ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’ ব্যক্তি

গৌতম দাস

২১ মে ২০১৭,রবিবার, ১৮:০৭ | আপডেট: ২১ মে ২০১৭,রবিবার, ১৮:১৮


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

একটি দৈনিক পত্রিকার একজন কলামিস্ট বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’ ব্যক্তি কি না সেই সন্দেহ করেছেন। ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’! এটা কি রাজনীতি পর্যালোচনার ভাষা, নাকি ‘যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ জাতীয় মানসিকতার সিম্পটম? অথবা ‘ব্যাটলিং বেগমস’ এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে এক-এগারোর রাজনীতির নতুন ড্রিল? শিরোনামের স্টাইল খেয়াল করলেই সন্দেহ জাগে, এর উদ্দেশ্য কী? যাদু মিয়ার সাথে জিয়াউর রহমান নাকি একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন। আর এখন ১০ মে খালেদা জিয়া তার ‘ভিশন ২০৩০’ পেশ করার পরপরই দৈনিক পত্রিকাটির একটাই আবদার, সেই ‘গোপন’ চুক্তি বেগম জিয়া প্রকাশ করুন। ভিশন ২০৩০-এর ভালো-মন্দ বিচারের যেন কোনো বালাই নেই।
বিএনপি ও তার নেত্রীর রাজনীতির সমালোচনা-পর্যালোচনা হতেই পারে, কিন্তু তার মধ্যে গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিসম্পন্ন ‘উপলব্ধি’ আছে কি না সেটা বিচার করার বিশেষজ্ঞ কোথায় পাবেন? দ্বিতীয়ত, একটি দেশ বা সমাজের রাজনীতি স্রেফ একজন ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না। যেসব রাজনীতিককে কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী ও গোষ্ঠী নিজ নিজ ক্ষমতা এবং নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক সম্মতি তৈরি করে থাকে, তার সাথে সেই নেতাদের সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন বয়ানের ভূমিকা থাকে। থাকবেই। ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কে যেসব বয়ান সমাজে হাজির আছে, সেসব বয়ানকে কেন্দ্র করে তর্ক-বিতর্ক সমালোচনা-পর্যালোচনা ছাড়া জাতীয় রাজনীতির তেমন গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি। তার মধ্য দিয়েই জনগণের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটে। এই গোড়ার কথা যখন আমরা মনে রাখি না, তখন কিছু সংবাদমাধ্যম দেশের রাজনৈতিক দুর্দশার সমাধান হিসেবে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা তৈরি এবং তা কার্যকর করার কাজে নেমে পড়তে পারে। এক-এগারোর সময় এটাই আমরা দেখেছি। ‘মাইনাস টু’ রাজনীতির মূল তত্ত্ব ছিল- বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য দু’জন ‘ব্যাটলিং বেগম’ অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়ী। অতএব, এদের দু’জনকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়াই আসল কাজ। ‘চিরতরে সরিয়ে দেয়া’র অর্থ পাঠক নিজের মতো করে বুঝে নিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য যখন আমাদের বিচারের মানদণ্ড খালেদা-শেখ হাসিনার ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত উপলব্ধি’ থাকা না থাকার বিচার, তখন আমরা মূলত মাইনাস টুর তত্ত্বই আওড়াই। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্টভাবে বেগম জিয়া সম্পর্কে এই বিশেষণ প্রয়োগের চেষ্টা দেখে আন্দাজ করা যায়, এবার সম্ভবত ‘মাইনাস ওয়ান’ এটা।
পর্যালোচনায় ভালো-মন্দ উভয় দিকই তুলে ধরার কথা। মূল্যায়নে বসলে বিএনপির একগাদা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা অনেকেই খুঁজে পেতে পারেন, কিন্তু সমস্যা হয় যখন চরম প্রিজুডিস বা বাকশালপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ সরিয়ে না রেখে উল্টো তা দিয়েই রাজনীতির মূল্যায়ন করা হয়।
কোনো রাজনীতি বা রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ বিচার করবেন কী দিয়ে? সে বিচারকাজে ক্রুশিয়াল বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী? সেগুলো জেনে রাখার বদলে নিজের মতান্ধতার ওপর ভরসা করে বিচারে বসলে তাতে সেটা ঘোরতর দলবাজিই হবে।
বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীলরা’ কেউ কোনো দিন শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর কোনো রিভিউ, সমালোচনা করেছেন জানা যায় না। অনেকের মনে পড়বে হয়তো একদলীয় শাসন অথবা মাত্র চারটি সংবাদপত্র রাখা ইত্যাদির কথা। কিন্তু সেই সংশোধনী কার্যকর করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্যগত ত্রুটি ঘটেছে তার আসল বিচার নয় এগুলো। অর্থাৎ কনস্টিটিউশনাল বা রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা নয়।
গঠনপ্রক্রিয়া কিংবা বৈশিষ্ট্য কোনো দিক থেকে এমনকি বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রও আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। তবুও সেটা ইতিহাসের ফল, আমরা তা মেনে নিয়ে যতটুকু পেয়েছিলাম, তাই নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম। সে ক্ষেত্রে তার যতটুকু ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য আছে তা অক্ষুণ্ন রাখাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীর ফলে বাংলাদেশ আর কোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়, বরং এক ধরনের স্বৈরশাসন আনয়নকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন বদলানোর ফলে সেই রূপান্তর কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে খুব কমই পর্যালোচনা দেখা যায়। তবু অনেকের সহজ ফর্মুলা হলো- জিয়াউর রহমানকে গালিগালাজ করা। অথচ বাকশাল সম্পর্কে টুঁ-শব্দ না করে সারাক্ষণ শুধু সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গালমন্দ পাড়া। সামরিক শাসন বা সামরিকতন্ত্র খারাপ, অবশ্যই। কিন্তু একদলীয় বাকশালকে মহৎ প্রমাণ করার সুবিধা না পেয়ে জিয়াউর রহমান কত খারাপ ছিলেন, সেটা প্রমাণে উঠেপড়ে লাগলে গণতন্ত্রের কতটুকু কল্যাণ হবে?
কোনো কোনো কলামিস্ট নিজেকে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু আজব ব্যাপার হলো- আমাদের সংবিধানে সর্বপ্রথম যে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে প্রায় সব ধরনের ক্ষমতা সঞ্চিত করা হয়েছিল, সেটা চতুর্থ সংশোধনী। তা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে তাদের কলম জাগে না, বরং কেউ কেউ কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বলে এক রহস্য তৈরি করতে চান। কারো কারো মতে, সংশোধনী প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীন যে একক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিল, জিয়া নাকি এর চেয়েও আরো বেশি ক্ষমতা চেয়েছিলেন। কলামিস্ট জানাচ্ছেন, জিয়া শেষে এমন ক্ষমতা নেননি। সেই না নেয়ার দলিলই হলো কথিত ‘গোপন চুক্তি’। তাহলে সেই দলিল বলে যদি কিছু থেকেও থাকে তবে তা বিএনপি বা জিয়ার কোনো কলঙ্কের দলিল হয় কেমন করে? কিন্তু কলামিস্টের দাবি- কথিত ওই গোপন দলিল ‘কলঙ্কিত’ এবং তা ‘খালেদা জিয়াকেই প্রকাশ করতে হবে’।
তামাশা হলো, বলা হচ্ছে- ওই গোপন দলিল আসলে জিয়াউর রহমানের বাড়তি ক্ষমতা না নেয়ার দলিল বা রাজনীতিবিদ যাদু মিয়ার সাথে ‘সন্ধিপত্র’- অথচ এই কথিত চুক্তি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি আর জিয়া এবং বিএনপিকে ‘পাপিতাপী’, ‘অভিশপ্ত’ বলে ইঙ্গিত তৈরি করা হচ্ছে। বরং কেউ যদি সত্যি সত্যিই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক সীমাহীন ক্ষমতা সঞ্চিত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চান, তবে সে ক্ষেত্রে চতুর্থ সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা দিয়েই তাকে শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যদি তার প্রগতিশীলতাবোধ, বাঙালি জাতীয়তাবোধ কিংবা বাকশালপ্রীতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা পেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস বিচারে বিশেষত কনস্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী কী কী কারণে ক্ষতিকর এমন কোনো একাডেমিক মূল্যায়ন আমরা ‘প্রগতিশীলদের’ ঘর থেকে বের হয়েছে বলে দেখিনি। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসরেও এ বিষয়ে আর যা দেখা যায়, সেগুলোকে বড়জোর পার্টিজান বা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সমালোচনা। এক কথায় বললে চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে আসলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের খোদ কনস্টিটিউশনকেই ‘নাই’ করে দেয়া হয়েছিল। সোজা কথায় বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে একটা রাষ্ট্র বানানো হয়েছিল, সেটা চতুর্থ সংশোধনী ভেঙে দিয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী রাষ্ট্র নিরাকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যে অভিজ্ঞতা থেকে বারবার আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
এর মূল কারণ এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের আদালতে রিট করার ক্ষমতা (আর্টিকেল ৪৪) কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, জুডিসিয়ারির বা আদালতের রিট শোনার যে আলাদা নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া ছিল [আর্টিকেল ১০২ (১)], সেটাও চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। এ কথাগুলো সবচেয়ে সহজে বোঝা যায় কনস্টিটিশনের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ব্যাপারে আপিল কোর্টের রায়ে। এই সংশোধনী এভাবেই প্রেসিডেন্টকে সর্বময় ক্ষমতাবান বানিয়েছিল, ফলে বাংলাদেশ আর কোনো প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকেনি। যে রাষ্ট্রে রিট করার সুযোগ নেই, সেটা আর রিপাবলিক থাকে না। এই দিকটি নিয়ে কোনো জজ-উকিল বা কোনো রাজনীতিবিদকে আমরা পয়েন্ট তুলতে শুনিনি। এটাও এখন প্রমাণিত, রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশনের ভালো-মন্দ বিচার কী করে করব, তা বোঝার ক্ষেত্রেও আমরা এখনো যথেষ্ট লায়েক হইনি। এখনো কেবল দলবাজি আর প্রগতিশীলতার ভান ও ভণ্ডামির মধ্যে আটকে আছি। অথচ আমরা আবার আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিচারক হতে চাচ্ছি।
’৭৫-পরবর্তী সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা
কোনো কোনো কলামিস্টের এক প্রবল পছন্দের বয়ান হলো ’৭৫-পরবর্তী সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার’ তুলনা। এটাতে তার চিন্তা করার কাঠামোও ধরা পড়ে। চতুর্থ সংশোধনীর পক্ষে সাফাই যারাই দেন তাদের সাধারণ বয়ান এটা। তারা বলতে চান, বাকশাল দানব ক্ষমতা তৈরি করলেও যেহেতু এটা বেসামরিক শাসন, আর বেসামরিক শাসন মানেই বৈধ শাসন, তাই দানব হলেও এটা বৈধ, ফলে গ্রহণীয়। আর তাই বিপরীত যুক্তিতে, সামরিক শাসন অবৈধ। বিএনপির বিরুদ্ধে এটাই প্রধান অস্ত্র, কিন্তু বিএনপির মহলবিশেষের বুদ্ধিজীবীরা এই কৌশলের মর্ম ধরতে পারেন না বলে এর কোনো উত্তর দেয়ার হিম্মত দেখাতে পারেননি।
আসলে এভাবে বৈধ-অবৈধের ভাগাভাগির লাইন টানা শঠতা। কেউ কেউ বলেন, চতুর্থ সংশোধনীর ভেতরে যত খারাপ কিছুই থাক, তবু এটা বৈধ, কারণ তা সিভিলিয়ান ক্ষমতা। এটাই চাতুর্য। কনস্টিটিউশনে চতুর্থ সংশোধনী এনে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে চাইলে কোনো নাগরিকের আইনিভাবে আদালতে যাওয়ার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছিল। ফলে এর পরের বাংলাদেশ দেখতে তখনো একই দেশ বা আধুনিক রাষ্ট্র মনে হলেও কার্যত এটা আর মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র ছিল না। আমি নিশ্চিত কোনো ‘প্রগতিশীল’, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদীর’ চিন্তায় এটা ধরা পড়বে না। এভাবে তারা চিন্তা করে দেখতে অভ্যস্ত নন। এমনকি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও নন। চতুর্থ সংশোধনী যেখানে রাষ্ট্রের রিপাবলিক বৈশিষ্ট্যই নষ্ট করে দেয়, এরপর সেই রাষ্ট্রটি বৈধ নাকি অবৈধ, সামরিক নাকি বেসামরিক সেটা কি আর কোনো মুখ্য বিষয়? একদলীয় বাকশালী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব আসলে আমাদেরই এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। এটা বোঝার ক্ষমতা বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নেই।
মনে রাখতে হবে, একটা কালাকানুন বা কালো আইন চরম দমনমূলক ও নিপীড়ন হলেও সেটা বিদ্যমান সংবিধানের কারণে ‘বৈধ’ আইন হতে পারে। এই বৈধ-অবৈধ জাতীয়, শঠতাপূর্ণ প্রশ্ন তুলে নিজেদের আড়াল করার প্রয়াস চলে।
সে সময়ের জিয়ার সামরিক ক্ষমতা, সেটাও সামরিক নাকি বেসামরিক সে বিচারে যাওয়াও অপ্রয়োজনীয়। কারণ সেটা ছিল এক অন্তর্বর্তী ধরনের ক্ষমতা মাত্র। এটাই ওই ক্ষমতার মূল বৈশিষ্ট্য। তার ভালো-মন্দ নির্ধারিত হবে নতুন যে ক্ষমতা কাঠামো সে তৈরি করবে বা হবে, এর গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। কনস্টিটিউশনাল সরকারমাত্রই অন্তর্বর্তীকালীন।
তবু কারো কারো মনে হতে পারে যে না, ‘ক্যান্টনমেন্টে বসে’ যারা দল বানাল, তাদের ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যায় না। এক-এগারোর সরকার কি সামরিক সরকার ছিল না? আর এই সামরিক সরকারের সাথে একটি প্রগতিশীল মহলের সম্পর্ক কী ছিল তা সবার জানা। তখন ‘ক্যান্টনমেন্টে বসে’ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কারের নামে মহৎ কাজে লিপ্ত হয়েছিলেন কারা? ওই কাজ, ওই সামরিক সরকার কি ‘বৈধ’ হয়েছিল?
‘এক-এগারো’র ক্ষমতায় ইচ্ছামতো যে রাজনৈতিক সংস্কার করা হয়, কী তার পরিণতি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও এর কাঠামোতে এমন কিছু বা কী ছাপ তখন রাখা হয়েছিল, যার সুফল এই আট বছরের হাসিনা সরকারের থেকে আমরা পাচ্ছি? সেই সংস্কারের ফসল বর্তমান শাসনই নয় কি? কিন্তু ইতিহাস সবাইকে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।
কনস্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ
কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ‘সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, যা পার্লামেন্টকে একটি রাবার স্ট্যাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেত্রীর বশংবদ করে রেখেছে, সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।’ ব্যাপারটি পড়লে সবারই মনে হবে, হ্যাঁ, তাই তো! কাকে ধরেছেন? খালেদা জিয়া? নাকি এখানে অনুল্লেখ থাকা শেখ হাসিনাকে? মোটেও না।
এই ৭০ অনুচ্ছেদই বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবচ। আমরা বরং এসব স্বীকার করার সৎ সাহস দেখতে চাইতে পারি। হাসিনা-খালেদারা খারাপ রাজনীতির ধারক-বাহক হলে এখান থেকে বের হতে, তা পরিষ্কার করতে পাল্টা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া লাগবে। বিদেশী স্বার্থে সংস্কারের নামে পরাশক্তির স্বার্থরক্ষা নয়।
কেউ বা অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রও দলের প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য দায়ী। তারা নিশ্চয় ভুুলে যাননি মান্নান ভূঁঁইয়াকে দিয়ে কিভাবে বাধ্য করে সংস্কার ধারার বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে কিভাবে ছেঁচা হয়েছিল, এর কষ্ট মৃত দেলোয়ার হোসেনই জানতেন। তবু তার গৌরব, তিনি পতাকা ছাড়েননি। শামসুল হুদার নির্বাচন কমিশন কোনটা আসল বিএনপি, সেই রায় দিয়েছিল। তবে পরে তিনি নিজেই তার এই কাজ অন্যায় হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। কোনটা আওয়ামী লীগ আর কোনটা বিএনপি, এটা যদি বিদেশীরা নির্ধারণ করতে থাকে, তবে এমন ব্যবস্থা ও সুযোগ যত দিন থাকবে তত দিন হাসিনা-খালেদার জন্য এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থান হবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫