ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

অর্থনীতি

বিশ্লেষকদের অভিমত

নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার যৌক্তিকতা নেই

আশরাফুল ইসলাম

২৯ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ০৫:৩২ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৬:২৯


প্রিন্ট
নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার যৌক্তিকতা নেই

নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার যৌক্তিকতা নেই

বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশ্লেষকেরা। তারা মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক আকার ও ভৌগোলিক আয়তন বিবেচনায় এত ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকলেও লাইসেন্স নিয়ে নতুন ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ব্যাংকিং করছে। ঋণ ভাগাভাগি করে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাংকের পরিচালকেরা। নিজ ব্যাংকের পাশাপাশি নিচ্ছেন অন্য ব্যাংক থেকেও। আবার বেনামেও ঋণ নিচ্ছেন কেউ কেউ। বর্তমানে এ ধরনের বেশির ভাগ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো। এ পরিস্থিতিতে আবারো নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হলে অনৈতিক প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

বর্তমানে দেশে ৫৭টি ব্যাংক রয়েছে। এরমধ্যে ৯টিই নতুন লাইসেন্স পাওয়া। বর্তমানে নতুন ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও নতুন করে আরো তিনটি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি গত সোমবার ঢাকা ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক ব্যাংক রয়েছে। তারপরও প্রচুর অঞ্চল ব্যাংক সেবার বাইরে রয়ে গেছে। এ কারণেই নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেকগুলো ব্যাংক একীভূত (মার্জ) করার চেষ্টা চলছে।

নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘নতুন ৯ ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার আগে আমি বলেছিলাম দেশের আর্থিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থমন্ত্রীও লাইসেন্স দেয়ার আগে বলেছিলেন, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া অযৌক্তিক। কিন্তু পরে যখন তিনি লাইসেন্স দিলেন, তখন তিনি বললেন রাজনৈতিক বিবেচনায় এ লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে।’ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমি ৯টি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার আগেও বলেছি এটা অযৌক্তিক, এখনো বলছি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হবে অযৌক্তিক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, অনুমোদন দেয়ার আগে নতুন ব্যাংকের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না খতিয়ে দেখতে হবে। একই সাথে ব্যবসায় খারাপ করলে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সবচেয়ে খারাপ দিক হলো এ দেশে ব্যাংক খোলার ব্যবস্থা আছে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ এ ধরনের কোনো আইন নেই। তিনি আরো বলেন, যারা নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স নেবেন তাদের বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স নেয়া হলো আর বিপদে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক তা উদ্ধারের দায়িত্ব নিলো এটা ঠিক না। তিনি মনে করেন, যারা নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স নেবেন তাদের নিজেদেরই বাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। টিকতে না পারলে স্বেচ্ছায় অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সম্প্রতি নতুন ব্যাংক নিয়ে বিআইবিএমের এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, নতুন ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকিং বোঝে কম। আবার অনেক পরিচালক বেনামি ঋণ নিচ্ছেন। নন রেসিডেন্সিয়াল বাংলাদেশ বা এনআরবি ব্যাংকগুলো বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাইসেন্স নিয়েছে। আসলে পুরোটাই ভোগাস। শুধু লাইসেন্স পেতে এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।
ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, নতুন ৯টি ব্যাংকের মধ্যে দুই-তিনটির অবস্থা খুবই নাজুক। এদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে তারা পিছিয়ে পড়ছে। এদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। সার্বিকভাবে তাদের মনিটরিং করা হচ্ছে।

এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মেহমুদ হুসাইন বলেন, নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে আগ্রাসী ব্যাংকিং চলছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক ১২ বছরে ৬৫টি শাখা খোলে। আর একটি চতুর্থ প্রজন্ম বা নতুন ব্যাংক মাত্র ৪ বছরে ৬০টি শাখা খুলেছে। এটা নিঃসন্দেহে আগ্রাসী। এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ব্যাংক ব্যবসা যুগ যুগ ধরে চলবে। ধীরে ধীরে এগোতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের আগ পর্যন্ত ২৫ বছরে দেশে বেসরকারি ব্যাংক ছিল ১৭টি। অপর দিকে জেনারেল ও লাইফ মিলে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ছিল ৩২টি। গত ১৯৯৬-২০০০ সালের মধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৩টি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়। আর ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স দেয়া হয় ২৮টির। ইন্স্যুরেন্সগুলোর মধ্যে জেনারেল ১৯টি ও লাইফ ৯টি। গত ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের ৫ বছর এবং পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছর মোট সাত বছরে নতুন ব্যাংকের কোনো লাইসেন্স দেয়া হয়নি। বর্তমান সরকার গত ২০১২ সালে নতুন ৯ ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার আগে দাতাসংস্থা আইএমএফ, সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ এবং স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল। ওই সময় বলা হয়েছিল দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ৪৮টি ব্যাংক, ২৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ৬২টি বীমা কোম্পানিই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ২০০১ সালে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হবে না।

এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত বিএনপিসহ তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাদ সাধে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংক দেবে। এজন্য গত ২০১১ সালের ৪ জুলাই নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশনা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই দিন থেকেই কার্যক্রম শুরু করে। তবে ওই বছরের ২৪ আগস্টের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত : একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন পেশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এতে বলা হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার আয়তন, জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশে নতুন ব্যাংক দেয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলেও ওই বছরে ১৪ আগস্ট নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার অনুমতি দেয় পর্ষদ। পরে নতুন ৯ ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়ে অনেকটা বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লাইসেন্স পেয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে আগ্রাসী ব্যাংকিং করতে থাকে ব্যাংকগুলো। কিন্তু লাইসেন্স পাওয়া ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তরা সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কার্যত কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ নিয়ম ভাঙতে ভাঙতে তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়া ফার্মার্স ব্যাংকের এমডিকে অপসারণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিস্থিতি ভয়াবহতা দেখে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। অন্য ৮টি ব্যাংকের মধ্যে অন্তত তিনটি ব্যাংকের অবস্থাও একই বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। বাকি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো নয়। ইতোমধ্যে আরেকটি নতুন ব্যাংকের এমডি পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এ পরিস্থিতিতে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া কতটুকু যৌক্তিক হবে তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকেরা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫