ঢাকা, শুক্রবার,১৯ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

চীনের ‘পেট ভর্তি’ আর গরম কাপড়ের মানবাধিকার

গৌতম দাস

০২ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৮:৪৬


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

চীন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু দিনকে দিন মুখোমুখি হয়ে ওঠা বাড়ছে। তবে চীনের ভেতরে মানবাধিকার আছে কি না তা নিয়ে চীনকে পশ্চিমের খোঁচা দেয়া কিংবা বিব্রত করার যে নিয়মিত প্রচেষ্টা আমরা সেটার কথা বলছি না। যদিও দুটার মধ্যে কোথাও একটা সম্পর্ক আছে, তবুও এখানে প্রসঙ্গ সেটা নয়। প্রসঙ্গ খোদ চীনের অভ্যন্তরীণ নয়, বাইরের। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে যেগুলো বাইরের দেশ যেমন, আমাদের মতো রাষ্ট্র বা মিয়ানমার- সেখানে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের পরিস্থিতি। কী অর্থে? যেমন আমাদের মতো দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা কি রাষ্ট্রের জন্য জরুরি? কিংবা ধরুন বিরোধী দল মানে সরকারে থাকা দলটা ছাড়াও এর বাইরের কোনো দল দেশে থাকা জরুরি কি না? অথবা সরকারের কোনো সমালোচক থাকা কতটা দরকার? সরকারের ব্যাখ্যা মানে না, ভিন্ন চোখে দেখতে চায় এমন লোক কি দেশে থাকতে পারবে না গুম হয়ে যাবে, ইত্যাদি। অথবা কথাটা আরেকভাবে তোলা যায়। গণতন্ত্র না উন্নয়ন, কোনটা চান? মানে, যেন মানবাধিকার ও উন্নয়ন- এ দুটোর কোনো একটা বেছে নিতে হবে। এর একটা যেন অপরটার বিকল্প! যেন পথ দু’টি কিন্তু একই ফল পাওয়া যায় এমন।

এসবের সাথে চীনের সম্পর্ক কী? এসব বিতর্ক তো অন্যান্য রাষ্ট্রের ভেতরের। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, চীন বিষয়গুলোতে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নিজেই একটা সাফাইদাতা। এভাবে যে, চীন সেসব স্বৈরশাসক রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশ্য মঞ্চে সাফাই বা জাস্টিফিকেশন দিতে শুরু করেছে। বলছে, এটা হচ্ছে যার যার রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ বা ‘নিজস্ব গণতন্ত্রবোধ’। সবাইকে একই বুঝ ও বোধের হিউম্যান রাইটে চলতে হবে এমন কোনো মানে নাকি নেই! চীনের ধারণা, হিউম্যান রাইটের বোধ যেহেতু একেক রাষ্ট্রে, ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, ফলে ‘গণতন্ত্র’বোধ একেকজনের একেক রকম হতে পারে। আর সেই সূত্রে কোনো রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট আর কেউ উন্নয়নের পথ বেছে নিতে পারে। তার মানে, উন্নয়নের স্বার্থে কোনো রাষ্ট্রের কাউকে গুম, খুন করতে হতে পারে! দুর্নীতিও পুষতে হতে পারে! এটাও কোনো এক ‘বুঝের বা বোধের গণতন্ত্র’। এটাই বুঝি ‘কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব উন্নয়নের পথ’। এটা নিয়ে যেন অন্যের কথা বলার কিছু নেই। যেমন চীনের অন্য রাষ্ট্রে মাথা গলানোর কিছু নেই বলে চীন বড় গলায় দাবি করছে।

চীন বলছে এই যে, প্রত্যেক রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ এটাতে চীন কোনো মাথা গলাতে চায় না। এর কারণ চীনের সাধারণ নীতি হচ্ছে অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যাপারে, মানে তার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ব্যাপারে চীন মাথা ঘামায় না। সাধারণভাবে বললে, ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের’ ধারণার দিক থেকে দেখলে এটা অনেক পুরনো কথা, ফলে চীন নতুন কিছু বলেনি। কিন্তু চীন এ কথা বলে মানে যেসব রাষ্ট্রের স্বৈরাচার শাসক নিজেদের ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নিয়েছে বলে দাবি করছে- এসব রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংরক্ষক হয়ে উঠতে চাইছে। এক কথায়, অন্যের রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করি না- এ কথা বলে চীন আসলে স্বৈরশাসকদের বন্ধু আর এমন শাসকদের ক্লাবের নেতা ও সংরক্ষক হতে চাইছে।

কিন্তু চীনের এটা হওয়ার দরকার কী? দরকার হচ্ছে এ জন্য যে, অধিকার কথাটার এক গ্লোবাল স্বীকৃতি আছে। চীন দুনিয়ার হবু নেতা হয়ে উঠতে চাওয়া- এ আকাঙ্ক্ষা আগে থেকেই আছে। আর গ্লোবাল স্বীকৃতি পেয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে নতুন দুনিয়া গড়ার কাল থেকে। জাতিসঙ্ঘ বলে প্রতিষ্ঠান ১৯৪৫ সালে গড়ে ওঠে আর ১৯৪৮ সালে ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস চার্টার’ ঘোষণা করা হয়। এটা ছিল প্রত্যেক রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য অধিকারের সনদ। চীনকে মানতে হবে যে, সে সময় থেকে মনে করা হয়নি বা কেউ এমন কথা তোলেনি যে, ওই চার্টারের কারণে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে বা এতে কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ ঘটছে। আর সবচেয়ে বড় কথা’ রাইট বা অধিকার কথাটা বিশেষ একটি রাষ্ট্রের জন্য পালনীয় ধারণা নয়, বরং এটা বিশ্বজনীন ধারণা।

আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এটা রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্য ও অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সব রাষ্ট্রেরই পালনের এক ধরনের বাধ্যবাধকতাও আছে। সঙ্ঘের আর এক কনভেনশন হলো, ইন্টারন্যাশনাল কোভনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস ১৯৬৬। এতে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র নিজ নাগরিকের সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইট রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীন এতে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র আর আগামী বছর চীনের এতে স্বাক্ষরের ২০ বছর পূর্তি পালন করতে হবে। অতএব চীনেরও বাধ্যবাধকতা আছে। আর আমরা ধরে নিতে পারি, চীনের এই স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে চীনের ওপর বাইরের কারো হস্তক্ষেপ ঘটেনি বলেই চীন বিশ্বাস করে।

এর মানে দাঁড়াল রাইট বা অধিকার বিষয়টা ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া কিংবা ইচ্ছামতো স্বৈরশাসক হওয়ার সুযোগ নয়। চীন যা বলছে তা সত্য নয়। স্বৈরশাসকদের ক্লাব বানানো ও চীনের এর নেতা হওয়ার সুযোগ আসলেই নেই। মিয়ানমারের সু চি এবং জেনারেলরা অথবা ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার দাবিদার কম্বোডিয়ার স্বৈরশাসক হুন সেনকে নিয়ে চীনের আলাদা স্বৈরশাসক ক্লাব বানানো অথবা তাতে বাংলাদেশকে যোগ করানোর চেষ্টা করা- এগুলোর কোনো সুযোগ আসলে নেই। অন্তত চীনের এতে নেতৃত্ব দেয়ার যুক্তি নেই। তবু এই প্রবণতা দিন দিন বাড়তে দেখছি আমরা।
কিন্তু কেন বাড়ছে, গোড়াটা কোথায়? ১৯৪৮ সালের চার্টারগণের সময়কালে বা পরে কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র এই চার্টার মানি না অথবা এর অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হবো না- এমন কথা বলেনি। যদিও কোনো কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট কথাটার একটা ভিন্ন সংজ্ঞা, একটা ‘কমিউনিস্ট ব্যাখ্যা’ আগলে নিয়ে বসে আছে। সেই ব্যাখ্যাটাই সব ত্রুটি আর বিভ্রান্তির উৎস। স্বৈরশাসকের পক্ষে সাফাই ওখান থেকে আসছে।

কমিউনিস্টদের এক বিশাল আত্মতুষ্টি যে, তারা মনে করেন- রিপাবলিক রাষ্ট্র বিষয়ে ‘পশ্চিমের রাজনৈতিক সাম্য ও নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার ধারণা’- এগুলো খামাখা এবং ভিত্তিহীন। তারা মনে করেন, ‘অধিকার’ ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখা ও বোঝাটাই এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’। কমিউনিস্টদের চোখে বরং অধিকারের আসল অর্থ হলো ‘বৈষয়িক অধিকার’। এই বিচারে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান- এই বৈষয়িক অধিকারগুলোই আসলে কমিউনিস্ট বুঝ, বিকল্প বুঝের ‘অধিকার’-এর অর্থ। পশ্চিমের ধারণার বিরুদ্ধে ‘অধিকার’ শব্দের কমিউনিস্ট অর্থ ও সংজ্ঞা এটাই।

‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া স্বৈরশাসকদের অধিকার- এখনকার চীন এই নতুন বক্তব্যের ভিত্তিতে ‘নতুন ক্লাব’ গড়ার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে দেখছি আমরা। এর পেছনের ভিত্তি হলো, কমিউনিস্টদের ‘অধিকার’-সম্পর্কিত ধারণা। এখানে অধিকার মানে বৈষয়িক সুবিধাদি পাওয়ার অধিকার। ফলে যে স্বৈরশাসক দাবি করবেন- আমি ‘গণতন্ত্র না উন্নয়নের’ বিতর্কে ‘উন্নয়ন’ এর পক্ষে আছি- এর মানেই হলো সেই স্বৈরশাসক বলতে চাইছেন, অধিকার সম্পর্কিত পশ্চিমা ধারণার বিরুদ্ধে আমি। তাই আমাকে পশ্চিমের ধারণা দিয়ে মাপলে হবে না। তবে বাংলাদেশ কি চীনের এই ক্লাবে জয়েন করবে? কিছু তোড়জোড় দেখা গিয়েছিল। সিপিবি ও চার দল নিয়ে চীনা মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিল, দেখেছিলাম। কিন্তু সম্ভবত বেশি সুবিধা হয়নি।

অনেকে ভাবতে পারেন এগুলো তো ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগের ধারণা কমিউনিস্টদের। সেই দায় দিয়ে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করা কি ঠিক হবে? হ্যাঁ অবশ্যই সঠিক হবে। ওয়েন জিয়াবাও ২০০৩ সাল থেকে ১০ বছর ধরে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বাণী শুনুন। তিনি বলেছেন, ‘সবচেয়ে বড় হিউম্যান রাইট হলো ১.৩ বিলিয়ন লোককে খাওয়ানো। ফলে সিভিল নাগরিকের ধারণা- পশ্চিমের এই ধারণা আসলে বাতিল বলে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে।’ চীনের আরেক আলোচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন। ২০০৬ সালে তার এক বিখ্যাত মন্তব্য, ‘পেট ভর্তি থাকছে কি না আর গরম কাপড় পরা আছে কি না- এসবের ভিত্তিতে চীনের হিউম্যান রাইটকে সংজ্ঞায়িত করে দেখতে হবে।’ এর অর্থ পুরান কমিউনিস্টদের হিউম্যান রাইটের ‘বিকল্প সংজ্ঞা’ চীন এখনো ত্যাগ করেনি, বরং আঁকড়ে ধরে আছে। আর একালে এসে স্বৈরশাসকদের ক্লাব গড়ে সেখান থেকে নিজেই সাফাই সরবরাহকারী হতে চাচ্ছে। চীন যদি ভেবে থাকে এই নতুন সাফাইয়ের ভিত্তিতে সারা দুনিয়াকেই নিজের স্বৈরশাসকের ক্লাবের মেম্বার বানাবে, বুঝতে হবে চীনের দুনিয়া সম্পর্কে নিজ ধারণার দিক থেকে এখনো আঁতুড়ঘর ত্যাগ করতে পারেনি।

মানুষ কি কেবল একটি খাওয়া আর বাথরুমে যাওয়ার মেশিন? নাকি তার অনেক উন্মেষ আছে এবং তা দরকারও? মানুষ আসলে রক্তমাংসের জীবন্ত সত্তা, স্পিরিচুয়াল প্রাণী সে। দুনিয়ায় সে কেন এসেছে, কিভাবে সম্পর্কিত, কী তার দায়-কর্তব্য- এসব বোঝাবুঝি এবং তদনুযায়ী অ্যাক্ট-রিঅ্যাক্ট করাই মানুষ।

অপর দিকে, জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইট চার্টারে ঘাটতি ও ত্রুটি আছে। সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো, এটা (ইনডিভিজুয়ালিজম) ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ফলে এর অনেক উন্মেষ লাগবে। কিন্তু সেই ‘আরো ভালো কিছু’ পাওয়ার আগে কিছু শুরু করার বিন্দু হিসেবে এখনো চার্টারের ভূমিকা আছে। ফলে একালে এসে, মানুষ রাজনৈতিক না বৈষয়িক- এই বিতর্কটা এমন নয় যে, মানুষ হয় রাজনৈতিক না হয় বৈষয়িক এলিমেন্ট। কমিউনিস্টরা ‘অধিকার’ বলতে রাজনৈতিক অধিকারের বদলে বৈষয়িক অধিকার বলে বোঝাকে সহি মানতে চেয়েছেন। কিন্তু এটা ডাহা ভুল ও অবাস্তব।

‘অধিকার’ বলতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ হয়ে গেছে- এই ভয়ে ও অভিযোগে অধিকারের রাজনৈতিক অর্থের দিক- মৌলিক মানবিক অধিকারের দিকটা তুচ্ছজ্ঞান করা অন্যায়। আর ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়’ সর্বস্ব অধিকারের বৈষয়িক ধারণাই মুখ্য এমন মনে করাও বোকামি। মনে রাখতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের এই বৈষয়িকতাসর্বস্ব চিন্তার কারণেই- চীন বার্মায় ব্যবসা করতে গিয়েছে; অথচ পাশে একটা বিরাট (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠী নিধন হয়ে যাচ্ছে। তবুও চীন নিজের ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়ের’ রাজনীতিতে বুঁদ হয়ে আছে। বিশাল উন্নতি করছে চীন! কিন্তু এই বিশাল উন্নীত ‘লইয়া দুনিয়া কী করিবে!’

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫