ঢাকা, রবিবার,১৬ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

‘ভারত মাতা কি জয়’ বলা-না-বলা

গৌতম দাস

২৮ মার্চ ২০১৬,সোমবার, ১৯:৩২


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

বিজেপির কল্যাণে ভারতে ‘দেশপ্রেমের রাজনীতি’ এক বিরাট ইস্যু হয়ে উঠেছে। এসবের সারকথা হলো- এক উগ্র জাতীয়তাবাদের রাজনীতি হাজির করা। নিজেকে অন্য সবার চেয়ে একমাত্র দেশপ্রেমিক বলে হাজির করা। দেশপ্রেমিকতার সংজ্ঞা সঙ্কীর্ণ করতে করতে এমন কিছু শব্দে নামিয়ে আনা বা সীমিত করে ফেলা, যেটা কেবল নিজ দলীয় রাজনীতিকেই বুঝায়। যাতে কেবল নিজের দলই দেশপ্রেমের দাবিদার একমাত্র দল হয়ে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হলো এ জায়গায় এসে ভারতের মোদি সরকার আর বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের দেশপ্রেমের রাজনৈতিক বয়ানে আরেক সাধারণ মিল দেখতে পাওয়া যায়। দেশপ্রেমের বিপরীত শব্দ হলো পাকিস্তান; এনিমি আর পাকিস্তান শব্দটি অদলবদল করে ব্যবহার করা হয়। 

ভারতে বিগত দু-তিন মাসে দিল্লির জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্রসংসদের নেতা গ্রেফতার ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া এই ‘দেশপ্রেমের রাজনীতির’ এক ভালো বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। এভাবে দেশপ্রেমের রাজনীতি স্বভাবতই এক উগ্র জাতীয়তাবাদ হাজির করে। নিজের দলকে অন্য সবার তুলনায় একমাত্র দেশপ্রেমিক দল হিসেবে হাজির করা হয়েছিল।
এভাবে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে এক কট্টর জাতীয়তাবাদী লাইনে নিয়ে গেলে দলের লাভ হবে, সঠিক রাজনৈতিক লাইন নেয়া হবে বলে এখনো বিজেপির তরফে মনে করা হচ্ছে। বিজেপির সেন্ট্রালওয়ার্কিং কমিটির সভা সমাপ্ত হয়েছে গত ২০ মার্চ রোববার; দলের জাতীয় কর্মসমিতির ওই বৈঠকে গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘বাকস্বাধীনতার যুক্তিতে দেশবিরোধী, জাতিবিরোধী বক্তব্যকে কোনোভাবে রেয়াত করা হবে না’। অর্থাৎ উগ্র জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমের রাজনীতি আরো কিছু দিন চলবে। অন্য দিকে এর পাল্টা কংগ্রেস-কমিউনিস্টরা মিলে এক জোট গড়ার চেষ্টা চলছে। বলা বাহুল্য, এর লক্ষ্য বিজেপি-বিরোধিতা। কিন্তু সেটা কি উগ্র জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, পাকিস্তান ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার না করে তৈরি করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট করে হ্যাঁ বলা মুশকিল। তবে এতটুকু বলা যায়, এরা অন্তত আপাতত এ শব্দগুলোতে একটু কম জোর দিয়ে বা কম গুরুত্ব দিয়ে পেছনে আড়ালে ফেলে নিজেদের এক লিবারেল রাজনীতির লাইন বলে হাজির করতে চাইছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভারতের কমিউনিস্টসহ প্রধান ধারার দলগুলোর মধ্যে এমন কোনো রাজনৈতিক ধারা নেই যে ভারতের রাষ্ট্রের ভিত্তি ‘হিন্দুত্ব হতেই হবে’ এর বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করতে সক্ষম। ফলে বিজেপির উগ্র দেশপ্রেমের রাজনীতির বিপরীতে এক আপাত-লিবারেল রাজনীতির পক্ষে যেন দাঁড়াচ্ছে এমন এক ভাবও সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে কংগ্রেস-কমিউনিস্ট জোট গড়ার চেষ্টাকে এমন উদ্যোগ বলেই চিহ্নিত করা যায়। এর মূল উদ্দেশ্য ভোটের রাজনীতি; বিজেপির চেয়ে ভালো অবস্থান পাওয়া। কোনো লিবারেল রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ানো নয়। রাজনৈতিক দল ছাড়া সমাজের আরেক বড় এমন সমর্থক হলো মিডিয়া। ভারতের মিডিয়ার প্রধান ধারাও এমন আপাত-লিবারেল অবস্থান নিয়েছে। নিজেদের বিজেপির চেয়ে অনেক ভালো, লিবারেল বলে হাজির করছে। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লি প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনই একজন। গত ১৪ মার্চ ‘দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞা ও হিন্দুত্ব’ শিরোনামে প্রথম আলোতে লেখায় এ বিষয়টিই তুলে এনে তিনি বিজেপিকে গালমন্দ করে নিজেকে লিবারেল বলে হাজির করেছেন। এককালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন টিকে ছিল, কোল্ড ওয়ার চালু ছিল সেকালে। তখন রাজনীতিতে তারা নিজেদের এনিমিকে ‘দক্ষিণপন্থী’ বলে চেনানোর একটা রেওয়াজ ছিল। অর্থাৎ আমরা বামপন্থীরা ভালো আর বিপরীতে দক্ষিণপন্থী যারা ওরা খারাপ- এই ছিল বয়ানের ভেতরের সাজেশন। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আমেরিকার সাথে সেই কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক আর দুনিয়ার কারো নেই। ফলে কাকে দক্ষিণপন্থী বা বামপন্থী বলবে এর তাল কেটে সব অর্থহীন হয়ে গেছে। তবুও পুরনো অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে অপছন্দের কাউকে দক্ষিণপন্থী বলার অভ্যাস অনেকে এখনো ছাড়তে পারেনি। এতে প্রকারান্তরে যে নিজেকে পুরনো স্টাইলে বামপন্থী দাবি করা হয়ে যায় সে হুঁশও সেখানে থাকে না। সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে সেভাবেই হাজির করে বিজেপি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় না থাকা এবং আদর্শগত অনমনীয়তা এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থীদের বরাবরই পিছিয়ে রেখেছে। পক্ষান্তরে নেহরুর সমাজতন্ত্র, ইন্দিরা গান্ধীর বামঘেঁষা রাজনীতি প্রশ্রয় দিয়েছে বামপন্থী ভাবধারাকে।
বিজেপির এ সময়ের এই সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান আরো এক ধাপ বৈশিষ্ট্য, আকার ও মাত্রা ধারণ করেছে। আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে বিজেপির মূল মতাদর্শিক সংগঠন মনে করা হয়, বিজেপিও তা অস্বীকার করে না। সেই আরএসএসের প্রধান মোহন ভগত দেশপ্রেম বিষয়ে এক ফতোয়া জারি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ভারত মাতা কি জয়’- এটা হলো ফিল্টারে পাস করা সেই দেশপ্রেমের স্লোগান। দেশপ্রেমের প্রমাণ হিসেবে তিনি এই স্লোগান বাধ্যতামূলক করার পক্ষপাতী বলে জানিয়েছেন। স্বভাবতই তার এই দাবি রাজনৈতিক হইচই সৃষ্টি করে। এটি বিজেপির নিজেকে টগবগে সবার মুখে মুখে থাকার ভালো কৌশল মনে করে। গত দুই সপ্তাহে ভারতের রাজ্যসভা সেশনে ছিল বা চালু ছিল। রাজ্যসভায় মহারাষ্ট্রীয় রাজ্যের এক প্রতিনিধি হলেন আসাদউদ্দিন ওয়াসি। রাজ্যসভায় তিনি এ বিষয়ে তার আপত্তি জানিয়ে পাল্টা প্রস্তাবমূলক বক্তৃতা করেছেন। তিনি সরলভাবে বলেছেন, ‘ভারত মাতা কি জয়’ কথাটি বাধ্যতামূলকের জায়গায় অপশনাল রাখলে তার আপত্তি নেই। কিন্তু তাতেই শিবসেনা নেতা রামদেব প্রমুখ নেতারা তাকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়ার, নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার দাবি জানাতে থাকে। ওয়াসির কথার প্রধান যুক্তি হলো দেশকে মা-রূপে কল্পনা করা এবং পূঁজা করা সব নাগরিকের বেলায় প্রযোজ্য করা যাবে না, জরুরিও নয়। এমন কথা কনস্টিটিউশনেও নেই। রাজ্যসভার সমাপ্তি অধিবেশন চলছিল, ফলে ওয়াসির পরে অন্য মুসলিম সদস্যদেরও পালা আসে। তেমন একজন হিন্দি সিনেমার গীতিকার, সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখক জাভেদ আখতার। তিনি কংগ্রেস দল থেকে নমিনেশন দেয়া সদস্য। তিনি ওয়াসিকে মুসলমান রাজনীতিক আর তিনি সেকুলার রাজনীতিক এই ভাগ বজায় রাখার চেষ্টা করেন। ফলে তিনিও ওয়াসিকে সমালোচনা করা দরকার মনে করেন নিজের সেকুলারিজম স্পষ্ট করার তাগিদে। তিনি ভাবলেন মধ্যমপন্থা তার জন্য সঠিক হবে। কংগ্রেসের দলের অবস্থান হলো, দেশকে মা কল্পনা করেই না, এমন আপত্তির কথা বললে হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সি না বেজার হয় এই ভয়ে সে অস্থির। তাই জাভেদ আখতার বললেন, “ভারত মাতা কি জয় বলা বাধ্যতামূলক দায়িত্ব কি না এটা তিনি জানেন না। আবার এমনকি তিনি জানতেও চান না। তবে আমি জানি ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলা আমার অধিকার।” এভাবেই বাধ্যতামূলক করার মোহন ভগতের মুখ্য দাবির প্রসঙ্গটিই তিনি এড়িয়ে গেলেন এবং প্রকারান্তরে মোহন ভগতকে হিন্দুত্বের দাবি করার জায়গা করে দিলেন। ভারতের এক ইংরেজি ওয়েব দৈনিক আছে ডওজঊ নামে। আমি সে পত্রিকার ২১ মার্চ সংখ্যার বরাতে লিখছি, ‘পরে যখন তাকে সুনির্দিষ্ট করে জিজ্ঞেস করা হয়, কাউকে ওই স্লোগান দিতে বাধ্য করা যায় কি না, এর জবাবে এবার তিনি আরো তুচ্ছ হয়ে বললেন, ওয়াসির অধিকার থাকলেও তিনি সেটা সঙ্ঘাত-প্রকাশ পায় তা এড়িয়ে বলা উচিত ছিল। তাই ওয়াসির ব্যাপারে তার আপত্তিটি বিষয়বস্তু নিয়ে ঠিক নয়।’ এরপর রিপোর্টার মন্তব্য করছেন, ‘জাভেদ আক্তারের এই মোচড়ামুচড়ি বেশ মজার।’ এরপরে জাভেদের স্ত্রী অভিনেতা শাবানা আজমি তার সাহায্যে এগিয়ে এসে বলেন, “আমি ওয়াসিকেই জিজ্ঞেস করতে চাই তিনি ভারত ‘আম্মি’ কি জয় বলতে রাজি কি না। শাবানা আজমি মনে করতে পারেন যে ‘মাতার’ জায়গায় ‘আম্মি’ বসিয়ে তিনি মহা সেকুলার রসিকতা করে দেখিয়েছেন। কিন্তু তিনি আসলে বিতর্কটিই বোঝেননি। সবশেষে পত্রিকা রিপোর্টারের মন্তব্য করেছেন, জাভেদ আক্তারের সমস্যা জটিলতা আমরা যে কেউ বুঝতে পারি। ব্যাপারটা হলো, এটা আজকাল কেবল যেকোনো হিন্দুর জন্য ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলে নিজের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করা সবচেয়ে সহজ। রাজনীতি এমনই প্রহসন এবং ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। ‘আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে মুসলমান থাকা সহজ নয়, যেখানে আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের পরিণতির দিকটি হলো, মুসলিম কমিউনিটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উত্ত্যক্ত করা।”
এখানে সারকথা হলো, সেকুলার অবস্থান, কংগ্রেসের অবস্থান এবং সেকুলার জাভেদ আখতারের অবস্থান আমরা দেখলাম যারা কেউই আরএসএসের প্রধান মোহন ভগতের নাগরিকের ওপর জোর খাটিয়ে বাধ্যতামূলক করার (মৌলিকভাবে অসাংবিধানিক) দাবির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারলেন না। ভয়ে অথবা হিন্দু ভোট হারানোর ভয়ে চুপ থাকলেন। উল্টা ওয়াসিকে দোষী করলেন। এখান থেকে সাধারণ শিক্ষা হলো, আরএসএসের প্রধান মোহন ভগত সবার আগে একটা সঙ্কীর্ণ সম্প্রদায়গত অবস্থান নিলেন এবং অন্যদের ওপর তা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করাতে অন্যরাও যার যার আরেক কোটারি সম্প্রদায়গত অবস্থান নেয়ার দিকে মেলে দিয়েছেন। সম্প্রদায়গত বিভক্তির রাজনীতি অন্যদেরও আরেক বিভক্তির রাজনীতি হাজির করার দিকে ঠেলে দেয়।
এতক্ষণকার ঘটনা শুনে মনে হতে পারে হিন্দু-মুসলমানবিষয়ক সঙ্ঘাত তো আমরা বুঝিই, আর নতুন করে কী বোঝার আছে!
এ ঘটনা ২১ মার্চের, এরপর ২৩ মার্চ। অনেকের ধারণা ভারতের পাঞ্জাবের শিখেরা বোধহয় হিন্দুই। সারা আশির দশকজুড়ে ভারতে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলন চলেছিল। রাষ্ট্রের বহু দমন-পীড়নের পর এটা শিখ আকালি (আঞ্চলিক) দল হিসেবে থিতু হয়। আর সেই থেকে এই দলের দুই অংশের কোনো একটা পাল্টাপাল্টি করে বিধানসভা দখল মানে রাজ্য সরকার গঠন করে আসছে। শিখদের শিরোমণি আকালি দল (অমৃতসর) নেতা সিমরনজিৎ সিং মান সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, শিখরাও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে পারবে না। তিনি বলেন, শিখরা নারীদের কোনোভাবেই পূজা করে না, এ জন্য তারা ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলবে না। যে কথা বলছিলাম, এতক্ষণকার ঘটনা শুনে মনে হতে পারে হিন্দু-মুসলমানবিষয়ক সঙ্ঘাত তো আমরা বুঝিই, শিখনেতা মানের বিবৃতি আসায় আমাদের জন্য সুবিধা হিসেবে এসেছে যে আমাদেরকে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক পরিসর গড়ার কাজ ও কথা ভাবতে হবে। বিষয়টি সিরিয়াস। 
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫