ঢাকা, বুধবার,২১ আগস্ট ২০১৯

নগর মহানগর

মারাকাশ জলবায়ু সম্মেলনের ফলাফলে হতাশ ও উদ্বিগ্ন পরিবেশবাদীরা

আশরাফ আলী মারাকাশ থেকে ফিরে

২৮ নভেম্বর ২০১৬,সোমবার, ২৩:৪৬


প্রিন্ট

মরক্কোর মারাকাশে কপ-২২ জলবায়ু সম্মেলনের মারাকাশ ঘোষণা নিয়ে হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীরা। একই সাথে জলবায়ু অর্থায়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তারা। কারণ দুই সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে আলোচনার পর অর্থায়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়নি উন্নত দেশগুলো। মারাকাশে উন্নত দেশগুলো তাদের দায়িত্ব কৌশলে এড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ সার্বিক বিবেচনায় এবারের জলবায়ু সম্মেলন থেকে কিছুই পায়নি স্বল্পোন্নত ও অতিবিপদাপন্ন দেশগুলো। এর ফলে বাংলাদেশকেও অনেকটাই খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে। অবশ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের সাফল্যের ঝুড়িতে শুধু যোগ হয়েছে পানি এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জোরালো দাবি। যা বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সম হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পানি ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের কথা ঠাঁই পেয়েছে নতুন ঘোষণায়ও।
যদিও মারাকাশ ঘোষণায় নির্মল প্রযুক্তির সহায়তায় বিলিয়ন ও মিলিয়ন ডলারের বহুমুখী প্যাকেজ এবং দতা বৃদ্ধিতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। প্যারিস চুক্তির আলোকে বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমকে বিশ্বব্যাপী দ্রুত এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকারও করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারগুলো ২০১৮ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের রুল বুক প্রণয়নের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, যা আগামী দশকগুলোতে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় আস্থা, সহযোগিতা ও সাফল্য নিশ্চিত করবে।
মারাকাশ ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে বিশ্বের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, বিনিয়োগকারী এবং নগর ও স্থানীয় সরকারগুলো একযোগে কাজ করার নতুন অঙ্গীকার করেছে। ১৬৫ দেশের সাব-ন্যাশনাল সরকারি কাব ‘আন্ডার টু কোয়ালিশন’ প্রতিশ্র“তি দিয়েছে ২০২০ সাল নাগাদ তাদের কার্বন নির্গমন ৮০ শতাংশ হ্রাস করবে।
জলবায়ু অর্থ বিষয়ে মারাকাশ সম্মেলনে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা না এলেও কিছু দেশ অ্যাডাপটেশন ফান্ড ও গ্রিন কাইমেট ফান্ডে অর্থ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। সম্মেলন চলাকালে অ্যাডাপটেশন ফান্ডে ৮১ মিলিয়ন ডলার ও কাইমেট টেকনোলজি ফান্ডে ২৩ মিলিয়ন ডলারের ঘোষণা এসেছে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত গ্রিন কাইমেট ফান্ড থেকে ২৫০ কোটি ডলারের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে সম্মেলনে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মারাকাশ ভিশন নামে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরো একটি সংগঠন অঙ্গীকার করেছে। ’২০ ও ’৫০ সালের মধ্যে তারা কার্বন নির্গমন কমাতে শতভাগ নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ল্য অর্জন করবে। এ ছাড়া কানাডা, জার্মানি, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, তাদের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু কৌশল ২০৫০ বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন হ্রাসে প্যারিস চুক্তির ল্য অর্জন করবে। শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে জন্ম নেবে স্বল্প কার্বন নির্গমনের এক নতুন পৃথিবী।
প্রসঙ্গত, মারাকাশ জলবায়ু সম্মেলনে ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২০১৭ সালের জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজি। তবে এত বড় সম্মেলন আয়োজনের অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় জার্মানির সহায়তায় বন শহরে কপ২৩ অনুষ্ঠিত হবে।
এ দিকে মারাকাশ ঘোষণায় দারুণভাবে হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের অধিকারভিত্তিক নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। মারাকাশে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ফলাফলে স্বল্পোন্নত ও অতিবিপদাপন্ন দেশগুলোর দাবি পূরণ না হওয়া এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা প্রণীত না হওয়ায় তারা এ হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, দুই সপ্তাহব্যাপী আলোচনার পর অর্থায়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়নি উন্নত দেশগুলো। কাইমেট জাস্টিস গ্র“প বলছে, জলবায়ু অর্থায়নে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সরকারি অর্থায়নের বিকল্প হতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এবং অভিযোজন কার্যক্রমে সরকারি অর্থায়ন জরুরি।
ইকুইটিবিডির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকারি প্রতিনিধি দলের সরকারি কর্মকর্তারা মেধাবী এবং তারা তৎপরও বটে। কিন্তু তাদের ওপর বর্তমান মন্ত্রীর সময়ে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাহীনতা বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলেছে, যা প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানেরও পরিপূর্ণতা করে না। যে কারণে প্যারিস চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কিছুটা হলেও ুণœ হয়েছে। যেমন আর্টিকেল ৮ ও জলবায়ু বাস্তুচ্যুতির বিষয়টি আনা যায়নি। পরিবেশ ও বন সুরা এবং জলবায়ু আলোচনা, জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন আলাদা বিষয়। এ েেত্র আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনা এবং জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সংক্রান্ত পরিকল্পনা ও অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা উচিত।
মজিবুল হক মনির বলেন, বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত ও অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর সুশীলসমাজ মারাকাশ সম্মেলনের ফলাফলে দারুণভাবে হতাশ। এই সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তিগ্রস্ত, বিপন্ন ও গরিব দেশগুলোর প্রতি ধনী দেশগুলোর অবহেলা এবং দায় এড়িয়ে চলার প্রবণতা ছিল প্রকট। প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার ব্যাপারে ধনী দেশগুলো কোনো রোডম্যাপ দেয়নি য়তি পূরণের জন্য কোনো অর্থবরাদ্দ হয়নি। কেবল অভিযোজন তহবিলের জন্য ৮১ মিলিয়ন ডলার দেয়ার একটি প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে। ধনী দেশগুলোর এই ধরনের অবস্থান জলবায়ু বিপদাপন্ন দেশগুলোতে জলবায়ু গণহত্যার সৃষ্টি করবে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
অধিকারভিত্তিক নাগরিক সমাজ
এ দিকে গতকাল জাতীয় প্রেস কাবে অনুষ্ঠিত ‘সদ্য সমাপ্ত কপ-২২ মারাকাশ জলবায়ু সম্মেলন : নাগরিক সমাজের পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলন দেশের অধিকারভিত্তিক নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ তাদের অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার েেত্র বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের ভূমিকা আরো সক্রিয় ও যথাযথ হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতীয় কার্যক্রম তদারকি এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা সমন্বয় করার দায়িত্ব বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে না দিয়ে এর জন্য স্বাধীন একটি জলবায়ু কমিশন গঠন করা উচিত।
এ সংবাদ সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, বাংলাদেশ কাইমেট জার্নালিস্ট ফোরাম, বাংলাদেশ ইনডিজিনাস পিপলস অন কাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড বায়োডাইভার্সিটি, কাইমেট চেঞ্জ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম, কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ, ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল রুরাল লাইভলিহুড, ইকুইটিবিডি ও ফোরাম অন এনভায়রনমেন্ট জার্নালিস্ট ইন বাংলাদেশ।
ইকুইটিবিডির রেজাউল করিম চৌধুরীর সঞ্চালনায় এ সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কোস্ট ট্রাস্টের মোস্তফা কামাল আকন্দ। জাতীয় প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক এবং ফোরাম অন এনভায়রনমেন্ট জার্নালিস্ট ইন বাংলাদেশের সভাপতি কামরুল ইসলাম চৌধুরী, ইকুইটিবিডির সৈয়দ আমিনুল হক, ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল রুরাল লাইভলিহুডের সমন্বয়কারী প্রদীপ কুমার রায় এবং ইকুইটিবিডির মো: মজিবুল হক মনির।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫