ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২০ জুলাই ২০১৭

প্রথম পাতা

বিভিন্ন স্থানে পানি কমছে তীব্র হয়েছে নদীভাঙন

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

১৭ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ০৬:২৩


প্রিন্ট
জামালপুরের ইসলামপুরে ত্রাণের আশায় বানভসি মানুষ : নয়া দিগন্ত

জামালপুরের ইসলামপুরে ত্রাণের আশায় বানভসি মানুষ : নয়া দিগন্ত

কুড়িগ্রাম জেলার ৬০ ভাগ বন্যাদুর্গত পরিবার এখনো ত্রাণ পায়নি। বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বন্যার পানি কমলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। লালমনিরহাটে নদীতে বিলীন তিনটি বিদ্যালয়সহ পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি, হুমকির মুখে বাঁধগুলো। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে বাঁধ ভেঙে পাঁচ গ্রাম নিমজ্জিত হয়েছে। জেলার ইসলামপুরে ত্রাণ না পেয়ে বেশির ভাগ বানভাসিকে প্রায় প্রতিদিনই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলের দুই ইউনিয়নে অর্ধশত ঘরবাড়ি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়েছে, পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। 
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলাসহ সব ক’টি নদ-নদীর পানি হ্রাস পেলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকায় বন্যাদুর্গতদের দুর্ভোগ কমেনি। ব্রহ্মপুত্রের পানি এখনো চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ছয় সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম সদর ও নাগেশ্বরী উপজেলার ৪২ ইউনিয়নের দুই শতাধিক চর ও দ্বীপচরের পাঁচ শতাধিক গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী জীবনযাপন করছেন। টানা ১০-১২ দিন ধরে পানিবন্দী এসব মানুষ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে পড়েছেন। চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গো-খাদ্যের সঙ্কটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বন্যাকবলিত ইউনিয়নগুলোর চেয়ারম্যানরা জানান, তাদের এলাকার বন্যাকবলিত মাত্র ৩০ ভাগ পরিবারকে ত্রাণের ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। আর কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে ৬০ ভাগ পরিবার কষ্টে থাকলেও তাদের ত্রাণের চাল দেয়া সম্ভব হয়নি। 
কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেয়ার আলগার চর গ্রামের শাহাজাহান আলীর স্ত্রী আলপনা বেগম জানান, ১২ দিন ধরে বাড়িতে গলা পানি। পাশের উঁচু জায়গায় ছেলেমেয়ে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। ঘরে খাবার নেই। এখনো সরকাার সাহায্য পাইনি। একই চরের রবিউল ইসলামের স্ত্রী শেফালী বেগম বলেন, ১০ দিন ধরে নৌকায় আছি। সকাল থেকে না খেয়ে আছি। সাহায্য দূরের কথা, এখন পর্যন্ত কেউ দেখতেও আসেনি।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মসলার চরের দিনমজুর আব্দুল মালেক জানান, এখনো বাড়ি থেকে পানি নামেনি। চেয়ারম্যান ১০ কেজি চাল দিয়েছে। বাড়িতে আটজন মানুষ। এ চাল দিয়া তিন দিনও যায়নি। একই চরের আজিজুল ইসলামের স্ত্রী জেসমিন জানান, আমরা কোনো সাহায্য পাইনি। এ চরের দু-একজন পেয়েছে। একই অবস্থা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার দুই শতাধিক চরাঞ্চলের।
চিলমারী উপজেলার অষ্টমীর চরের চেয়ারম্যান মো: আবু তালেব ফকির, উলিপুরের হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন ও সদরের যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো: আইয়ুব আলী সরকার জানান, তাদের ইউনিয়নের বন্যাদুর্গত পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩০ ভাগ পরিবারকে ত্রাণের ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। 
বগুড়া অফিস ও সারিয়াকান্দি সংবাদদাতা জানান, জেলার সারিয়াকান্দিতে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও যমুনা নদীর পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন করে কোনো এলাকা প্লাবিত না হলেও বন্যাকবলিতরা দুর্ভোগে রয়েছেন। পানি কমতে শুরু করলেও তারা বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না। এখনো বিভিন্ন এলাকায় কোমর পানি রয়েছে। 
সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, বন্যায় ৯ ইউনিয়নের ৫৮টি গ্রামের ১১ হাজার ৭১০টি পরিবারের ৪৭ হাজার ৮১০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৮০টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ও ১৫ হাজার ৫২০টি পরিবারের তিন হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫৯ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ও ৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ ৫৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিবন্দী রয়েছে। ৮৭৫টি টিউবওয়েল ও ৬১টি পুকুর বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। বন্যার কারণে তিন হাজার ৩৭৫টি পরিবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে এবং ৭৬৫টি পরিবার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। 
লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান, লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সাত দিনে জেলার সদর, আদিতমারী ও হাতীবান্ধা উপজেলায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙনে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ জেলায় পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। 
হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রেজ্জাকুল ইসলাম কায়েদ জানান, তার ইউনিয়নে দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৭টি বসতবাড়ি ও অনেক আবাদি জমি নদীতে চলে গেছে। ওই উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শফিউল আলম রোকন জানান, তার ইউনিয়নে বুধবার বিকেলে পশ্চিম হলদিবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তিস্তা নদীতে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া গত চার দিনে তার ইউনিয়নে ২৬টি বসতবাড়িসহ অনেক আবাদি জমি নদীতে চলে গেছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলায় চারটি, আদিতমারী উপজেলায় চারটি ও হাতীবান্ধা উপজেলায় ১১টিসহ মোট ১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 
আদিতমারী উপেজলার মহিষখোচা ইউপি চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়নে গোবর্র্ধ্বন স্প্যার বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বেশ কিছু বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে। সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউপি চেয়ারম্যান ঈদ্রিস আলী জানান, ধরলা নদীর তীরবর্তী শহর রক্ষা বাঁধটি হুমকির মুখে রয়েছে। হাতীবান্ধা উপেজলার সির্ন্দুনা ইউপি চেয়ারম্যান নুরল আমিন জানান, তার ইউনিয়নে ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সাথে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। ওই উপেজলার সিঙ্গিমারী ইউপি চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন দুলু ও গড্ডিমারী ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ডা: আতিয়ার রহমান জানান, বন্যার পানিতে সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের ধুবনী গ্রামের শহর রক্ষা বাঁধের আট স্থানে ভেঙে গেছে ও গড্ডিমারী ইউনিয়নের তালেব মোড় এলাকায় এক বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। 
দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, দেওয়ানগঞ্জে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পাঁচ গ্রামের বাড়িঘর ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার ১ ও ২নং ওয়ার্ড চরকালিকাপুর ও চুনিয়াপাড়া গ্রামের সীমানাঘেঁষা এ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি শনিবার দুপুরে রহস্যজনকভাবে ভেঙে কালিকাপুর, চরকালিকাপুর, মাঝিপাড়া, চুনিয়া পাড়া, বাজারী পাড়া ও গোবিন্দ নগর গ্রামসহ অন্যান্য এলাকায় প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। বাঁধটি কেউ ভেঙে দিয়েছে, নাকি ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি ঢুকে বাঁধ ভেঙে গেল তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে। 
পাউবো সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার পানি কমলেও এখনো বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার কারণে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, পানিবাহিত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। দেখা দিয়েছে গো-খাদ্য সঙ্কট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৌকা দেখলেই ত্রাণের জন্য ছুটে আসছেন বন্যার্তরা। 
ইসলামপুর (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, ইসলামপুরে ত্রাণ না পেয়ে বেশির ভাগ বানভাসিকে নিত্যদিন খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। গত শুক্রবার দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম ইসলামপুর উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন ও বন্যাদুর্গতদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। ত্রাণের জন্য হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলেন দুই সহস্রাধিক বানভাসি। মন্ত্রী এসে ত্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু তাপরও বেশির ভাগ বানভাসীকে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। 
এ দিকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি হ্রাস পেলেও এখনো বিপদসীমার ৮১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানি দ্রুত হ্রাস পেলেও আড়াই লক্ষাধিক দুর্গত মানুষের বাড়ি ফিরতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন অভিজ্ঞমহল। 
শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, পদ্মা নদীর পানি বেড়ে শিবচরের চরাঞ্চলের চরাঞ্চলের চারটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। দুইটি ইউনিয়নে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, তিন-চার দিন ধরে পদ্মা নদীর শিবচর অংশে অস্বাভাবিক গতিতে পানি বাড়ছে। এতে উপজেলার পদ্মা নদীর বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের চারটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানির তোড়ে ও তীব্র স্রোতের ফলে চরাঞ্চলের কাঁঠালবাড়ি ও চরজানাজাত ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে কয়েকটি বিদ্যালয়, মাদরাসা, মসজিদ ও বহু বাড়িঘর। সর্বত্র প্লাবিত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রমসহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। 
কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাহাবুব ফকির বলেন, এ ওয়ার্ডের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। সবাই ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা প্রয়োজন।
 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫