ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

মতামত

লাহোর প্রস্তাব সংশোধন ও দিল্লি কনভেনশন

শেখ মুজিবুর রহমান

১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:১০ | আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:২৪


প্রিন্ট

যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের পক্ষ থেকে মিস্টার চার্চিল ভারতে ক্রিপস মিশন পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। যুদ্ধের পরে যখন মিস্টার ক্লিমেন্ট এটলি লেবার পার্টির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি ১৯৪৬ সালের ১৫ মার্চ ক্যাবিনেট মিশন পাঠানোর কথা ঘোষণা করলেন; তাতে তিনজন মন্ত্রী থাকবেন, তারা ভারতবর্ষে এসে বিভিন্ন দলের সাথে পরামর্শ করে ভারতবর্ষকে যাতে তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা দেয়া যায় তার চেষ্টা করবেন। ভারতবর্ষে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধি নিয়ে যত তাড়াতাড়ি হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে- বড়লাটের সাথে পরামর্শ করে। এই ক্যাবিনেট মিশনের সদস্য ছিলেন লর্ড পেথিক লরেন্স, সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস, প্রেসিডেন্ট অব দ্য বোর্ড অব ট্রেড এবং মিস্টার এ ভি আলেকজান্ডার, ফার্স্ট লর্ড অব এডমাইরালটি। এরা ভারতবর্ষে এসে বড় লাটের সাথে এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে পরামর্শ করে একটা কর্মপন্থা অবলম্বন করবেন। মিস্টার এটলির বক্তৃতায় মুসলমানদের পাকিস্তান দাবির কথা উল্লেখ তো নাই-ই বরং সখ্যালঘুদের দাবিকে তিনি কটাক্ষ করেছিলেন। মিস্টার এটলি তার বক্তৃতার এক জায়গায় যা বলেছিলেন, তাই তুলে দিলাম : 'Mr. Atlee declares that minorites cannot be allowed to impede the progress of majorities.' মিস্টার এটলির বক্তৃতায় কংগ্রেস মহল সন্তোষ প্রকাশ করলেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই বক্তৃতার তীব্র সমালোচনা করলেন।
ক্যাবিনেট মিশন ২৩ মার্চ ভারতবর্ষে এসে পৌঁছাল। তারা ভারতবর্ষে এসে যেসব বিবৃতি দিলেন তাতে আমরা একটু বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম। আমরা দলবল বেঁধে শহীদ সাহেবের কাছে যেতাম, তাকে বিরক্ত করতাম, জিজ্ঞাসা করতাম, কী হবে? শহীদ সাহেব শান্তভাবে উত্তর দিতেন, ‘ভয়ের কোনো কারণ নেই, পাকিস্তান দাবি ওদের মানতেই হবে।’ আমরা দিনের বেলা তার দেখা পেতাম খুব অল্পই, তাই রাতে, ১১টার সময় নূরুদ্দিন ও আমি যেতাম। কথা শেষ করে আসতে আমাদের অনেক রাত হয়ে যেত।
আমরা প্রায়ই হাঁটতে হাঁটতে থিয়েটার রোড থেকে বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম। দু’এক দিন আমরা রিপন স্ট্রিটে মিল্লাত অফিসে এসে চেয়ারেই শুয়ে পড়তাম। ‘মিল্লাত’ কাগজের জন্য নতুন প্রেস হয়েছে, অফিস হয়েছে, হাশিম সাহেব সেখানেই থাকতেন। খন্দকার নূরুল আলম তখন মিল্লাত কাগজের ম্যানেজার হয়েছেন। তখন লীগ অফিসের চেয়ে আমাদের আলোচনা সভা মিল্লাত অফিসেই বেশি হতো। মুসলিম লীগ অফিসে এমএলএরা ও মফস্বলের কর্মীরা এসে থাকতেন। বরিশালের ফরমুজুল হক মুসলিম লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি অফিসেই তার ফ্যামিলি নিয়ে থাকতেন। শহীদ সাহেব তাকে মাসে মাসে বেতন দিতেন।
হঠাৎ খবর এলো, জিন্নাহ সাহেব ৭, ৮, ৯ এপ্রিল দিল্লিতে পুরো ভারতবর্ষের মুসলিম লীগপন্থী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের কনভেনশন ডেকেছেন। বিগত নির্বাচনে বাংলাদেশ ও মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশগুলোতে মুসলিম লীগ একচেটিয়াভাবে জয়লাভ করেছে। তবে অধিকাংশ মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারেনি। তাই শুধু বাংলাদেশে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার গঠন হয়েছে। পাঞ্জাবে খিজির হায়াত খান তেওয়ানার নেতৃত্বে ইউনিয়নিস্ট সরকার, সীমান্তে ডা. খান সাহেবের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার, সিন্ধুতে আল্লাহ বক্সের নেতৃত্বে মুসলিম লীগবিরোধী সরকার গঠিত হয়েছে। চারটা মুসলমান সংখ্যাগুরু প্রদেশের মধ্যে মাত্র বাংলাদেশেই এককভাবে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করেছে। অন্যান্য প্রদেশে মুসলিম লীগবিরোধী দল হিসেবে আসন গ্রহণ করেছে। পুরো ভারতবর্ষে তখন ১১টি প্রদেশ ছিল।
শহীদ সাহেব স্পেশাল ট্রেনের বন্দোবস্ত করতে হুকুম দিলেন। বাংলা ও আসামের মুসলিম লীগ এমএলএ ও কর্মীরা এই ট্রেনে দিল্লি যাবেন। ট্রেনের নাম দেয়া হল ‘পূর্ব পাকিস্তান স্পেশাল’। হাওড়া থেকে ছাড়বে। আমরাও বাংলাদেশ থেকে দশ-পনেরজন ছাত্রকর্মী কনভেনশনে যোগদান করব। এ ব্যাপারে শহীদ সাহেবের অনুমতি পেলাম। পুরো ট্রেন সাজিয়ে ফেলা হলো মুসলিম লীগ পতাকা ও ফুল দিয়ে। দুইটা ইন্টারক্লাস বগি আমাদের জন্য ঠিক করে ফেললাম। ছাত্ররা দুষ্টমি করে বগির সামনে লিখে দিলো, ‘শেখ মুজিবুর ও পার্টির জন্য রিজার্ভড’। এ লেখার উদ্দেশ্য হলো, আর কেউ এই ট্রেনে যেন না ওঠে। আর আমার কথা শুনলে শহীদ সাহেব কিছুই বলবেন না, এই ছিল ছাত্রদের ধারণা। যদিও ছাত্রদের নেতা ছিল নূরুদ্দিন। তাকেই আমরা মানতাম।
শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেবের কামরায় দুইটা মাইক্রোফোন লাগিয়ে দেয়া হলো। হাওড়া থেকে দিল্লি পর্যন্ত প্রায় সব স্টেশনেই শহীদ সাহেব ও তার দলবলকে সম্বর্ধনা জানাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশে মুসলিম লীগের জয়ে পুরো ভারতবর্ষের মুসলমানদের মধ্যে একটা বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। জহিরুদ্দিন হাশিম সাহেবের কামরার কাছেই থাকার বন্দোবস্ত হয়েছিল। কারণ, তাকে পুরো পথে উর্দুতে বক্তৃতা করতে হবে। সেই একমাত্র বক্তা যে উর্দু, বাংলা ও ইংরেজিতে সমানে বক্তৃতা করতে পারত। কলকাতার কোনো মহল্লায় সভা হলে জহির উর্দু ও আমি বাংলায় বক্তৃতা করতাম। নূরুদ্দিন, জহিরুদ্দিন, নূরুল আলম, শরফুদ্দিন, কিউ জে আজমিরী, আনোয়ার হোসেন (এখন ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বড় কর্মকর্তা), শামসুল হক সাহেব, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও অনেক লীগ কর্মীর মধ্যে মুর্শিদাবাদের কাজী আবু নাছের, আমার মামা শেখ জাফর সাদেকসহ আরো অনেকে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েছিলেন, দিল্লি যাওয়ার অনুমতিও পেয়েছিলেন। এ ছাড়া যেসব ছাত্র আমাদের হাওড়া স্টেশনে বিদায় দিতে এসেছিল, তারাও স্পেশাল ট্রেনে ভাড়া লাগবে না শুনে এক কাপড়েই ট্রেনে চেপে বসল। প্রায় আট-দশজন হবে, তাদের ‘না’ বলার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। তারা ভালো কর্মী। ‘নারায়ে তকবির’, ‘মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জিন্দাবাদ’, ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ’ ধ্বনির মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিলো।
পুরো ট্রেনে মাইক্রোফোনের হর্ন লাগানো ছিল। জহির, আজমিরী ও আমি বেশি স্লোগান দিতাম মাইক্রোফোন থেকে। প্রত্যেক স্টেশনে আমাদের গাড়ি থামাতে হতো- যদিও সব জায়গায় গাড়ি দাঁড় করানোর কথা ছিল না। হাজার হাজার লোক শহীদ সাহেবকে ও বাংলার মুসলিম লীগকে সম্বর্ধনা দেয়ার জন্য হাজির হয়েছিল। সকালে যখন পাটনায় পৌঁছলাম তখন দেখি পুরো পাটনা স্টেশন লোকে লোকারণ্য। তারা ‘বাংলা কা মুসলমান জিন্দাবাদ’, ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’- এ রকম নানা স্লোগান দিতে থাকে। আমাদের প্রত্যেকের খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছে বিহার মুসলিম লীগ এবং প্রত্যেককে একটি করে ফুলের মালা উপহার দিয়েছে। আমাদের ট্রেন যে, সময়মতো দিল্লিতে পৌঁছাতে পারবে না এটা আমরা বুঝতে পারলাম। অনেক দেরি হবে। আমরাও যেখানেই কিছু লোক স্লোগান দেয়, সেখানেই ট্রেন থামিয়ে দেই। এজন্য শহীদ সাহেব রাগ করলে আমি বললাম, কয়েক ঘণ্টা ধরে লোকগুলো দাঁড়িয়ে আছে। আপনাকে দেখার জন্য কত দূর দূর থেকে এরা এসেছে! আর আমরা এক মিনিটের জন্য ট্রেন না থামালে কত বড় অন্যায় হবে। যা হোক, এমনি করে সারা রাত জনসাধারণ ছোট ছোট স্টেশনেও জমা হয়ে আছে। আমাদের ট্রেন দেখলেই তারা বুঝতে পারত। এলাহাবাদ স্টেশনে আমদের পুরো ট্রেন নতুন করে ফুল দিয়ে তারা সাজিয়ে দিয়েছিল। পথে পথে বিহার ও ইউপি থেকে অনেক ছাত্র আমাদের ট্রেনে উঠে পড়েছিল। তাদের অনেকের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, পাকিস্তান হওয়ার পরেও আমাদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল। এদের অনেকে পাকিস্তানে চলে এসেছে।
দিল্লি যখন পৌঁছালাম তখন দেখা গেল, যেখানে সকালে আমরা পৌঁছাব সেখানে বিকালে পৌঁছালাম। আট ঘণ্টা দেরি হয়েছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কনভেনশন বন্ধ করে রেখেছেন আমাদের জন্য। সকাল ৯টায় শুরু হওয়ার কথা ছিল, আমাদের ট্রেন থেকে সোজা সভাস্থলে নিয়ে যাওয়া হলো। দিল্লির লীগ কর্মীরা আমাদের মালপত্রের ভার নিলেন। আমরা বাংলায় স্লোগান দিতে দিতে সভায় উপস্থিত হলাম। সব সদস্য জায়গা থেকে উঠে সম্বর্ধনা জানাল। জিন্নাহ সাহেব যেখানে বসেছেন, তার কাছেই আমাদের স্থান। যখন উর্দু স্লোগান উঠত, আমরাও তখন বাংলা স্লোগান শুরু করতাম।
জিন্নাহ সাহেব বক্তৃতা করলেন, পুরো সভা নীরবে ও শান্তভাবে তার বক্তৃতা শুনল। মনে হচ্ছিল সবার মনেই একই কথা, পাকিস্তান কায়েম করতে হবে। তার বক্তৃতার পরে সাবজেক্ট কমিটি গঠন হলো। আট তারিখে সাবজেক্ট কমিটির সভা হলো। প্রস্তাব লেখা হলো, সেই প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাব থেকে আপাতদৃষ্টিতে ছোট কিন্তু মৌলিক একটা রদবদল করা হলো। একমাত্র হাশিম সাহেব আর সামান্য কয়েকজন যেখানে পূর্বে ‘স্টেটস’ লেখা ছিল, সেখানে ‘স্টেট’ লেখা হয় তার প্রতিবাদ করলেন; তবুও তা পাস হয়ে গেল। ১৯৪০ সালে লাহোরে যে প্রস্তাব কাউন্সিল পাস করে, সে প্রস্তাব আইনসভার সদস্যদের কনভেনশনে পরিবর্তন করতে পারে কিনা এবং সেটা করার অধিকার আছে কিনা এটা চিন্তাবিদরা ভেবে দেখবেন। কাউন্সিলই মুসলিম লীগের সুপ্রিম ক্ষমতার মালিক। পরে আমাদের বলা হলো, এটা কনভেনশনের প্রস্তাব, লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তন করা হয়নি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ওই প্রস্তাব পেশ করতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অনুরোধ করলেন, কারণ তিনিই বাংলার এবং তখন একমাত্র মুসলিম লীগ প্রধানমন্ত্রী।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫