ঢাকা, মঙ্গলবার,২৪ এপ্রিল ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

ভারতের সাপ আর ওঝা কূটনীতি

গৌতম দাস

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার, ১৭:০৪ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার, ১৭:৩৯


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

সাপ ও ওঝা কূটনীতি। মানে সাপ হয়ে কাউকে কামড়ানোর পরে আবার ওঝা হয়ে সেই বিষ নামাতে আসা। কিন্তু এটা কি কূটনীতি হতে পারে? কূটনীতির মধ্যে বুদ্ধি, দূরদর্শিতা, কাছে ও দূরের স্বার্থ ইত্যাদি সবই থাকে। কিন্তু অন্তত সকাল-বিকেল মিছে বলে ধরা খাওয়ার মতো বেকুব কেউ হয় না। অথচ ভারত এটাই হয়েছে। এটা হলো কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব। এর সাগরেদ কেন হবে বাংলাদেশ সরকার। আমরা বললাম, মিয়ানমারের সাথে যৌথ টহল দিতে চাই যাতে রোহিঙ্গার বাপও না আসতে পারে।’ আবার এখন বলছি, ১৬ কোটি লোক খাওয়াতে পারলে ওদের খাওয়াতে পারব না কেন? তারা ধরে নিয়েছেন, মানুষ এতই বোকা যে, তারা কিছুই দেখবে না, বুঝতেও পারবে না? অথচ এটা হয় না, হতে পারে না। তবু লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে দিশেহারা ভারত এই কাজই করেছে। ভারত এখন সাপ-ওঝার কূটনীতিতে নেমে গেছে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সরকারের নির্মূল অভিযান বহু পুরনো, অন্তত সেই ১৯৭৭ সাল থেকে। কিছুদিন পরপর এই অ্যাথনিক ক্লিনজিং বা নির্মূল অভিযানের জোয়ার উঠতে দেখা যায়। এবারের পর্বে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মারা ও খেদানো শুরু হয়েছে ২৫ আগস্ট রাত থেকে। প্রত্যেক বারের মতো এবারো মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে এক নতুন অজুহাত দিতে দেখা যায়। এবারের অজুহাত হলো, আরসা নামে রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠন মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কিছু আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু এর জের ধরে সামরিক বাহিনী এ পর্যন্ত চার লাখের মতো রোহিঙ্গার ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন করে তাদের উদ্বাস্তু করল কেন?

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সাফাই টেনে উল্লেখ করেছে, আরসা সংগঠনের হামলার প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনী একটা ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালিয়েছে।’ কিন্তু কোনো সংগঠন হামলা চালালেই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ কি সেনাবাহিনী চালাতে পারে, এই প্রশ্ন কেউ তুলছে না। আবার ২৭ আগস্টের রয়টার্স পরিবেশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী এক বিবৃতি পাঠিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ‘৮০০ বাঙালি টেররিস্ট’কে (রোহিঙ্গা উচ্চারণ না করে মিয়ানমার সরকার তাদের ‘বাঙালি’ বলে) তারা ‘মোকাবেলা’ করেছে। সেনাবাহিনীর ‘মোকাবেলা’ মানে বুঝতে হবে হত্যা নির্যাতন ধর্ষণ করে ঘরছাড়া, দেশছাড়া করা। কিন্তু সেনাবাহিনী ৮০০ সংখ্যা উল্লেখ করলেও বাস্তবে আমরা দেখছি, চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে উদ্বাস্তু আর প্রায় চার হাজারের মতো হত্যা করা হয়েছে। ফলে ৮০০ সংখ্যার উল্লেখ অত্যাচারের ফিগারগুলোর পক্ষে ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে না।

ফ্যাক্টস হলো, বরং এতে এখানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ঘটেছে বলে প্রমাণিত হয়। অন্যায় একটা যুক্তি আছে যে, কোথাও পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে-তাই পুলিশ এবার নির্বিচারে হত্যা, বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, পায়ে গুলি করা ইত্যাদি সবকিছু করতে পারে। অথচ এটাকে পুলিশি ভাষাতেই বলে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ। অর্থাৎ পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে যখন কোনো সিভিল গ্রুপ মুখোমুখি হয় বা মারামারি করে, তখন সেটা জমি নিয়ে দুইপক্ষের লড়াই বা পাড়ার দুইপক্ষের মারামারির মতো নয়; যেখানে উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের ওপর যেকোনো মাত্রায় বলপ্রয়োগ করতে পারে। এখানে একপক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার কাজ কখনোই অপরপক্ষকে নির্মূল বা ঘরছাড়া করার লক্ষ্যে ইচ্ছামতো বলপ্রয়োগ করা হতে পারে না। বরং যতটুকু বলপ্রয়োগ করলে সে অপরপক্ষকে কাবু করতে পারবে, ঠিক ততটুকুই সে বলপ্রয়োগ বা ‘ওভার-পাওয়ার’ করবে। এর বেশি নয়। কোনো প্রতিহিংসা তো নয়ই। এর বেশি হলে বরং ওই নিরাপত্তা বাহিনী উল্টো ফৌজদারি অপরাধ করেছে বলে গণ্য হবে। এটাকেই অ্যাকসেস বা ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ এর অপরাধ বলা হয়।

আর এটাই হলো যেকোনো ফোর্সের ‘ফোর্স অ্যানগেজমেন্ট রুল’, অর্থাৎ ‘বলপ্রয়োগে সংশ্লিষ্ট’ হওয়ার পক্ষে বাহিনীর শর্ত। এতে স্পষ্ট যে, মিয়ানমার বাহিনী কথিত ফ্যাক্ট ও যুক্তিকে সত্য হিসেবে যদি ধরাও হয়, তবুও সে অবশ্যই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। ফলে এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে সেনাবাহিনীই অপরাধ করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন বা হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন হয়েছে। ওদিকে গণতন্ত্রের নোবেল নেত্রী সু চি আবার দাবি করে বিবিসিকে বলেছেন, ‘রাখাইনে রোহিঙ্গা জঙ্গিরাই রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে’। এখন কার কথা বিশ্ববাসী বিশ্বাস করবে?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরে ছিলেন গত ৫-৭ সেপ্টেম্বর। বিবিসি বলেছিল, ওই সফরে ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো’। আর ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে মিয়ানমার জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা’। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া অথবা কাউকে হারানোর জন্য কেউ গণহত্যা এবং জাতিগত নির্মূলকরণে সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে মোদির ভারত। মিডিয়ার সামনে মোদির সাথে সু চি সাক্ষাতে মোদি বলেছে, তিনি সু চির ‘পাশে আছেন’। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনিও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর ‘সন্ত্রাসী হামলা’র নিন্দা জানান। আর সু চি মনে করেন, এটা রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বা নির্মূল করে ফেলার ইস্যু না; বরং এটা হলো, ‘ইসলামি টেররিজমের’ ইস্যু। মোদি তা সঠিক মনে করেন এবং এতে সমর্থন জানান। এটা ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। অবশ্য তার এই সফর শুরুর আগের সপ্তাহে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হঠাৎ করে বলা শুরু করেছিলেন, ভারতে নাকি ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছে (জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তু কমিশনারের মতে, ১৬ হাজার)। তাদের বের করে দেয়া হবে বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। এটাও মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সু চির মন পাওয়ার জন্য ভারতের হাস্যক এক প্রচেষ্টা তা বলাই বাহুল্য।

মোদির মিয়ানমার সফর শেষে তিনদিন পরে ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টে শুরুতেই লিখছে যে, মোদি তার সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে দেখেছেন চরম সন্ত্রাসবাদের ঘটনা হিসেবে এবং তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরে হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ রোহিঙ্গা নির্যাতন ও তাদের উদ্বাস্তু হওয়ার দিকটা নিয়ে কিছুই বলেননি। অথচ আচমকা ১০ সেপ্টেম্বর এই বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা আবেদন রাখব, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ‘সামালে আর পরিপক্বতার’ সাথে যেন নাড়াচাড়া করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ‘বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের’ দিকটাও যেন দেখা হয়।” বেশির ভাগ পত্রিকা শুধু এতটুকুই ছেপেছে, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক বাড়তি বাক্য ছেপেছে, ‘পেছনের কারণ’ বলে। তা হলো, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে দেখা করার পরই ভারত নাকি তার মত বদলিয়ে ফেলে। আসলে এটা হলো, ভারতের নিজের ইউ-টার্নের পক্ষে এক সাফাই নিজ উদ্যোগে ‘বাজারে ছেড়ে রাখা।’ আর এই উল্টা মোড় নেয়া যে, কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব তা পরোক্ষে হলেও স্বীকার করে নেয়া। ভারতের উচিত ভবিষ্যতে এমন বেকুবি আর দেউলিয়া সিদ্ধান্ত না নেয়া।
সকালে মোদি যাকে ‘রোহিঙ্গা টেরর’ বলছেন, বিকেলে তারই সুরক্ষার জন্য আবার সু চিকে ‘বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের দিকটা সামলাতে’ বলছেন। নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনীতির একই সাথে সাপ আর ওঝার ভূমিকার ক্লাসিক উদাহরণ এটা।

কিন্তু আসলেই কি ভারতের কূটনীতিকেরা এতই বেকুব, তারা নিজেদের এই স্ববিরোধিতাটা দেখতেই পায়নি? না, বরং এটা আসলে জেনেশুেেন নিজেকে ‘বেকুব’ বলে হাজির করা এবং মনে করা যে, এতে বেশি লাভ হবে। অনেক পত্রিকাতেই ভারতের বিদেশ বিভাগের মন্তব্যের আর একটা কথা আছে। তা হলো, ‘এটা বুঝাই যাচ্ছে যে সহিংসতা শেষ হয়েছে, রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত ফিরে আসছে।’ অর্থাৎ ভারতের ফরেন অফিস বলতে চাইছে, হ্যাঁ আমরা সকাল-বিকেল ভোল বদলিয়ে আজ বদলেছি। তা বদলেছে কারণ রাখাইনে দাঙ্গা থেমে গেছে। কিন্তু এটা খুবই অকূটনীতিক ভাষা। কারণ মিয়ানমারে দাঙ্গা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কিনা তা ভারত বলার কে? এটা তার বলার কথা না। এমনকি ভারত এটা জানলেও তা বলা উচিত না। এটা বললে একমাত্র মিয়ানমার বলতে পারে, আর এরপরই সে ভাষ্য ভারত ব্যবহার করতে পারে মাত্র, এর আগে নয়। তাহলে ভারত এই কূটনৈতিক রীতি ভঙ্গ করল কেন?

কারণ, এবারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো এক অজুহাতে বাধ্য করে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বের করে দেয়া, যাতে প্রায় চার লাখের বেশি মানুষ এরপর থেকে শরণার্থী হয়ে যায়। তাতে লাভ হবে যে, মিয়ানমার দাবি করছিল এরা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। কিন্তু ওরা দেশের ভেতরে বসবাস করছিল বলে সেই দাবি হালে পানি পাচ্ছিল না। তাই এবার আপাতত মিয়ানমারের অর্জন হলো, মূল জনগোষ্ঠী থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়া সম্ভব হয়েছে। তাই, এখন ভারত অবস্থান বদলালে ‘তেমন অসুবিধা নেই’। তাই ভারত নিজ উদ্যোগে দাবি করছে ‘দাঙ্গা থেমে গেছে’, ফলে তাদের অবস্থান বদল হচ্ছে তা হলে মূল কথা হচ্ছে, সু চিকে ভারতীয় সার্ভিস পুরা মাত্রায় দেয়া হয়ে গেছে বলে ভারত অবস্থান বদলিয়ে নিয়েছে, তাতে যতই কূটনৈতিক অমর্যাদা ভারতের হোক না কেন! অতএব এখন সময় গলা জড়াজড়ি করা। ত্রাণ পাঠানোর ছবি তোলা।

এ দিকে, চীনের গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়ছে আর তাতে নিজের উদ্বেগের কথা চীনকে জানিয়েছে। অথচ রোহিঙ্গাদের নির্মূল নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হওয়ার মতো ব্যাপার চীনের কাছে ইস্যু নয়। তাই এ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ চীন করেনি। চীনের ওই খবরের শিরোনাম হলো, মিয়ানমার ‘শান্তি আর স্থিতিশীলতা সুরক্ষা করছে’ বলে চীন মনে করে। ফলে ভারতের মতো চীনও পিছিয়ে না থেকে এখন ত্রাণ পাঠাতে ব্যস্ত।

আমেরিকাও তাই; সেও পিছিয়ে নেই। আমেরিকান উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফি ৮ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আর তিনি মনে করেন, রাখাইন রাজ্যে একা মুসলমানেরা নির্যাতিত নয়, মুসলমানদের হাতে অন্যরাও নির্যাতিত।’ এটাই সু চির মনোভাব। সু চি চান সবাই ‘এটা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা’ বলে প্রচার করুক। আর সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা ক্লিনজিং বা সাফা নির্মূল করার বিষয় আড়াল করুক।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫