ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২০ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের কেন সাবমেরিন প্রয়োজন

গৌতম দাস

০৪ ডিসেম্বর ২০১৬,রবিবার, ১৮:১৪ | আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬,রবিবার, ২১:১২


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

বাংলাদেশ সর্বপ্রথম একটি সাবমেরিন কিনে নিজের প্রতিরক্ষা নৌবহরকে কিছুটা ওপরের স্তরে উন্নীত করেছে। এটা চীননির্মিত। বাংলাদেশ ছোট অর্থনীতি মানে, স্বল্প রাজস্ব আহরণের রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্র যে বিপদে থাকে, তা হলো নিজের ন্যূনতম প্রাকৃতিক সম্পদ ও সীমানা সংরক্ষণ করতে স্থায়ী সেনাবাহিনীর চাহিদা পূরণে সব সময় টানাটানির মধ্যে থাকে। যদিও ব্যারাক-ভিত্তিক বাহিনীই নিরাপত্তার একমাত্র উপায় নয়, জনগণ ও সেনাবাহিনীর দূরত্ব ঘুচানোর ভালো উপায় কী অথবা প্রতিরক্ষায় খরচ কতটা করা উচিত, তা কী কাজে লাগে ইত্যাদি নিয়ে প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক আছে। তা পাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়- সমুদ্রসীমানা রক্ষার জন্য উপযুক্ত সরঞ্জামনির্ভর একটা বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সবাই স্বীকার করবেন। ব্যাপারটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোয়, যাদের তা দেখে বোঝার কথা, তারা বুঝে গিয়েছিলেন- বিগতকালে বার্মা বা মিয়ানমারের সাথে আমাদের স্থলসীমান্তে টেনশন এবং সমুদ্রসীমানায় আমাদের অংশে ২০০৮ সালে মিয়ানমারের তেল অনুসন্ধানের কার্যকলাপে বাংলাদেশে বাধা দেয়ার সময়। ফলে অন্তত মিয়ানমারের সাথে পেরে ওঠার পর্যায়ে আমাদের বাহিনীগুলোকে উন্নীত করা একটা তাগিদ তখন থেকে ছিল। ইতোমধ্যে সমুদ্রসীমানা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধ জাতিসঙ্ঘে নিষ্পত্তি হওয়ায় বলা হচ্ছে, এতে স্থলভাগের চেয়েও দ্বিগুণ বড় সমুদ্র-অঞ্চল এখন আমাদের ভাগে এসেছে। এগুলো বুঝেশুনে নেয়ার ও অন্তত ধরে রাখার কাজ সম্ভব করতে গেলে উন্নত নতুন স্তরে সশস্ত্রবাহিনীগুলোকে সাজানো খুবই প্রয়োজন। আরেক তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বঙ্গোপসাগর নিয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের কাড়াকাড়ি টেনশন দিন দিন বাড়ছে। অনুমান করা যায়, সামনে আরো বাড়বে। এতে কারো দিকে ঝুঁকে পড়া, কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে হলেও আর শুধু নিজের সীমানা রক্ষা করতে গেলেও ন্যূনতম সামরিক সক্ষমতা থাকা জরুরি। অনুমান করা যায়, এসব প্রয়োজন পূরণের পরিকল্পনার অংশ হলো সাবমেরিন কেনা।
কিন্তু ভারত-চীনের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের মিডিয়া সব সময় আধা সত্য-মিথ্যা মেশানো তথ্য আর উগ্র দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি দিয়ে ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে খামাখা উত্তেজিত করে রাখে। কারণ এগুলোই তাদের ভোটের বাজারকে প্রভাবিত করার দিক থেকে খুবই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ উপাদান। অনেক সময়, এই ভোট-বাজারে দেখিয়ে বেড়ানোর নির্বাচনী স্বার্থে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বহু সফরও ঘটানো হয়। আমাদের সাবমেরিন ডেলিভারি পাওয়ার পর এর সাথে সম্পর্কিত ঘটনা নাকি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের এবার বাংলাদেশ সফর। বলা হচ্ছে, এমন সফর নাকি স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম। অনলাইন বাংলাট্রিবিউনে গত ১৬ নভেম্বর ভারতের সাংবাদিক রঞ্জন বসুর এ নিয়ে একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। টিপিক্যাল আনন্দবাজারি প্রপাগান্ডা স্টাইলের এক রিপোর্ট এটা। পড়লে মনে হবে যেন, যা মনে চায় মিথ্যা বাড়ানো-চড়ানো কথা বলে হাটে গামছা বেচতে এসেছেন। এর একটা নমুনা দেখুন, প্রথম বাক্য হলো ‘চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের নৌবাহিনী দুইটি সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর এ মাসের শেষে বাংলাদেশ সফরে যাবেন।’ মনে হচ্ছে, পারিকর আমাদের বাহিনীগুলোকে বকা দিতে আসছেন। আর যেন বকা দিয়ে বলবেনÑ ‘কী, তোমরা আমাদের না জানিয়ে সাবমেরিন কিনে ফেললে কেন?’ সেজন্য সাবমেরিন হাতে পাওয়ার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পারিকর এ দেশে এসেছেন। আচ্ছা, এটা কি শিশুদের বাজারে চুপে চুপে গিয়ে চকোলেট কেনা? তাই বড় ভাইয়ের বকা দিয়ে আসা? রঞ্জন বসু সাবমেরিনকে শিশুর চকোলেট কেনা ভেবেছেন! এটা সাবমেরিন- তাই কিনতে চাইলে অনেক আগে অর্ডার দিতে হয়। সে মোতাবেক ২০১৩ সালে এর অর্ডার দেয়া হয়েছিল। ফলে তখন থেকে দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে এটা। তাই এ সাবমেরিন কেনা নিয়ে বাংলাদেশকে যদি জেনুইন কনসার্নে কিছু বলতেও হয়, তা তিন বছর আগে থেকেই ছিল। সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছু নেই এখানে। তাহলে, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে’ বলে রঞ্জন বসু কী বোঝাতে চাইলেন? যেন বোঝাতে চাইলেন, ভারতের হুকুম ছাড়া বাংলাদেশের গাছের পাতারও নড়ার কথা নয়। সেই পাতা নড়ল কেন, এর জবাব চাইতে পারিকর এসেছিলেন।
রঞ্জন বসুর বোঝাবুঝির দৌড় হাস্যকর বললেও কম হবে। এ যেন রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আদার ব্যাপারীর আলাপের চেয়েও নিচু মানের। তিনি লিখছেন- ‘কিন্তু এ সপ্তাহের গোড়ায় চীন যেভাবে তাদের লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ান সমুদ্রবন্দরে সফররত বাংলাদেশের নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন আহমেদের হাতে দু’টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন তুলে দিয়েছে, তাতে ভারত মনে করছে পারিকরের সফর নিয়ে আর এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই।’ এখানে চীন ‘যেভাবে... সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’- এই ‘যেভাবে’ কথার মানে কী? তাহলে, চীন সাবমেরিন বিক্রি করায় ভারতের অসুবিধা হয়নি; শুধু ‘যেভাবে... সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’ তাতেই আপত্তি? ব্যাপারটা কি এ রকম? কিভাবে সাবমেরিন তুলে দিতে হতো? এ ছাড়া পারিকরের আর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই’- এ কথাটিরও মানে কী? চীন সাবমেরিন বিক্রি করে ভারতের নাকি ক্ষতি করে ফেলেছে, তাহলে পারিকর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ’ না রেখে বাংলাদেশে এলে কী হবে? বাংলাদেশ বকা খাবে? সাবমেরিন ফেরত দিয়ে দিতে ধমক দেবে? লেনদেন বিষয়ে একজন মুদি দোকানদারও যতটা বাস্তবজ্ঞান রাখেন, দেখা যাচ্ছে রঞ্জন বসু সেটাও রাখেন না।
সবাই জানে, এমনকি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীরাও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বলে থাকেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে আজও ভারতের সমর্থন তাদের সরকারের ওপর আছে; সরকার টিকে আছে ইত্যাদি। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সমর্থন লেনদেন এক জিনিস, আর তাকে বাংলাদেশের সামরিক ক্রয় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বোঝানো, আরেক জিনিস। বলতে গেলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি বা বড় ধরনের সামরিক কেনাকাটা- এসব বিষয়ের পরিকল্পনা করা বা প্রস্তাব তোলা, এটা এখনো সিভিলিয়ান বা রাজনীতিকেরা করার, অভ্যাস বা চর্চা বাংলাদেশে শুরু হয়নি। কাজেই ভারতের ইচ্ছামতো যদি আমাদের সামরিক ক্রয় সম্পন্ন হতে হয়, এর ফলাফল হবে জটিল ও মারাত্মক। বুদ্ধিমান মানুষ এ কথা মনে রেখে মুখ খুলবেন।
আরেক কঠিন সত্য হলো, সাবমেরিন আমাদের (ভারতের কথিত জানি দুশমন) চীন থেকেই কিনতে হবে, ব্যাপারটা মোটেও সে রকম ছিল না। রাশিয়াও এর সাপ্লায়ার হতে পারত। কিন্তু রাশিয়ান কিলো সাবমেরিনের মূল্য এক বিলিয়ন ডলার চাওয়াতে এবং তার বিপরীতে চীনা অফার ৪৫০ মিলিয়ন হওয়াতে এটাই কেনা হয়।
ভারতের সবাই রঞ্জন বসু নন। বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধির লোক ভারতে কম থাকার কথা নয়। তেমনই একজন এম কে ভদ্রকুমার। গত প্রায় ৩০ বছরের কেরিয়ার কূটনীতিক ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। এখন বিভিন্ন দেশী-বিদেশী পত্রিকায় কলাম লেখেন। তিনি অনলাইন ‘স্ক্রোল’ পত্রিকায় এ নিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছেন। বলা ভালো তিনি শয়তানিতে ভরপুর ডিপ্লোম্যাটদের যেন চাবকিয়েছেন। কথিত পণ্ডিতদের চিন্তাভাবনার দুরবস্থাকে তিনি তুলোধুনা করেছেন। প্রথমত, তিনি পারিকরের সফরকে ‘বিস্ময়কর’ বলছেন। এরপর বলছেন, ১. ভারত-বাংলাদেশের মিলিটারি টু মিলিটারি সম্পর্ক অবশ্যই ভালো হতে হবে। কারণ বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারতের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল- এটা অবশ্যম্ভাবী নয়। মুখ্যত এর দু’টি কারণ। প্রথমত, আমাদের (মানে ভারতীয়দের) এক আজব ধারণা হলো, পাকিস্তান আর্মির সাথে বাংলাদেশের আর্মি নাকি এক নাড়ির সম্পর্কের সুতায় বাঁধা আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আর্মিও তাদের দেশের প্রতি ভারতের ইচ্ছা-মনোভাব সম্পর্কে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ভারতের কালোছায়া ধরনের সন্দেহ পোষণ করে। এ ধরনের মানসিক বাধা বা দূরত্ব কাটাতে সময় লাগে। পারিকরের সফরের মানে কি, সে ধরনের কালো মেঘ কেটে গেছে?
আসলে ভদ্রকুমার নিজ দেশের অনেকের মুখের ওপর অনেক কথাই খাড়াভাবে বলেছেন। এরপরও যে কথাগুলো কোনো কারণে তিনি বলেননি তা হলো- রাষ্ট্রতত্ত্ব বলে, রাষ্ট্র মানে ও নিজ জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে সবার ওপরে মনে করার। নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ অন্য সব রাষ্ট্রস্বার্থের চেয়ে প্রাধান্য পাবে মনে করে। তাহলে দুই দেশের মিলিটারি টু মিলিটারি ভালো সম্পর্ক মানে কী? এটা অ্যাবসার্ড, আকাশকুসুম। বড়জোর দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থের ঘটনাচক্রে, তাও সাময়িক কিছু বিষয়ে মিল হতে পারে। আর যদি তা না ভালো লাগে তাহলে আরেকটা পথ হলো, দুই রাষ্ট্র এক হয়ে যাওয়া- একমাত্র তখন দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থ বলে আর কিছু থাকবে না। অতএব, দুই সেনাবাহিনী এ শর্ত-সীমার মধ্যে যতটুকু সম্ভব ভালো সম্পর্কের অধিকারী হতে পারে।
২. ভদ্রকুমার তুরস্কে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি নিজ দেশের সহকর্মীদের সমালোচনা করেছেন। ভদ্রকুমার বলছেন, ‘ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, চীনের সাবমেরিন বিক্রি এক অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ। তাই পারিকর তিন বাহিনীর উপপ্রধানদের নিয়ে চীনবিরোধী সফরে বেরিয়ে পড়েছেন। অন্ততপক্ষে ভারতীয় বিশ্লেষকের বরাতে বাংলাদেশের মিডিয়া তাই বলছে। এটা খুব দুর্ভাগ্যের যে, আমরাই আমাদের পড়শিদেরকে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে খাড়া করার বুদ্ধি দিচ্ছি। ভারতীয় বিশ্লেষকদের সিদ্ধান্ত হলো- চীন ভারতকে ঘিরে ধরতেই সাবমেরিন বিক্রি করেছে। এগুলো এক আজব ব্যাখ্যা।’ এই বলে তিনি এবার অনেকগুলো কারণ তুলে ধরে বিশ্লেষকদের ধারণা নাকচ করেছেন। ক. সাবমেরিন কেনা কোনো দান-ধ্যান নয়, এটা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত এবং তারা টাকা দিয়ে কিনছেন। তাহলে এটা চীনের কাজ আর অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ হলো কী করে? খ. বাংলাদেশের কাছে সম্ভাব্য বিক্রেতা ছিল রাশিয়া ও চীন। বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে চীনকে প্রধানত অর্ধেক দামে দিচ্ছে বলে। তাহলে?
আমাদের বরং বাংলাদেশ কিসের তাগিদে সাবমেরিন কিনল, সেটা খুঁজে দেখা দরকার।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫