ঢাকা, বুধবার,২০ নভেম্বর ২০১৯

শেষের পাতা

টানা সাত মাস বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যয়বহুল তারল্য ব্যবস্থাপনায় আয় কমছে ; ব্যাংকের টাকায় ভল্ট ভরছে বাংলাদেশ ব্যাংক ; বিদেশী ঋণের চাপ বাড়ছে ব্যাংকের ওপর

আশরাফুল ইসলাম

১৮ এপ্রিল ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৬:৪৫


প্রিন্ট

বাজারে অলস টাকার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা সুদ দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অলস টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ভল্টে অলস রেখে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, টাকার প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ অলস অর্থের ব্যয়বহুল ব্যবস্থাপনায় নেমেছে। গতকালও পাঁচ হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এ টাকা কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা না হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে অলস ফেলে রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, শুধু গতকালই সাত দিন, ১৪ দিন ও ৩০ দিন মেয়াদি বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে তুলে নেয়া হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আর প্রতিটি বিলের জন্য ১০০ টাকার বিপরীতে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৭টি ব্যাংককে পরিশোধ করবে চার কোটি ১৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে সাত দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে তিন হাজার ৯১০ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এ জন্য নির্ধারিত মেয়াদ শেষে পরিশোধ করতে হবে দুই কোটি ২৩ লাখ টাকা। ১৪ দিন মেয়াদি বিলের ৫৮৮ কোটি টাকার বিপরীতে ৬৭ লাখ ২০ কোটি টাকা এবং ৩০ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকার বিপরীতে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে পরিশোধ করতে হবে এক কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এভাবে গত সাত মাস ধরে গড়ে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। আর এর বিপরীতে সুদ গুনছে।
কেন টাকা তুলে নেয়া হচ্ছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, বিনিয়োগ মন্দা তো রয়েছেই এর সাথে ব্যাংকিং খাতে অলস অর্থ বেড়ে যাওয়ার আরো একটি কারণ হলো বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশী ঋণ। জানা গেছে, এক সময় টাকার সঙ্কটের কারণে ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে বিদেশ থেকে ঋণ আনার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। পরে ব্যাংকগুলোও তাদের অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদেশী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের ঋণের জোগান দিচ্ছে। এর বাইরে সরকার আগে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ধার নিতো। কিন্তু এখন ধার না নিয়ে বরং সঞ্চয়পত্র থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যাংকের কম সুদের ঋণ পরিশোধ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যান মতে, এ দুই ধরনের বিদেশী ঋণ মিলে এর স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। ওই সূত্র জানিয়েছে, একে তো বিনিয়োগ মন্দার কারণে ভালো গ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে নতুন ঋণ নেয়ার জন্য, এর বাইরে ব্যবসায়ী পর্যায়ে বিদেশী ঋণ আনায় স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না। এর ফলে প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত অর্থ হাতে থাকছে। নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বাজারে কোনো টাকা খাটাতে তারা পারছেন না। কলমানি মার্কেটেও কোনো চাহিদা নেই। এর পরও গতকাল নামমাত্র সুদে তার ব্যাংক গতকাল ২০০ কোটি টাকা কলমানি মার্কেটের মাধ্যমে অন্য ব্যাংককে ধার দিয়েছেন। ওই এমডি জানিয়েছেন, একে তো বিদেশী ঋণের বিপরীতে সুদ আকারে বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে বিদেশে, অন্য দিকে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর আমানত অব্যবহৃত থাকায় ব্যাংকের অলস অর্থ বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর মুনাফায়। গত রোববার প্রাইম ব্যাংকের এমডি আহমদ কামাল খান চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশী ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
টাকা তুলে নেয়ার প্রভাব : বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশী ঋণ ও বিনিয়োগ মন্দাজনিত কারণ এবং সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ না নেয়ায় ব্যাংকে অলস টাকার পরিমাণ বেড়ে চলছে। এ অলস টাকার কারণেই বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার করার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যয়বহুল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। ব্যাংকারেরা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। কেননা প্রতিদিন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অলস টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলে নিচ্ছে। এ অর্থ কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে অলস ফেলে রাখছে। আর এর বিপরীতে সুদ গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বছর শেষে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫