ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ নভেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্সে’ ইসলামবিদ্বেষ

গৌতম দাস

১৮ জুলাই ২০১৬,সোমবার, ১৮:৩৪


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের ‘সন্ত্রাসবাদ’ প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর
ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করেছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার
‘সম্ভ্রান্তজনের’ পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬
জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড
টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রিয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ
ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে বিভ্রান্তই করবে। আর কিছু
নিজস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে।
প্রথমত, যে আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো ‘সেকুলারিজম’। সেটা
যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য দু’বার শক্তভাবে উল্লেখও করেছেন। আওয়ামী লীগকে মিষ্টি
ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, ‘তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন
করা সাজে?’- এ রকম। অথচ লীগ বুঝে কী করে কখন সেকুলারিজম ব্যবহার করতে হয়। আবার
কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই সমাধান খুঁজতে হবে- এই প্রশ্ন কখনো তারা
নিজেদের করেছেন কি না জানা যায় না। সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা যাচাই
করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই
ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
ইসলামের বিরুদ্ধের এই ঘৃণা-বিদ্বেষকেই আড়াল করতে সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি
মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে
হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।
‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না,
বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এই গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা
শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে ভাষ্যটা এমন নয় যে, আইএস বা
ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা এ রকম
নয়। অথবা চরমপন্থীরা ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী তা-ও নয়। একেবারে
পরিষ্কারভাবে বলা, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল
জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ
সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য
বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলোর জেনুইন ও আলাদা কর্তা আছে।
তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করা। এটা কেন করছে না
তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বললে সরকারের
স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত
২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর
মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর-এর লাইনের
বোঝাবুঝি অনুসারে, মুসলমান=টেররিস্ট। অতএব মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর
জায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় টেররিস্টে ভর্তি [এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময়
ছিল]। আর বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হলো গোড়ার
ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই বিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হলো টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম।
টোটকা বিশেষ বলা হলো এ জন্য যে, একটি বিদ্বেষ থেকে এর জন্ম, ইউরোপের ইতিহাসের
সেকুলারিজম থেকে নয়। মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেটÑ এই ধারণা
থেকে এর জন্ম নয়।
যা-ই হোক, সেকালে বুশের মুখোমুখি কোনো মুসলমান রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই বুশের অজানা ভয় ও
বিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার
বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হলো, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে
এই অজুহাত তুলে শেষে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টু করে
নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় সে সময়
আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়ে প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ আইএস বা
আলকায়েদা আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে আটকে থাকেনি-
বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর মাইনাস টুর ইস্যু। হাসিনার কাছে
একালে ব্যাপারটা এমনই। তাই তার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে অনীহা।
কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে
আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ
সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
আবার আরো কতগুলো দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার
করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী
রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি করা। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং
ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে
ক্রসফায়ার অথবা কী করা হবে বা হলো এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে
চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু মনিটরিং
কমিটি একটি হয়ে গেলে এবার বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে।
অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। যেটা এখন জনগণের কাছে
দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের
কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায়
বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী যে-কাউকে ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা
পুরোটা না হারালেও অনেক সীমিত হয়ে যাবে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত
আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করছে।
বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই
সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা আমেরিকার জন্য কঠিন হবে।
তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রিয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল
ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার
করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। মানে সমালোচিত হওয়ার
বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর
সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড
জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। এই ব্যাপকভাবে সমালোচিত-
সমালোচকদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে লেখকদ্বয়ের কী স্টেট ডিপার্টমেন্টকে কোনো পরামর্শ ছিল অথবা
কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি
হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে শেষ হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। এখন সেসব কথা
বলে লাভ কী? আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো
প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি
কেন। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কথা তুলেছিলেন, আমরা
দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা বিচারের
ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে
করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলি রিয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে
বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে। এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে
আলি রিয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার
প্রধান কাজ। তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল।
ওটা নিশ্চয় ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি,
কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রসবাদী বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে
না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’
দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল সন্ত্রাসবাদ আইএস এখন হাজির
হয়নি? মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় পেয়েছে, গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম
হয়েছে।
আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই
আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল,
লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তারা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার
কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
সব শেষ।
আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে ব্লাসফেমির দাবি মুখস্থের মতো বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা একটা
মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত
করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই আমি হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে।
মজার ব্যাপার হলো, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইন আছে। পেনাল
কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। দ্বিতীয় পয়েন্ট
হলো, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন?
আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা
হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো
গণক্ষোভে ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়,
আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছেন, শাস্তি
চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি, সে আইন প্রয়োগ করেননি,
কাউকে কোতল করেননি। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের নয়, একেবারে
মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। কিন্তু আমরা কিছুই লক্ষ
করিনি। কারণ, কী লক্ষ করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।
আসলেই কী বুঝি? আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার রিপোর্ট করার সময়
হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের
ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে। ওই রিপোর্টাররা
কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই
পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের
মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিয়েছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি
মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে
ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট
আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের
জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো
হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের
ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি
আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের
হাজির করা হলো। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের বিষয় হিসেবে
দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল।
আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলি রিয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে ওরা
‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এমন লালন যারা
করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলি
রিয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি
লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন
অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’
সোজা কথায় বললে আলি রিয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো বন্ধুদের অথবা আমেরিকাকে আগে ঠিক
করতে হবে তারা কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ
হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের
সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর
প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি
গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। অথবা আমাদের জন্যই হয়তো অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ
আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫