জুলাই বিপ্লবের মাহেন্দ্রক্ষণে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন শহীদ ওমর

৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেল পৌনে ৪টার দিকে উত্তরার জসিমউদ্দীন রোডে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

এস এম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

Location :

Chattogram
শহীদ মো: ওমর বিন নুরুল আবছার
শহীদ মো: ওমর বিন নুরুল আবছার |নয়া দিগন্ত

জুলাই বিপ্লবের মাহেন্দ্রক্ষণে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে শহীদ হয়েছিলেন জুলাইযোদ্ধা বিমানের ইঞ্জিনিয়ার মো: ওমর বিন নুরুল আবছার (২২)। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রাজধানীর জসিমউদ্দীন রোড়ে ছাত্রজনতার বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি। সেই থেকে বিচারের আশায় প্রহর গুনছেন পরিবারের সদস্যরা।

শহীদ ওমরের মা রুবি আক্তার জানান, তার আর কোনো প্রত্যাশা নেই। শুধুমাত্র ন্যায় বিচারটাই আশা করছেন।

বিকেলে মোবাইল ফোনে কথা হলে তার এই প্রত্যাশার কথা জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘দুই বছর তো পার হতে চললো, আর কত অপেক্ষা করতে হবে ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য?’

তিনি জানান, ওমরকে নিয়ে পরিবারের খুব আশা ছিল, তিনি বিমানের ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণসহ দেশের হয়ে কাজ করবেন। তার সে আশা পূরণের মাত্র তিন মাসের মাথায় বিজয় মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ওমর।

৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেল পৌনে ৪টার দিকে উত্তরার জসিমউদ্দীন রোডে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

জুলাই ৩৬ বিপ্লবে শহীদ ওমর ছিলেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া ইউনিয়নের আকুদন্ডি গ্রামের প্রবাসী মো: নুরুল আবছার ও রুবি আকতারের সন্তান। তিনি ছিলেন পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে মেজ। পরিবারের সদস্যরা প্রবাসে থাকা অবস্থায় ২০ জানুয়ারী ২০০২ সালে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ইংরেজি ক্যারিকুলামে পড়াশোনা করেন। তার স্বপ্ন ছিল বিমানের ইঞ্জিনিয়ার হবেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম ক্যান্টন্টমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভর্তি হন এবং এইচএসসি পরিক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর বিমানের ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টারে ভর্তি হন। শেষ মডিউলে পড়ছিলেন। গ্রাজুয়েশন শেষ করতে বাকি ছিল আর মাত্র তিন মাসের মতো।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পড়াশুনা শেষ হওয়ার আগেই বেশ কয়েকটি চাকুরির অফার পেলেও তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে রাজপথে থেকে লড়াই করার সিদ্ধান্তে ছিল অটল।

তার আগেও, প্রথমবার ১৮ জুলাই রাবার বুলেটে আহত হয়েও দমে যাননি শহীদ ওমর। দ্বিতীয় দফা বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ ৫ আগস্ট ২০২৪ বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি উত্তরা ক্রিসেন্ট হসপিটালে মারা যান। দুপুরে মায়ের সাথে মোবাইলে কথাও বলেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় পৌনে ৪টার দিকে গুলিবিদ্ধ হন। পরে ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি ৬টা ২৬ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

শহীদ ওমরের মা বলেন, ‘তাকে প্রথমে বাংলাদেশ মেডিক্যালে নেয়া হয়। সেখানে তার চিকিৎসা করে নাই। পরে কয়েকজন ছেলে মিলে তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হসপিটালে নিয়ে যায় এবং সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এরপর পরিস্থিতি ভালো না হওয়ার কারণে আমরা যেতে পারেনি। পরে তার বন্ধুরা এবং সিনিয়ররা একটা ফ্রিজার গাড়ি করে তাকে পাঠিয়ে দেয়। তারপর ভোর ৪টার দিকে আমরা ওমরের লাশ বুঝে নিই। গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীতে তার লাশ দাফন করা হয়।’

তিনি জানান, তার স্বপ্ন ছিল খুব উঁচু। কিন্তু তার ও পরিবারের আশা পূরণের আগে দেশের জন্য শহীদ হন তার সন্তান।

গত বছরের ২৫ জুন সকালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর নিজ বাড়ির কবরস্থান থেকে দাফনের প্রায় ১১ মাস পরে শহীদ ইঞ্জিনিয়ার মো: ওমর বিন নুরুল আবছারের লাশ সুরতহাল এবং ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে উত্তোলন করে পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পুনরায় লাশ দাফন করা হয়। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়ে আগামী ৫ আগস্ট আবার ওমরের মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হবে। কিন্ত একজন শহীদের মা হিসাবে তার সন্তানসহ সকল জুলাইযোদ্ধা হত্যার বিচার প্রত্যাশা করেন সন্তান হারা এই মা।