসামের জন্য নয়; মেঘালয়, মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ও ত্রিপুরা প্রদেশেরও জন্য। আসামের হাইকোর্ট গৌহাটিতে অবস্থিত। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৮০ এর দশকে গঠিত হয়েছিল উলফা ULFA= United Liberation Front of Assam)। এদের লক্ষ্য ছিল আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মিজোরাম, মনিপুর, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশকে নিয়ে একটি পৃথক স্বাধীন ‘আসাম ফেডারেশন’ গঠন। এই আন্দোলন বর্তমানে খুব স্তিমিত হয়ে পড়লেও আবার মাথাচাড়া দেয়ার সম্ভাবনা আছে। আসামে যাতে এই আন্দোলন আবার জোরালো হতে না পারে, আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলমান বিতাড়ন সম্ভবত এ জন্যই। জানি না, আসামে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলমানদের দশা আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদের মতোই হয়ে উঠবে কি না।হ
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

গত সংখ্যার সংশোধনী : গত লেখাতে (৬ জানুয়ারি ২০১৮) ভুলবশত ছাপা হয়েছিল : ১৭৬৮ সাল থেকে ১৭৭৯ সাল পর্যন্ত একটানা হয়েছিল খরা। ১৯৭০ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিল খুবই কম। তাই দুর্ভিক্ষ নিতে পেরেছিল ভয়ঙ্কর রূপ।’ সেখানে আসলে হবে : ১৭৬৮ সাল থেকে ১৭৭৯ সাল পর্যন্ত একটানা হয়েছিল খরা। ১৭৭০ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিল খুবই কম। তাই দুর্ভিক্ষ নিতে পেরেছিল ভয়ঙ্কর রূপ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫