ঢাকা, রবিবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

আসাম পাহাড়ে আর মনের ঘৃণায় আটকে গেছে সঙ্কট

গৌতম দাস

০৯ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৮:০২


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

‘বাংলাদেশী’ বা ‘মুসলমান’ নামে আর এক ক্লিনজিং ও নিধন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে সীমাহীন দুর্দশা আর শরণার্থীর ঢল। এমন কোনো পরিচিত দৃশ্য কী আমাদের সামনে আরেকটা দেখতে হবে? রোহিঙ্গা সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সুরাহার দেখা পাওয়া যায় না, এর আগেই প্রায় একই ধরনের নতুন আরেক ফেনোমেনা উঠে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তা হলো- ভারতের আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তারা কথিত ‘বাংলাদেশী’, ‘মুসলমান’, ‘ফরেনার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করতে যাচ্ছে। এক কথায় বললে আসাম বা অসমিয়রা এক চরম জেনোফোবিয়াতে ভুগছে। ইংরেজি জেনোফোবিয়া (Xenophobia) শব্দের জেনো-এর তুল্য প্রচলিত বাংলা হলো- ফরেনার বা বিদেশী। এভাবে পুরো শব্দের অর্থ হলো- ফরেনার বা বিদেশী ভীতি। যদিও এই শব্দের আসল অর্থ হলো- ‘অ-পর’, যে আমার মতো নয়। ফলে তাকে দেখতে পারি না, ঘৃণা করি। যেমন- কেউ আমার মতো নয়, সে আমার ধর্মের নয়, অথবা আমার মতো অহমিয়া নয়, অথবা আমার মতো এশিয়ান নয়। ফলে সে আমার ‘অ-পর’। ‘অসমে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমিয়াদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সব গ্রাস করে ফেলছে।’ এই হলো অসমিয়াদের সবচেয়ে কমন আক্ষেপ। এই ‘অপর-ভীতি’ বা জেনোফোবিয়াতে ভুগছে আসাম। অথবা সম্ভবত বলা ভালো, জেনোফোবিয়াতে ভোগানো হচ্ছে। কারা ভোগাচ্ছে, কারা এরা?

বলাবাহুল্য, ‘অপরে আমাদের সব গ্রাস করে ফেলল’। এই আক্ষেপের বয়ান তৈরির পেছনে আধা সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প তারা জড়ো করেছে, অনুমান করা যায়। এখানেই সবচেয়ে বড় মিল দেখা যাবে বর্মিজদের সাথে। দ্বিতীয় এঙ্গলো-বার্মিজ যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৫১ সালে। এর আগেই ১৮৩৮ সালের মধ্যে অহম রাজা ও আশপাশের অন্যান্য রাজা যেমন কাছাড় রাজ্য মিলিয়ে পুরো আসামই ব্রিটিশ কলোনির দখলে ও শাসনাধীন চলে যায়। বার্মিজ রাজার আসাম অঞ্চল দখল নিতে যাওয়া থেকে যার সূত্রপাত হয়েছিল। তাই অসমিয়াদের একালের আক্ষেপের বয়ানে গল্পের একটি উপাদান হলো- ব্রিটিশ কলোনি তাদের দখল করে নিয়েছিল। যদিও এর জন্য এখনকার বাংলাদেশ বা এর কোনো বাসিন্দা আমরা কেউ দায়ী নই। তবু জেনোফোবিয়ার ভিকটিম-বোধের গল্প এমনই হয়। এর ওপর আদি পাপ আমরা তো মুসলমান। ফলে যেকোনো সমস্যার জন্য আমাদের দায়ী করা। তবে আমাদের আরেক অপরাধ ছিল যে, যেহেতু ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক অধীনে একটি ব্রিটিশ কমিশনারেটের কর্তৃত্বে রেখে শাসন করা হয়েছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। আর এর জন্য যেন বাংলাদেশ, মুসলমান বা বাঙালিরা দায়ী, এমন অনুমান ও গল্পও তাদের ঝুলিতে আছে। ভিকটিম-হুড যারা বিক্রি করে, তারা এমনই করে।

আর ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হলে আসাম সরাসরি পূর্ববঙ্গের সাথে ট্যাগ হয়ে নতুন প্রদেশ হয়। তাতেও তারা আরো অখুশি ছিল। যদিও (১৯০৫-১৯১১) মাত্র এই ছয় বছর আসাম পূর্ববঙ্গের সাথে ছিল। তবে ততদিনে আসাম ব্রিটিশদের চোখে নগদ অর্থকরী ফসল, চা উৎপাদনের এক খনি যেন। কিন্তু সেকালের চা উৎপাদনের শ্রমিক কারা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশেরা অসমিয়াদের পছন্দ না করে বিপুল শ্রমিক মাইগ্রেট করে এনেছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক রিপোর্টের মতে, এই শ্রমিকেরা মূলত ট্রাইবাল, তবে ছোটনাগপুর উপত্যকা মানে সেকালের বিহারের ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড (যা এখন দুটোই আলাদা রাজ্য) থেকে এবং বিহারের বাকি অংশ থেকে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (কয়েক বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আলাদা হওয়া রাজ্য) এসব অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া লর্ড কার্জনের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেন পূর্ববঙ্গ থেকেও আনা হয়। সম্ভবত পড়শি ও দক্ষ কৃষিকাজ জানা লোক বলে।

তবে এর আরেকটা বড় কারণ আছে। ব্রিটিশ-ভারতের ‘ভারত শাসন আইন-১৯৩৫’ অনুসারে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রথম প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থানীয় নেটিভদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় শাসনে সিলেক্টেড স্থানীয় নেতা নেয়া হতো। তার পুরো আনুষ্ঠানিক নাম মৌলবি সাইদ স্যার মোহম্মদ সাদদুল্লাহ। গৌহাটির সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাদদুল্লাহ পরে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ও সরকারি প্লিডারও ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের আসাম প্রদেশের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন। এর আগে তিনি ১৯১৯ সালের সরকারেও সিলেক্টেড প্রতিনিধি ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গোপীনাথ বরদোলাই। এমনকি স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার কাজে যে ৯ সদস্যের খসড়া কমিটি হয়েছিল, তিনি সেখানে একজন ছিলেন। তিনিও পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষক নিয়ে গেয়েছিলেন, ধান চাষে বাংলার অভিজ্ঞতায় বেশি ফসল এরা ফলাতে পারে এই বিশ্বাসে। এসব মিলিয়ে মুসলিম জনসংখ্যা, ১৯০১ সালে আদমশুমারিতে ছিল আসামের মোট জনসংখ্যার ১২.৪ শতাংশ। এরপর সেটা মাইগ্রেটেড হয়ে আসা জনসংখ্যার কারণে ৪০ বছরের মধ্যে ১৯৪১ সালে দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছিল, ২৫.৭২ শতাংশ। তবে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সবচেয়ে বড় মুসলিম মাইগ্রেশন। তবে এটা ব্রিটিশ-ভারতে যখন দাওয়াত দিয়ে মাইগ্রেট করে বাঙালি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের ৩০ বছরে ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশ কমে ২৪.৫৬ হয়েছিল। এর পরের ১০ বছরে এই প্রথম মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৮১ সালে ৪ শতাংশ বেশি হয়ে ২৮.৪৩ শতাংশ হয়। এর পরের ১০ বছরে জনসংখ্যা ১৯৯১ সালে আরো ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৩০.৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে এখন মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশ।

তাই সবচেয়ে হইচই শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এক উপনির্বাচন কেন্দ্র করে। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মুসলমান অনুপ্রবেশ’ হচ্ছে। প্রমাণ করে এমন তথ্য না থাকলেও এটি একটি মিথ, একটি পারসেপশন মানে ভোটে জেতার পারসেপশন। এ ছাড়া অনেক গবেষক দেখিয়েছেন এর কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়েনি। এ ছাড়া অন্য যেসব ‘রাজনৈতিক পারসেপশনের অভিযোগ’। যেমন- বাংলাদেশের সাথে আসামের সীমান্ত এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বেশি- অথচ শুমারিতে এটাও প্রমাণ হয়নি। আবার এমনই আরেক অভিযোগ, অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের তুলনায় আসামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি, মানে মুসলিম অনুপ্রবেশকারী এসেছে। সেটাও তুলনীয় ফিগার দিয়ে গ্রাফ একে তুলনা করে দেখা গেছে, এই অভিযোগও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আদমশুমারির তথ্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধারণাকে সমর্থন করে না। তবে এটা হতে পারে যে, আসামের ভেতরেই ১৯৮১ সাল থেকে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানদের জন্মহার বেশি হতে শুরু করেছে। যেহেতু এটি শতকরা হিসাবে অর্থাৎ মোট যোগফল ১০০ থাকবে। ফলে হিন্দুদের জন্মহার কমাটাও তুল্যপরিমাণ মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে দেখাবে।

এমনিতেই সাধারণভাবে জন্মহার বাড়া-কমাটা দেখা যায়- শহরায়নের হার বেশি হলে জন্মহার কমে। হিন্দুদের শহরায়ন বা শহুরে চাকরিজীবী পেশা গ্রহণ মুসলিমদের তুলনায় বেশি হলে হিন্দু জন্মহার কমেছে- এর একটা কারণ হতে পারে। মূল কারণ কৃষিকাজ বা প্রত্যক্ষ শ্রম বেচে খাওয়া বাবা-মায়েদের সন্তান বেশি নেয়ার ঝোঁক থাকে। কারণ সে ক্ষেত্রে সন্তান কম বয়স থেকেই নিজে আয় করতে পারে বা উল্টা বাবাকে শ্রমআয় দিয়ে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু শহুরে বা শিক্ষিত চাকুরেদের পেশার বাবা-মায়েরা সন্তান শিক্ষিত করতে গিয়ে উল্টা তাদের মানুষ করার খরচ কমাতে জন্মহার কম রাখে। মুসলিম জন্মহারের তুলনায় বেশি দেখানোর সম্ভাব্য কারণ এটিই। মূল কথা, কারণটি পরিসংখ্যান ফিগার ঘেঁটে বের করা যেত। কিন্তু এর মানেই মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীর’ উপস্থিতির প্রমাণ এটি- এ কথা ভিত্তিহীন। 

আসলে ১৯৪৭ সালের পরই এক মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় উঠেছিল। এরই সাক্ষ্য হয়ে আছে ১৯৫১ সালের NRC 1951 (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন)। এটি ১৯৫১ সালের আদমশুমারির পরই সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র আসাম প্রদেশেই রেজিস্টার্ড নাগরিকদের তালিকা তৈরি করা, অন্য কোনো রাজ্যে এনআরসি নেই। মুসলমানেরা বেড়ে গেল কি না বা মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা তখন থেকেই। এমনকি এই অহমিয়াবোধ হিন্দু বাঙালিদেরও বিপক্ষে। আর শুরুতে এই রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছে আসাম কংগ্রেস। যদিও খোদ নেহরু বা ইন্দিরা গান্ধী এই উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ পছন্দ করেননি। তবে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে থামাতেও পারেননি। এর নিট ফলাফল হলো- এর পর থেকে আসামের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব কংগ্রেসের দেখানো পথে, তবে অন্যান্য দলের হাতে চলে যায়। ‘অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ সংক্ষেপে আসু এটাই আসামের বড় ছাত্র সংগঠন। এই সংগঠন এনআরসির নাগরিকের তালিকা তৈরি শেষ করে এর ভিত্তিতে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বের করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে ছাত্র সংগঠন এমন দাবির অর্থ হলো কংগ্রেস দলের কেন্দ্র প্রদেশ কংগ্রেসের মুখ বন্ধ রেখেছে তাই। ফলে আগামীতে এই ছাত্র সংগঠনই নতুন রাজনৈতিক দল খুলবে, যেটা তখন তৈরি নেই। ১৯৮৩ সালে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার নির্বাচন ছিল। আসু নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। কংগ্রেস ছাড়া আর কোনো দল এতে অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু মুসলমান ভোটারেরা কংগ্রেসের প্ররোচণায় ভোট দিতে গিয়েছিল।

আসামের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান চারটির একটি- বোড়ো ট্রাইব, অনেকে এদেরই আদি অহমিয়া মনে করে। ট্রাইবের নামে এক আঞ্চলিক দল আছে তাদের। এদের পরে ২০০৩ সাল থেকে চারটি জেলা নিয়ে এক এলাকায় স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে। সেই সাথে ৭৫ ভাগ সংসদীয় আসন তাদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু এতে সমস্যা উল্টা। ওই চার জেলায় মুসলমানসহ অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আছে। বোড়োরা এখন এসব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব রুখে দিতে চায়, রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত করতে চায়। নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিতে বাধা দেয় ইত্যাদি। এরাই ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে নিলা নামে এক গ্রামে ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় দুই হাজার জন মুসলমানকে হত্যা, সাথে শিশু ও নারীদের আহত এবং নির্যাতিত হয়, নিলা ম্যাসাকার নামে এটি পরিচিত। একটি ডকুমেন্টারি সিনেমা হয়েছে সার্ভাইভারদের নিয়ে। পরে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনেও (মোদি নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর) একইভাবে আক্রমণ করা হয়েছে।

১৯৮৩ সালের মুসলমান নিধন হলেও এ নিয়ে আজো কোনো বিচার আদালত কিছু হয়নি। তবে ইন্দিরা গান্ধীর (তিনি তখনো বেঁচে, নিহত হয়েছেন অক্টোবর ১৯৮৪) প্রতিক্রিয়া কিছু টের পাওয়া যায় তার এক কাজে। তিনি এই হত্যার ব্যাপারটি চেপে গিয়েছেন। ভারতের অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ব্যবহার করা হয় ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট। তিনি কেবল আসামে প্রয়োগের জন্য ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’ বলে নতুন আইন করেন। এর সারকথা হলো- কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এ ছাড়াও অভিযোগকারীকে বাসার ১০০ গজের মধ্যে বসবাস করতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ কাউকে বের করে দেয়া খুবই কঠিন করে দেয়া।

ইন্দিরা মারা গেলে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। তিনি এবার ‘আসু’র সব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তি বা আসাম অ্যাকর্ড সই করেন। অর্থাৎ NRC ১৯৫১ তালিকা আপডেট করে এর ভিত্তিতে অবৈধ বাংলাদেশীদের বের করে দেয়া। তিনি ১৯৮৩ সালের নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ১৯৮৫ সালে নতুন নির্বাচন দেন। অর্থাৎ রাজীব স্বেচ্ছায় আসু নতুন দল খুলুক, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতে আসু সরকার গড়ুক তাই চেয়েছিলেন এবং ১৯৮৫ সালে তাই হয়েছিল। আর নতুন গড়া সে দলের নাম হলো ‘অসম গণপরিষদ’ (AMC), আর এই দলের নেতা প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ একটাই এমন না হতে দিলে আসাম ভারত থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে যেত। আর মোহান্তর কি হয়েছিল পরে? পরের বার (১৯৯০) মোহান্ত হেরে যান। তবে কোনোমতে জিতে তার পরের বার (১৯৯৫)। আর সেটাই শেষ।

ওই দিকে এখনকার আসাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল, তিনি আসলে ছিলেন AMC বা আসুর নেতা (১৯৯২-৯৭)। তিনি ২০০৫ সালে, ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’-কে কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে নিজে একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই আইন ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণা করে। পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তিনি AMC ছেড়ে ২০১১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। ওই দিকে এর মধ্যে কংগ্রেস আবার দুইবার (২০০৬, ২০১১) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি খেদাও অথবা অনুপ্রবেশকারী অথবা বিদেশী মাইগ্রেন্টের কোনো না কোনো একটি আসাম রাজনীতির ইস্যু ছিল। আর সবসময়ই ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই ‘বাংলাদেশী’ ইস্যুটি ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি।
কিন্তু এরপর কী?

সবচেয়ে ভয়াবহ এক অবস্থা আসামের সব দল বা পক্ষের জন্য অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও। কেন? কারণ আসামের নাগরিকের তালিকা কী হচ্ছে, কতদূর হচ্ছে এর বাস্তবায়ন ‘নির্বাহী সরকার’ নিজে করছে না। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশে এটা হচ্ছে। কেউ ভারতের নাগরিক নয় মানেই সে বাংলাদেশের নয়। কারো কাছে যার জবাব নেই তা হলো, তাহলে এই অবৈধদের কোথায় ঠেলে ফেলা হবে? এর জবাব সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নেই। আবার আদালত এ নিয়ে কিছু না বললে সুযোগসন্ধানীরা সবাই বসে থাকবে না। ‘বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার ক্রেডিট’ নিজে নিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এর দায় কে নেবে? সবচেয়ে আজব ব্যাপার, সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো আসামের সবাই মনে করছে, নাগরিক তালিকা পূর্ণ হলেই ওটাই সব সমাধান। অথচ এটাই হবে দাঙ্গার উৎস। ভারতের এক গবেষণা থিংক ট্যাংকও এতে সায় দিয়ে বলছে, আসামের এই তালিকা একটি ‘টাইম বোমা’।

আসামের প্রধান সমস্যা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব। আর সব রিসোর্সে আসামের সহজে প্রবেশের উপায় হতে পারে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের সাহায্য ও সুসম্পর্ক হতে পারত এর জন্য সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষী বস্তু। কিন্তু মিথ্যা ভ্যানিটি আর ‘অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে পাহাড় ও মনের ঘেরার ভেতর আটকে গেছে অসমিয়রা। যে ‘বিদেশী’ ঘৃণা করে বাইরের সব রিসোর্সে তাকে অ্যাকসেস দেবে কে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫