ঢাকা, শুক্রবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

প্রথম পাতা

সরকার পাবে সাড়ে তিন হাজার কোটি : জনগণের ঘাড়ে শত গুণ

গ্যাসের দাম বৃদ্ধি

আশরাফুল ইসলাম

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,সোমবার, ০০:০০ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,সোমবার, ০১:০২


প্রিন্ট

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে গ্যাস কোম্পানিগুলোর তহবিলে সাধারণ গ্রাহকের পকেট থেকে অতিরিক্ত যাবে ৪ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। আর এই অর্থের ৮১ ভাগ যাবে বিভিন্ন কর ও শুল্ক বাবদ সরকারি তহবিলে। এই হিসাবে সরকার গ্রাহকের কাছ থেকে নেবে তিন হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। আর এই অর্থ নিতে সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত ব্যয় বেড়ে যাবে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে ব্যয়ের বোঝা পড়বে প্রায় শত গুণ, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৬ লাখ ১৫ হাজার কোটি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ গতকাল নয়া দিগন্তকে এ বিষয়ে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। বিদ্যমান দামেই প্রতি বছর বিপিসির কাছে যায় চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এর ওপর নতুন করে দাম বাড়ানোয় কোম্পানিগুলোর মুনাফা আরো বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রায় ২৩ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়ানোয় সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়বে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ। কারণ, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে গ্যাসনির্ভর শিল্পের উৎপাদনব্যয় বেড়ে যাবে। আর উৎপাদনকারীরা বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে পরিবহন ভাড়ার ক্ষেত্রে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো রুটে পরিবহনব্যয় বাড়াতে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন বাস-ট্রাক মালিকরা। তিনি বলেন, ৩০ শতাংশ বর্ধিত ব্যয় সমন্বয় করতে হয় সাধারণ গ্রাহক তাদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দেবে, অথবা ব্যয় ঠিক রাখতে তাদেরকে ঋণ নিতে হবে। এতে জনগণের দুর্ভোগের অন্ত থাকবে না।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ৬০ ভাগ মানুষের মাসে গড় আয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, ১০ ভাগ মানুষের গড় আয় ১২ হাজার টাকা এবং ২০ ভাগ মানুষের গড় আয় ৩০ হাজার টাকা। এ অর্থের পুরোটাই তারা ব্যয় করে থাকেন। কোনো সঞ্চয় করতে পারেন না। ১৫ কোটি মানুষের ৬০ ভাগ হলো ৯ কোটি। আর ৯ কোটি মানুষের মাসে ৭ হাজার টাকা আয় হলে প্রতি মাসে তাদের মোট গড় ব্যয় ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এর ৩০ শতাংশ ব্যয় বাড়লে মাসে তাদের ব্যয় বাড়বে ১৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। তেমনিভাবে ১৫ কোটি মানুষের ১০ ভাগ হলো দেড় কোটি। আর দেড় কোটি মানুষের ১২ হাজার টাকা গড় ব্যয় হলে মাসে ব্যয় হয় ১৮ হাজার কোটি টাকা। আর ১৮ হাজার কোটি টাকার ৩০ ভাগ ব্যয় বাড়লে মোট গড় ব্যয় বাড়বে ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তেমনিভাবে ২০ ভাগ মানুষের ৩০ হাজার টাকার মাসিক গড় ব্যয়ের ৩০ শতাংশ বাড়তি ধরলে মাসে অতিরিক্ত ব্যয় হয় ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ হিসাবে শুধু ৯০ ভাগ মানুষের মাসে গড় ব্যয় বাড়বে ৫১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আর বছরে গড় ব্যয় বাড়বে ৬ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ভোক্তাপর্যায়ে দেড় বছরের ব্যবধানে সব ধরনের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। দুই দফায় এই গ্যাসের দাম কার্যকর হবে। প্রথম দফায় আগামী ১ মার্চ থেকে আর দ্বিতীয় দফায় ১ জুন থেকে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর কাওরানবাজারে বিইআরসি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্যাসের দাম বাড়ানোর এই ঘোষণা দেয়া হয়। এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। এ হিসাবে ছয় বছরের ব্যবধানে ওই দুই দফা মিলে গ্যাসের দাম বেড়েছিল ১৭ শতাংশের কিছু বেশি। এবার পরপর দুই মাসে দুই দফায় তার চেয়েও বেশি বাড়ানো হয়েছে।
এ দিকে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। এটি কার্যকর না হতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। ২৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার দুপুরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে আমরা বিদ্যুতের দামও সমন্বয় করতে চাই।
ব্যবসায়ীরা জানিযেছেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারিয়ে যাবে। রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বর্তমানে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যায় না, ঠিকই বিল দিতে হচ্ছে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্য দিকে নতুন মার্কিন প্রশাসন এবং ব্রেক্সিটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের দাম ১৯ শতাংশ কমেছে, ইউরোর দাম কমেছে ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এ অবস্থায় ইউরোপের ক্রেতারা তৈরী পোশাকের দাম ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমানোর চাপ দিচ্ছে। নতুবা অন্য বাজার থেকে পণ্য কেনার হুমকি দিচ্ছে। সব মিলিয়ে উভয় সঙ্কটে রয়েছে রফতানিকারকেরা। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে রফতানিমুখী শিল্পের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫