ঢাকা, সোমবার,০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

শেষের পাতা

বাংলাদেশে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ

মেরু অঞ্চলের তাপপ্রবাহ ও এল নিনোর প্রভাব

হামিম উল কবির

১৬ এপ্রিল ২০১৭,রবিবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৭,রবিবার, ০৬:৫০


প্রিন্ট

মেরু অঞ্চলের তাপপ্রবাহ ও এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বেড়েছে অস্বাভাবিক আচরণ। ফলে বাংলাদেশে এক দিকে বাড়ছে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি। আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতার কারণে এক দিকে হয়ে গেল ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে বন্যা। অন্য দিকে তাপপ্রবাহে দেশের এক প্রান্তে সৃষ্টি হয়েছে অসহনীয় অবস্থা। অত্যধিক তাপে নানা ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। চলতি মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও এ মাসেই দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসও রয়েছে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইতোমধ্যে চলছে মৃদু তাপপ্রবাহ। আবার এপ্রিলের অতিক্রান্ত অর্ধেক সময়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়ে গেছে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের হাওর এবং ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরের ফসল ভেসে গেছে সীমান্তের ওপার থেকে আসা ঢলের পানিতে। বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশে এ ধরনের আবহাওয়া অস্বাভাবিক রকমই ঠেকছে আবহাওয়াবিদদের কাছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশান্ত মহাসগারীয় ইএনএসও অ্যাপ্লিকেশন কাইমেন্ট সেন্টারের গ্রাজুয়েট ফ্যাকাল্টির প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট ড. মো: রাশেদ চৌধুরীর কাছে ঠিক এ রকমই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া কি চলতি বছর অস্বাভাবিক আচরণ করছে বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে মো: রাশেদ চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ুই অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য, তা নয়। বিশ্বব্যাপীই অস্বাভাবিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণের জন্য দায়ী এল নিনো, লা নিনা এবং এল নিনো থেকে নিরপেক্ষ অবস্থা এবং তা থেকে লা নিনায় রূপান্তর হওয়ার সময়টা। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো উত্তর মেরু অঞ্চলে তাপপ্রবাহও অনেকটা দায়ী।
রাশেদ চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে এ বছর জলবায়ু পরিবর্তনে যা হয়েছে তা বুঝতে হলে আমাদের ২০১৫ সালের আবহাওয়া থেকে শুরু করতে হবে। আবহাওয়ার এ আচরণের জন্য এল নিনো ও লা নিনার প্রভাব রয়েছে।
এল নিনো ২০১৫ সালে শুরু হয় এবং এটা ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আরো শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা এল নিনোর সাথে জোরালোভাবে সম্পর্কিত। এ অববাহিকা এমনিতেই উষ্ণ, শুষ্ক। মাঝে মধ্যে অনাবৃষ্টির কারণে খরাপ্রবণ থাকে। এ কারণে ২০১৫ থেকে ২০১৬ সময়টি ছিল শুষ্ক (২০১৬ সাল ছিল একটু বেশিই শুষ্ক) এবং ২০১৬ সালে এর আগের বছরের চেয়ে ০.০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ বেড়েছে। এল নিনুর প্রভাবাধীন ছিল এ বছরটি। এ বছর কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমনের কারণে ০.০১ থেকে ০.০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে। জাতিসঙ্ঘ ২০১৬ সালকে সবচেয়ে উষ্ণতম বছর বলে গত জানুয়ারিতে ঘোষণা করেছে।
রাশেদ চৌধুরী জানান, চলতি বছরের মার্চে দুর্বল লা নিনা নিরপেক্ষ হয়ে গেছে। গত মার্চের শেষে এবং চলতি এপ্রিলের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকার কাছে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে আবারো এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টির হওয়ার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এখনো আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই যে এ পরিস্থিতিটা পরিপক্ব হবে না দুর্বল হয়ে যাবে। এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে সামনের মে মাসের প্রথম দিকে।
তিনি জানান, যদি সত্যিই এল নিনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে ২০১৬ সালের প্রলম্বিত এল নিনো প্রভাব দেখতে পাবো এ বছরেও। সত্যি যদি এ রকম ঘটে তাহলে গ্রীষ্ম মওসুমে বাংলাদেশের জলবায়ু কিছুটা শুষ্ক থাকবে। মনে রাখতে হবে যে পরিপক্ব হতে যাওয়া এল নিনু যেকোনো সময় পরিবর্তন হয়ে স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, জলবায়ুর অনেক জটিল ঘটনাগুলো ঘটে থাকে এল নিনো থেকে নিরপেক্ষ হয়ে যাওয়ার সময় অথবা নিরপেক্ষ অবস্থা থেকে লা নিনায় রূপান্তরের সময়। অতীতে বাংলাদেশে ঠিক এ রকম পরিস্থিতির সময় বড় বড় ঝড় হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে সম্ভবত এ রকমই একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।
রাশেদ চৌধুরী বলেন, আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না যে আমরা কোনো শক্তিশালী এল নিনো অথবা লা নিনা পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি কিনা। কিন্তু ২০১৭ সালে শক্তিশালী এল নিনু পরিস্থিতি ছাড়াও চলতি বছর পুরো পৃথিবীজুড়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। এটা বিজ্ঞানীদের ‘কাইমেট সিস্টেমের’ বোধগম্যতাকে সীমিত করে দিয়েছে।
রাশেদ চৌধুরী বলেন, চলতি (বাংলাদেশে বিগত) শীত মওসুমে উত্তর মেরু অঞ্চলে লক্ষ করা গেছে মেরু অঞ্চলীয় তাপপ্রবাহ। এ ঘটনা লক্ষ করা গেছে কমপক্ষে তিনবার। এর সাথে আটলান্টিক অঞ্চলের ঝড়ের আর্দ্রতাপূর্ণ বায়ু ও উষ্ণতাও ছিল।
এই বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উত্তর মেরু অঞ্চলের গলিত বরফ মহাসগারীয় বায়ুমন্ডলের সার্কুলেশন প্যাটার্নে (ঘূর্ণন প্রক্রিয়ায়) পরিবর্তন করে দিতে পারে। এ প্রক্রিয়াটি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলছে।
মেরু অঞ্চলের এ প্রক্রিয়াটির কারণে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, আরব উপদ্বীপ ও উত্তর আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা পড়ে গত বছরের কিছু সময়ে। রাশেদ চৌধুরী বলেন, উত্তর মেরু অঞ্চলের তাপপ্রবাহ বাংলাদেশের বর্তমান আবহাওযায় প্রভাব ফেলছে। একই সাথে বাংলাদেশে অস্বাভাবিক আবহাওয়ার এ কারণ এল নিনো থেকে নিরপেক্ষ অবস্থা ও তা থেকে লা নিনা এবং লা নিনা থেকে নিরপেক্ষ অবস্থা এবং তা থেকে এল নিনু পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার কারণেও ঘটছে বলে রাশেদ চৌধুরী বলেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫