ঢাকা, শুক্রবার,২২ নভেম্বর ২০১৯

শেষের পাতা

হাওরে ফসলহারা কৃষকের কান্নার রোল

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

০৭ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট
হবিগঞ্জে হাওরের বাঁধ রক্ষায় তৎপরতা; নেত্রকোনায় পাউবোর ত্রুটিপূর্ণ বাঁধ ধসে পড়ায় ফসল রক্ষায় কৃষকদের প্রাণান্ত চেষ্টা : নয়া দিগন্ত

হবিগঞ্জে হাওরের বাঁধ রক্ষায় তৎপরতা; নেত্রকোনায় পাউবোর ত্রুটিপূর্ণ বাঁধ ধসে পড়ায় ফসল রক্ষায় কৃষকদের প্রাণান্ত চেষ্টা : নয়া দিগন্ত

টানা অকাল বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির উঠতি বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। এতে হাওরজুড়ে কৃষকদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়েছে। কৃষক পরিবারের সদস্যদের চোখের পানি বানের পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। দুর্গত এলাকাগুলো থেকে পাঠানো প্রতিবেদন :
নেত্রকোনা থেকে ফজলুল হক রোমান জানান, প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের উঠতি বোরো ফসল হারিয়ে ঘরে ঘরে এখন কৃষকদের আর্তনাদ শুরু হয়েছে। কৃষকদের সোনালি স্বপ্ন এখন বানের পানিতে ভেসে গেছে। হাওর পাড়ে বাঁধ রক্ষায় কৃষকদের প্রাণান্তর চেষ্টার পরও শেষ রক্ষা হলো না। হাওরজুড়ে কৃষকদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল। মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা ও মদন উপজেলার হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাধারণ কৃষক ও পরিবারের সদস্যদের চোখের পানি বানের পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দুর্নীতির কারণে দায়সারা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কারণে সাধারণ কৃষকদের ঘাম ঝরানো ফসল গোলায় তোলার আগেই বানের পানিতে ভেসে যাওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতিপরায়ণ কর্তকর্তাদের দায়ী করছেন কৃষকেরা। গত রোববার ভোর রাতে মোহনগঞ্জের গাগলাজুরের চর হাইজদা ও খালিয়াজুরীর কিত্তনখলা বাঁধসহ বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ বোরো ফসল তলিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এখন পর্যন্ত কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নেত্রকোনা জেলায় ছোট-বড় ১৪০টি হাওরের মধ্যে মোহনগঞ্জেই রয়েছে বেশির ভাগ হাওর। মোহনগঞ্জের চরহাইজদা ও খালিয়াজুরীর কিত্তনখলা হাওর সব চেয়ে বড় হাওর। ওই দু’টি হাওর পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় প্রায় অর্ধলক্ষ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। আর এ সব হাওর রক্ষার্থে আশির দশকে উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের আজমপুর ছেছড়াখালি পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার চরহাইজদা বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়। এই বাঁধের জালাল পয়েন্টে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে পিআইসি প্রকল্প অর্থাৎ গত ৩১ মার্চ মেরামতের কাজ শেষ হওয়ার পরদিনই বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে যায়। পাশাপাশি এই বাঁধের পানি সাপমরা নদীসহ বিভিন্ন স্লুইস গেট দিয়ে প্রবেশ করছে জেলার ১০-১৫টি হাওরে। নতুন করে রেগুলেটর লাগানোর কথা থাকলেও গেটে তা না লাগানোর ফলে সাপমরা স্লুুইস গেট ভেঙে গিয়ে ডিঙ্গাপোতাসহ অনেক হাওর তলিয়ে গেছে বলে কৃষকেরা অভিযোগ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলায় চলতি বছরে এক লাখ ৮০ হাজার ১০২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হয়েছিল। তন্মধ্যে এক লাখ ৮৪ হাজার ৩২০ হেক্টর জমির ফসল অর্জিত হলেও গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার হাওরাঞ্চলের ব্যাপক ফসল তলিয়ে যায়। এমতাবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
মল্লিকপুর গ্রামের কৃষক, চাঁনমিয়া, কালাচান, আবদুস সালাম, মজিবুর রহমানসহ আরো অনেকে অভিযোগ করেন, বাঁধ ঠেকাতে দুই শতাধিক কৃষক আপ্রাণ চেষ্টা করেও বাঁধ রক্ষা করতে পারেননি। এ দিকে চরহাইজদা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন মান্দারোয়া গ্রামের কৃষক হারুন মিয়া, আবদুল জব্বার, ইয়াদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এইবার আমরা কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে শতাধিক একর জমিতে বোরো ফসল আবাদ করছিলাম। আর কয়েকদিন পরেই জমির ধান কাটা শুরু করতাম। কিন্তু নেত্রকোনার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও তাদের অধীনে গঠিত পিআইসি কমিটির লোকজন সময়মতো সঠিকভাবে বাঁধ মেরামত না করায় বাঁধ ভেঙে বেবাক জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
হাওর পারের কৃষক তসলিম উদ্দিন, মিরাজ আলী, আবুচাঁনসহ আরো অনেকে আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘সুধে ঋণ নিয়ে ফসল ফলাইছিলাম, কিন্তু বানের পানিতে ভাসাইয়া নেওয়াতে আমরার স্বপ্নসাধ ভাইঙ্গা খান খান হইয়া গেছে। বউ, পোলাপান লইয়্যা ক্যামনে চলবাম।’
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক বিলাস চন্দ্র পাল গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে বলেন, এ পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলে ২৯ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত পানি বাড়তে থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এই মুহূর্তে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা সম্ভব নয়। এ ছাড়া ফসল রক্ষার জন্য আমাদের কিছু করার নেই। সময় মতো পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যকর ব্যবস্থা নিলে ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে এড়ানো সম্ভব ছিল।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবু তাহের বলেন, উজান থেকে ঢলের পানি আসা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফসল রক্ষার অন্তত ৩৫ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এ পর্যন্ত অন্তত ১৫ কোটি টাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।
সুনামগঞ্জ থেকে মাহবুবুর রহমান পীর জানান, টানা প্রায় সাত দিন পর সুনামগঞ্জে রোদের দেখা মিললেও হাওরে চলছে ফসলহারা কৃষকের আর্তনাদ। বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে এরই মধ্যে জেলার প্রায় ৭৫ শতাংশ ফসলহানি ঘটেছে। টাকার মূল্যে যার ক্ষয়ক্ষতি হাজার কোটি টাকা। হাতেগোনা যে ক’টি হাওর এখনো অক্ষত আছে সেগুলোর অবস্থা এখনো নাজুক। সেগুলো নিয়েও কৃষকদের উৎকণ্ঠা এখনো কাটেনি। অকাল বন্যায় হাওরের বাঁধ ভেঙে জেলার ১১টি উপজেলার প্রায় সব ক’টিতেই বোরো ধানের ক্ষতিসাধন হয়েছে। সারা বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে জেলাজুড়ে কৃষকের মধ্যে চলছে হাহাকার।
হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এবারে বোরো ধানের দানা (চাল) আসার আগেই জেলার ১১ উপজেলার প্রায় সব ক’টি হাওরের ফসল ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগ-দুর্দশায় পড়েছেন জেলার ১৫ লাখ কৃষক। দিশেহারা কৃষকদের কেউ টল টলায়মান বাঁধ রায় ঝড়-বৃষ্টি উপো করে দিন-রাত বাঁধেই কাটাচ্ছেন। কেউ বা রাস্তায় নেমে বিােভ করছেন। আবার কেউ কেউ হাওর পাড়ে বসে আফসোস করছেন। এক ফসলি জেলা সুনামগঞ্জের কৃষকদের বাঁচার সব অবলম্বন হাওরকে ঘিরেই। হাওরে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে এমন ভয়াবহ দুর্ভোগ কখনো হয়েছে বলে জানা নেই বলে বলছেন জেলার কৃষকেরা।
জেলার ১১ উপজেলার কৃষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত প্রায় এক সপ্তাহে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে এ পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ ফসল পানির নিচে ডুবে গেছে। জেলার তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর ছাড়া অন্য ২২টি হাওরই ডুবে গেছে। ৭৫ শতাংশ ফসল পানির নিচে চলে গেছে। জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৯টি হাওরের সাতটিতেই থই-থই করছে পানি। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে টিকে থাকা কেজাউড়া ও ধুমপুর হাওর। জগন্নাথপুর উপজেলার বৃহৎ ফসলি নলুয়ার ও মইয়ার হাওরসহ ১৫টি হাওরের মধ্যে ১৩টি ডুবেছে। এ উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ ফসলি জমি পানির নিচে চলে গেছে। ধর্মপাশা উপজেলার ৮২টি হাওরের ৫৯টিই ডুবে গেছে। ছাতক উপজেলার ৬৩ হাওরের প্রায় সবগুলোই পানির নিচে। ১৪ হাজার হেক্টর ফসলি জমির ১১ হাজার হেক্টর ডুবে গেছে খবর পাওয়া গেছে। জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার ১৯টি হাওরের সব ক’টি ফসলি হাওর পানির নিচে চলে গেছে। শাল্লা উপজেলা ১০টি হাওরের মধ্যে বৃহৎ চারটি হাওর এরই মধ্যে ডুবেছে। কৃষকেরা বাকি হাওরগুলোর বাঁধ রায় স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন। কৃষকেরা ুব্ধ ছায়ার হাওর ও ভাণ্ডার হাওর রা বাঁধের ঠিকাদারদের ওপর। এই দু’টি হাওরের চারটি বাঁধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো কাজই করেনি।
জামালগঞ্জের পাঁচটি বড় হাওরের মধ্যে হালির হাওরসহ তিনটিই ডুবে গেছে। মঙ্গলবার দুপুরে সহস্রাাধিক কৃষক উপজেলা পরিষদ ঘেরাও করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে বলেছেন দাবি মানা না হলে কঠিন কর্মসূচি দেয়া হবে। জেলার দণি সুনামগঞ্জ উপজেলার সব হাওরেই পানি ঢুকেছে। কৃষকেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারেননি। সেখানকার বিুব্ধ কৃষকেরা দুই দিন সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে দুর্নীতিবাজ পাউবো কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা হাওর রা বাঁধের ঠিকাদারদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক জাহেদুল হক দুই লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর বোরো জমির মধ্যে প্রায় এক লাখ হেক্টর ফসল বন্যায় তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীদের। এতে টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। তবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের এই হিসাবকে মানতে নারাজ জেলার কৃষকেরা।
তাদের দাবি জেলার চার ভাগের তিন ভাগ বোরো ফসল এরই মধ্যে তলিয়ে গেছে। এবং যেটুকু রয়েছে, সেগুলোও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়ে গোলায় তোলা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, সুনামগঞ্জের কৃষকদের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন জেলায় ন্যায্যমূল্যের ৯১ হাজার কার্ডের স্থলে দুই লাখ কার্ড করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এপ্রিল পর্যন্ত ন্যায্যমূল্যের চাল দেয়ার কথা থাকলেও এটি আগস্ট পর্যন্ত দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, যেসব ঠিকাদার বাঁধের কাজ সময়মতো করেননি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপকে বলা হয়েছে।
এ দিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মঞ্জুরুল হান্নান বুধবার সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী আউশ ও আমন চাষাবাদে কৃষকদের সহায়তা দেয়া হবে। বোরো ফসলের ক্ষতিগ্রস্ত সহায়তা ও ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেয়ার জন্য তিনি কৃষিমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করবেন। এ ছাড়া তিনি সুনামগঞ্জের বোরো ফসলের সার্বিক অবস্থা ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে তুলে ধরবেন।’ সুনামগঞ্জ জেলার এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় বুধবার সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে উপজেলায় উপজেলায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করছে বিভিন্ন সংগঠন।
উল্লেখ্য, চলতি বছর সুনামগঞ্জে বোরো ফসলের আবাদ হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে। ৪২টি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে বরাদ্দ দেয়া হয় ৫৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের বৃহৎ ৩৭টি হাওরসহ মোট ৪২টি হাওরে ১০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২৫টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ও ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৬টি প্যাকেজে ঠিকাদার দিয়ে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেছে। পিআইসির কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ঠিকাদারের কাজ ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ বাঁধের কাজ সময়মতো শুরু হয়নি, শেষও হয়নি সময়মতো। এ নিয়ে ফসল হারানো কৃষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) থেকে গিয়াস উদ্দিন রানা জানান, অকালবন্যায় ধর্মপাশা উপজেলায় ছোট-বড় ৭৮টি হাওরের মধ্যে ৭৬টি তলিয়ে গেছে। এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৩১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করেছিলেন কৃষকেরা। ইতোমধ্যে ৭৫ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত নদনদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অবশিষ্ট দু’টি হাওর রয়েছে, যেগুলোর বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ বড় গুড়াডোবা ও জয়দনা হাওরের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকেরা তাদের গবাদিপশু পানির দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। অসাধু চাল ব্যবসায়ীদের হাত থেকে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ থেকে এম এ মজিদ জানান, হঠাৎ বন্যায় হবিগঞ্জে দুই উপজেলার প্রায় পুরোপুরি, চার উপজেলার আংশিক বোরো জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে তিগ্রস্ত বোরো জমির পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর বলা হলেও এর পরিমাণ অন্তত ৫০ হাজার হেক্টরের নিচে হবে না বলে স্থানীয় কৃষকদের ধারণা। বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার প্রায় পুরোপুরি বোরো জমি এখন পানির নিচে। নবীগঞ্জ, বাহুবল, লাখাই ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার তিন ভাগের এক ভাগ বোরো জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। গত রোববার থেকে হবিগঞ্জে প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝড়-তুফান শুরু হয়। থেমে থেমে তা অব্যাহত থাকে বুধবার পর্যন্ত। টানা বৃষ্টিপাতের ফলে চুনারুঘাট থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, ভাটি অঞ্চলে অবস্থিত কালনী, কুশিয়ারা ও রতœা নদী থেকে উঠে আসা পানি এবং খোয়াই নদীর ভাঙনের ফলে শুরুতেই বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, লাখাই, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার নি¤œাঞ্চলের বোরো জমি তলিয়ে যায়। শেষ দিকে এসে উজানেরও অনেক বোরো জমি তলিয়ে যায়। হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ডিডি মো: ফজলুর রহমান জানান, হবিগঞ্জ জেলায় এক লাখ ১৬ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ১৩ হাজার ৪৪৫ হেক্টর বোরো জমি তিগ্রস্ত হয়েছে। লাখাই উপজেলার গোয়াকাড়া গ্রামের ছাত্তার মিয়া নামের এক কৃষক জানান, তার ২৭ রে বোরো জমির মধ্যে ২৪ রে বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। ওইসব জমি থেকে এক কেজি ধান পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই। যে ৩ রে জমি উজানে ছিল, সেসব জমির ধান বের হওয়ার সাথে সাথে মরে ঝরে গেছে। ফলে ৩ রে জমি থেকেও ধান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। একই ভাবে গোয়াকাড় গ্রামের সব কৃষকই তির সম্মুখীন। প্রবল বৃষ্টিপাতের সাথে ছিল শিলাবৃষ্টি। আধাপাকা ধানও তাতে তিগ্রস্ত হয়েছে। তিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন শাকসবজির তে। সর্বোপরি আগামী দিনগুলো মারাত্মক অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে যাবে, এমনটিই মনে করছেন তিগ্রস্ত কৃষকেরা।
বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির স্রোতে ভেসে গেছে বানিয়াচং উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমির ধান। সরকারি হিসাবে টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় শত কোটি টাকার ওপরে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মোস্তফা ইকবাল আজাদ জানান, মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে। সব উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক কৃষকদের পাশে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) থেকে মো: মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কমলগঞ্জে গত দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ধলাই নদীর প্রতিরা বাঁধের পুরনো দু’টি ভাঙনের পাশাপাশি রাত সাড়ে ৮টায় নতুন করে আরো দু’টি স্থানে ভাঙনের ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে ২০টি গ্রামের ৩০ হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। কমলগঞ্জ- মৌলভীবাজার সড়ক দুই ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। কমলগঞ্জ সদর হাসপাতালে পানি প্রবেশ করেছে। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হক রাত ১০টায় বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
জানা যায়, কমলগঞ্জ পৌরসভার গোপালনগর এলাকার মনবাবুর বাড়ির সামনে একটি ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের কোনাগাঁও এলাকায় নদীভাঙনের ফলে পৌরসভার গোপালনগর, নাগড়া, করিমপুর, যোদ্ধাপুর এলাকা ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের কোনাগাঁও, ঠাকুরবাজার, মইডাইল, সোনাপুর, ঘোষপুর ও শংকরপুরসহ ২০টি গ্রামের ৩০ হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কমলগঞ্জ-মৌলভীবাজার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ধলাই নদীর প্রায় ১৫টি স্থান সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় আরো ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভানুগাছ বাজারের পাশে নতুন ব্রিজ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ফাটল থাকায় কমলগঞ্জ পৌর এলাকার ভানুগাছ বাজার হুমকিতে পড়েছে।
রাত ১০টায় নদীভাঙনের সত্যতা নিশ্চিত করে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মাহমুদুল হাসান বলেন, তিনি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে রয়েছেন। তাৎণিকভাবে দুর্গত লোকজনের মধ্যে চিঁড়া ও গুড় বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে বলেও তিনি জানান। এ দিকে কমলগঞ্জ পৌর এলাকার ভানুগাছ চৌমুহনা সংলগ্ন কুমড়াকাঁপন এলাকায় জলাবদ্ধতায় লোকচলাচল মারাত্মভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের ভৈরবে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কয়েক শ’ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর ফলে নষ্ট হচ্ছে ধান। উপায় না দেখে পানির নিচ থেকে আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। হঠাৎ করে পাহাড়ি ঢলে ভৈরবের আগানগর, শ্রীনগর, গজারিয়া ও সাদেকপুরসহ চারটি ইউনিয়নের শত শত জমির বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় পানির নিচ থেকে কোনো রকমে আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। টাকা-পয়সা খরচ করে ধান রোপণে ভালো ফসলের আশায় বুক বেঁধে ছিলেন কৃষকেরা। আর ১৫-২০ দিন পর পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু তাদের সব স্বপ্ন নিমিষেই ভেঙে দিলো পাহাড়ি ঢল। অনেকেই ধারদেনা করে জমি রোপণ করেছিলেন।
সাদেকপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার জানান, তার ইউনিয়নে এক হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকেরা ধারদেনা করে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন অনেক আশা নিয়ে। ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রায় ৮০০ কৃষক।
ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: জালাল উদ্দীন জানান, আগাম বন্যায় ভৈরবের চারটি ইউনিয়নের কয়েক শ’ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা আর্থিকভাবে তিগ্রস্ত হবেন। তবে সবচেয়ে বেশি তি হয়েছে আগানগর ইউনিয়নে। এখন কৃষকেরা পানির নিচ থেকে আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছেন। তবে তিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপরে কাছে পাঠাব। সরকারি সহায়তা পেলে তাদের দেয়া হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫