ঢাকা, শনিবার,২০ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা ট্রেন ধরতে আমেরিকা কত দূর যাবে?

গৌতম দাস

০৫ নভেম্বর ২০১৭,রবিবার, ১৭:৪৪ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৪:৫৩


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

আমেরিকা কি ফেল করা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? কোন ট্রেন? বার্মা ট্রেন, নাকি মিয়ানমার ট্রেন? আসলে এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই; আসল কথা হলো এটা রোহিঙ্গা ট্রেন! আমেরিকা কি ফেল করা রোহিঙ্গা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? রোহিঙ্গা ট্রেন- এরই বা মানে কী? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ, মাত্র চার পারসেন্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা-মানুষের মর্যাদা এতই পর্যুদস্ত, এতই নিচে অমানুষের বা ঊন-মানুষের স্তরে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ নিয়ে গেছে যে, দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে রোহিঙ্গা পারসিকিউশন বা নিষ্পেষণ। সেই সাথে বার্মিজ জেনারেলদের নাম নৃশংসতার ওস্তাদ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়েছে। এরা নির্মূল ক্লিনজিংয়ে কত দক্ষ এর স্বাক্ষর-চিহ্ন ব্যাপক ছড়াছড়ির মুখে জাতিসঙ্ঘকে বলতেই হয়েছে যে, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে পারসিকিউটেড বা নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা।’ তাই বলতে চাওয়া হচ্ছে, আমেরিকা কি বর্মি জেনারেলদের একটা শিক্ষা দিতে পারবে? 

আমরা দেখছি, আমেরিকা ভুলে গিয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে, জেনোসাইড বা ক্লিনজিংয়ের বিষয়ে দুনিয়ার কাছে তার কমিটমেন্ট কী? দুনিয়ার কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে গ্লোবাল লিডার হয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্লোবাল ইকনোমিক ব্যবস্থার এক অর্ডার কায়েম করে আমেরিকা আজকের ওয়ার্ল্ড লিডার হয়েছে। এটা সে হতে পেরেছে সাথে কিছু পলিটিক্যাল কমিটমেন্টও তাকে রাখতে হয়েছে। যদিও তাতে সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার অজুহাতে নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে রেজিম চেঞ্জের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির স্থাপন করেছে। এখনো এই সমস্যা দুনিয়াতে আছে যে, সুদানের বশির একটা গণহত্যা চালালেও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি উদ্ধার হয় তবে বলা হবে গণহত্যা হয়নি, বরং গণহত্যার কাছাকাছি কিছু একটা হয়েছে। কারণ চীনের এ কথা না মানলে ভেটো দিয়ে দেয়া হবে; একই উদাহরণ আমেরিকারও আছে। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্টভাবে একটা গণহত্যা ঘটেছে কি না তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুনিয়ার এখনো বহু সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাই দরকার আবার এক রুজভেল্টের, আবার এক নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন জাতিসঙ্ঘ। অথচ আমেরিকা সেসব ইতিহাস ভুলে বসে আছে। আগেই মনে মনে হেরে গেছে।

এ কথা ঠিক যে, ২০০৭-০৮ সাল থেকেই এটা জানা গিয়েছিল যে, দুনিয়ার অন্তত অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও লিডার অর্থে চীনের কাছে কাঁধবদলের সময় হয়ে গেছে। আমেরিকার জায়গায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হচ্ছে চীন। এ কথাও সত্যি যে, কারো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার যে, সেই রাষ্ট্র এখন ক্রমে ক্রমে সব অর্থেই গ্লোবাল পরাশক্তি হিসেবে হাজির হবে। কিন্তু এ কথাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকা কেবল অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তির জোরে গ্লোবাল পরাশক্তি বা গ্লোবাল লিডার হয়নি। রাজনৈতিক শক্তি হতে হয়েছে আগে, তবেই গ্লোবাল লিডার হওয়া গেছে। এমনি এমনি আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের এম্পায়ার বানাতে সক্ষম হয়নি। পলিটিক্যাল আইডিয়া, এর উপযোগী গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আর সর্বোপরি কমিটমেন্ট- এসব প্রতিটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণভাবে হাজির করাতে হয়েছিল আমেরিকাকে। আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিজের কাছে নিজেকে দিতে হয়েছিল যে, মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা কেবল আমেরিকাতে করলেই হবে না, সারা দুনিয়ার ব্যাপারেও অন্তত নীতি-অবস্থানগত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এ কথাও সত্য, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস চার্টার রচিত হয়েছে বটে কিন্তু ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ ধারণায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে তা নিয়ে দুনিয়াকে আরো কাজ করতে হবে। সারকথা কোনো ‘রাজনৈতিক’ নীতি-অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমেরিকা গ্লোবাল লিডার হয়নি, হতে পারেনি। আজকের জায়গায় আমেরিকা এমনি এমনি উঠে আসেনি।

অথচ এই শতকে এসে ২০০৮ সালে আমেরিকা সত্যি সত্যি হেরে যাওয়ার আগেই সব ছেড়েছুড়ে হার স্বীকার করে নিয়েছিল। নানা সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভঙ্গের কারণে ২০০৮ সালের আগের বার্মা ছিল আমেরিকান অবরোধে ডুবে থাকা, বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা এক বার্মা ছিল। অথচ চীনের দেখানো রাস্তায় সেই মতনই বার্মায় বিনিয়োগ ও ট্রেড আর ব্যবসার ভাগ পেতে আমেরিকা চীনের পথ অনুসরণ করে বসেছিল। বর্মি জেনারেলদের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রেসিজমে নির্মূল ক্লিনজিং দেখেও না দেখার ভান করার দিন দুনিয়াতে যেন আবার ফিরে এসেছে- চীনের প্ররোচনায় আমেরিকাও এই শর্টকাট পথ নেয়ার লোভে পড়েছিল। আমেরিকা মনে করে নিয়েছিল যেন দুনিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নীতি অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া দুনিয়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। আর আমেরিকা কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই বোধহয় সেই দুনিয়ার নেতা হয়েছিল। ২০০৮ সালের বার্মার কনস্টিটিউশনের পরেও একই দানব ও কোটারি এক সামরিক রাষ্ট্রই ছিল বার্মা। অথচ বলা হচ্ছিল বার্মা নাকি ‘গণতন্ত্রের পথে’ যাত্রা শুরু করেছে, গণতন্ত্রের পথে নাকি ট্রানজিশনে বা অন্তর্র্বর্তী রাস্তায় আছে সে আর সু চি নাকি শান্তির নোবেল মানুষ ইত্যাদি এসব ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণ করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম। সু চি তার ভাষণে গণহত্যার অভিযোগের জবাবে মিয়ানমারের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তা শুনে প্রখ্যাত মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন যথার্থই বলেছেন, ‘এটা গতানুগতিক অজুহাত। অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারীদের দিক থেকে এটা বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা বলে থাকেন, গণহত্যা বন্ধের দিকে নজর দেয়ার চেয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া বজায় রাখাটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চি তাই করেছেন।’

অথচ আমেরিকা ট্রেন মিস করেছে। রাজনৈতিক কর্তব্য ভুলে সস্তা ব্যবসার লোভের ফাঁদে বর্মি জেনারেলদের কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছে। নিজেকে সস্তা করে তুলেছে, সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছে। নিজের দাম নিজে বোঝেনি। যার দায় ওবামা প্রশাসনেরও কম নয়। চীনের কাছে দুনিয়ার নেতৃত্ব হারানোর আগেই উলটো নিজেকে চীনের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছে। অথচ খেয়ালই করেনি দুনিয়াতে কোথাও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই নেই। এরা নিজ নিজ বিপ্লবের পরে রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বলে একটা শব্দ রেখেছে, ইংরেজির একটা আর অক্ষর সেখানে আছে বা ছিল। কিন্তু এর সাথে কোনো সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্ট তৎপরতা নেই। কনস্টিটিউশনের কোনো গুরুত্ব নেই, কী লেখা আছে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো সিরিয়াস কিছু নয়। কারণ এটা নাকি নেহাতই ভোটের হিসাব। কোনো করপোরেট চেয়ারম্যানেরও এক ভোট, এক ফকিরেরও এক ভোট।

তাই চীন যে দানব বর্মি জেনারেলদের পা-চুমে বিনিয়োগ ব্যবসা খাচ্ছে,-এর পাশেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ওই জেনারেলদের হাতেই কচুকাটা ক্লিন হয়ে গেলে তাতে চীনের কী দায়! তার কোনো দায় নেই। সেই, ১৯৭০-এর দশক থেকেই চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় সে যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দায়দায়িত্ব সে নেবে না। কিন্তু কোন ব্যবসাটা সে পাবে সেই ভাগ সে ঠিকই গ্লোবাল প্লেয়ারদের ভাগ থেকে বুঝে নেবে। এই নীতিতেই চীনের ডিপলোম্যাসি এত দিন চলে এসেছিল। আর প্রমাণ হয়েছে এটা অচল। চীন ব্যর্থ; গ্লোবাল নেতা হওয়ার খায়েশ তার পূরণ হবে না। সে ধরা খেয়েছে। কিভাবে?

আগেই বলেছি আমেরিকা লোভে পড়ে হুঁশ হারিয়েছিল। নিজের গৌরব নিজের অবদান ভুলতে বসেছিল। এমনকি এবারের রোহিঙ্গা নির্মূলের পরে বার্মা বিষয়ে আমেরিকার উপমন্ত্রী মার্ফি সাহেব তখনো কী বলে ফেললে বর্মি জেনারেলদের মন উঠে যায় অখুশি হয়ে যায়- সেদিকে খুবই সতর্ক থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে কথা বলছেন। জেনারেলদের মন জোগাতে মার্ফি বলার চেষ্টা করছিলেন এটা রোহিঙ্গা বা মুসলমান নির্মূল ক্লিনজিংয়ের ইস্যু নয়, এটা নাকি রাখাইন স্টেটের দুই জাতিগোষ্ঠীর ঝগড়া, অর্থাৎ রাষ্ট্র বা মিলিটারির ভূমিকা নেই। তার এই অবস্থা দেখে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক সরাসরি জিজ্ঞেস করা প্রশ্নের জবাবে আবার সে কথা কনফার্ম করেছিলেন। কিন্তু ২ অক্টোবর মিয়ানমারে অবস্থিত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসাথে রাখাইন প্রদেশ সরেজমিন সফর করে এসে এবার মিয়ানমারে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দেন তাতে পরিস্থিতি উলটে যায়। যার মূল কথা হলো অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর বারে বারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনা, জাতিসঙ্ঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আসতে দেয়া ইত্যাদি নিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

অর্থাৎ এখন আর আমেরিকা এটাকে রাখাইন প্রদেশের জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ঝগড়া বলে আড়াল করতে চাইছে না। আর ২৩ অক্টোবর এসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি একেবারে কঠোর অ্যাকশনের দলিল নির্দেশনামা যেন। সাথে আগের মতো যে দায়ী ইনভেস্টিগেট করো, তাকে ধরে নিয়ে আসো। মূল কথা যেসব আমেরিকান অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা। বিশেষত বর্তমান ও সাবেক সামরিক অফিসারদের ওপর ট্রাভেল ব্যান আবার বলবৎ করা, রুবিসহ দামি পাথর আমেরিকায় পাঠানো ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা, সামরিক বাহিনীর জন্য আমেরিকা স্পন্সরড যেকোনো কর্মসূচি স্থগিত। এক কথায় আমেরিকান রাষ্ট্রের সাথে বর্মি আর্মি সদস্য সব ধরনের যেকোনো তৎপরতা স্থগিত।

আর এবারের সারকথা হলো, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতে দেখতে চায় আমেরিকা, যা জেনারেলদের কাপড় নষ্ট করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের মিডিয়া মতে, ভারত নাকি প্লট হারিয়ে চীনের কাছে হেরে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। আর চীন নাকি বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলাপে বসতে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের মন্ত্রী দেশে ফিরতে-না-ফিরতেই যাকে বলে দু’জনে দু’দিকে দুই ধরনের কথাতে ‘ফল এপার্ট’। তাতে বোঝা গেল যে বর্মি জেনারেলদের শায়েস্তা করা চায়নিজ কূটনীতির কাজ নয়। এ ব্যাপারে চায়নিজরা চাইলে আমেরিকানদের কাছে মধ্যস্থতাকারীর কাজে কূটনৈতিক কিছু শিক্ষা নিতে পারে। আচ্ছা এটা কি জানা কথা না যে, পিছলা বার্মিজ জেনারেল ভাষ্য বদলে দেবে। অতএব আগে থেকেই চীনাদের দুটি মানে হয় এমন সুযোগ যাতে না থাকে সেই ফুটা বন্ধ করার ব্যাপারে সাবধান হওয়া দরকার ছিল!

কিন্তু এরও আগে যে কথা বলতে হবে, তা হলো- ১৯৭০-এর দশক থেকে নেয়া চীনাদের পলিটিক্যাল দায় বা সংশ্লিষ্টতা না নিয়ে কেবল অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় মাখন খেয়ে যাবো খালি, চীনাদের এই বুদ্ধি অচল-অকেজো এটাই প্রমাণ হয়েছে। আমেরিকানদের সামান্য একটু নাড়াচাড়াতেই ভয় পেয়ে বর্মি জেনারেলদের কী করে চীন রক্ষা করবে তা নিয়ে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। চীনাদের হাতে ভেটো ক্ষমতা থাক আর না থাক কিছু যায় আসে না তাতে। দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। অর্থনৈতিক শক্তি বা মুরোদ আপনার অঢেল থাকতে পারে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, নীতি-অবস্থান- এসব দিক- তো আছেই। বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে একসাথে বসানোর কাজে চীনাদের নামা প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কী জিনিস। এটা রোহিঙ্গারা মরুক যা হোক, আর্মি জেনারেলদের কাছ থেকে বিনিয়োগ আর ব্যবসা বাগানোর কাজটা ভালো জানলেই চলবে। এই ধারণার ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা ও অচল। কারণ চীনকে রাজনৈতিক নেগোসিয়েশন আর সারা দুনিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যু দেখিয়ে দিয়েছে যে চীনাদের দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দুনিয়াকে অ্যাম্পায়ার হিসেবে নিজের নেতৃত্বে চালানো কখনোই সম্ভব হবে না। মূল কারণ রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না দেখিয়ে, হিউম্যান রাইটসকে নিজের ইস্যু গণ্য না করে দুনিয়া চালানো অসম্ভব। রিপাবলিক, রাজনৈতিক সাম্য কায়েম, মানবাধিকার ইস্যু আগামীতে আরো সিরিয়াস ইস্যু হয়ে উঠবে দুনিয়াতে। যার কোনো ন্যূনতম ধারণা বা আমলই নেই কমিউনিস্ট জগতে। কমিউনিস্টদের এখনো ধারণা, ‘তাদের বেইজ্জতি করতেই’ নাকি আমেরিকা এই ইস্যুটা হাজির রাখে। এর চেয়ে অজ্ঞতার আর কী হতে পারে! এর মানে কি কমিউনিস্ট বলতে চাইছে দুনিয়াতে গণহত্যা ক্লিনজিং রেসিজম-এগুলো চলবেই? তাই কি? তবে আমি শিউর মাফিয়া রাষ্ট্র রাশিয়ার পুতিন অথবা চীনে নতুন জেঁকে বসা শি জিনপিংয়ের ‘মডার্ন সমাজতন্ত্র’ নামে সোনার পাথরের বাটি ধারণার ভেতর এর কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আমেরিকানরা কত দূর যাবে? রোহিঙ্গারা কি ঘরে ফিরবে? আমেরিকানরা কতটা সিরিয়াস? দ্রুত একটা মাপার কাঠি দেই। ‘এশিয়ায় আমেরিকান (নিরাপত্তা) স্বার্থ তারা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে’ এই নীতিতে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি থেকে বুশ আমাদের ভারতের কাছে বন্ধক দিয়ে রাখছে। ট্রাম্পসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের রেক্স টিলারসন এবং আন্ডার সেক্রেটারিসহ সবাই এখন এই সপ্তাহ আমাদের দেশ বা পড়শি দেশে থাকবে। এগুলো যত যা-ই ঘটুক যতক্ষণ না আমেরিকা আমাদের বন্ধকদশা থেকে ছুটিয়ে আমাদের সাথে সরাসরি ডিল না করবে, তত দিন অন্য কোনো কিছু দেখে আমেরিকার ওপর আমাদের আস্থা রাখার কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি বুঝতে হবে। 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫