করের হার অপরিবর্তিত রেখে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য এক হাজার ৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১২ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। গত অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের আকার বেড়েছে ৩৫৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ১৯০ টাকা।
এত বড় রেকর্ড বাজেট ঘোষণার ব্যাখায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় আমরা এত বড় রেকর্ড বাজেট ঘোষণা করতে সাহস পেয়েছি। ইতোমধ্যে আমি প্রশাসক হওয়ার পরেই প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিকভাবে সিটি করপোরেশন এলাকার উন্নয়নের জন্য ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।’
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে নগর ভবনের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত নাসিকের ২০তম সভায় প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বাজেট ঘোষণাকালে এসব কথা বলেন। এ সময় নগরীর সুশীল সমাজ সংসদ সদস্য, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।
বাজেট ঘোষণার বিশ্লেষণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘোষিত বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১২ টাকা এবং ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৩০ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার ৪০২ টাকা। বছর শেষে ১৩০ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৭১০ টাকা উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ছিল ৭০৪ কোটি ৬১ লাখ চার হাজার ৩২২ টাকা। নতুন বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২১৪ কোটি ৭৫ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ টাকা।’
বাজেট উপস্থাপনকালে প্রশাসক বলেন, ‘নতুন করে কোনো কর আরোপ করা হচ্ছে না; বরং করের আওতা ও পরিধি বাড়িয়ে, নতুন রাজস্ব উৎস চিহ্নিত করে, বিদ্যমান সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে এবং রাজস্ব আদায়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধি করা হবে। ছাদবাগান স্থাপনকারীরা বিদ্যমান ২৭ শতাংশ কর ছাড়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত দুই শতাংশ কর ছাড়ের সুবিধাও পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘গত অর্থ বছরে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গণপরিসর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৩৩ হাজার ৪৯৩ টাকা ব্যয় না হওয়ায় নাগরিকরা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নতুন অর্থ বছরে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৮২ কোটি টাকা করা হয়েছে এবং পুরো অর্থ ব্যয় করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।’
সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থসহ ৫৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৭টি ওয়ার্ডে আরসিসি ড্রেন, আরসিসি ও বিটুমিনাস সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, আইল্যান্ড পুনর্নির্মাণ, পুকুর সৌন্দর্যবর্ধন, ঘাটলা নির্মাণ এবং পানি সরবরাহের পাইপলাইন স্থাপনের জন্য ৮০টি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নগরীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে ২ নম্বর রেলগেট থেকে চাষাড়া পর্যন্ত বিকল্প বাইপাস সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের গেটসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে এবং দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি বিবি রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে হকার অপসারণ ও পুনর্বাসনের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘জাইকা সহায়তাপুষ্ট Urban Development and City Governance Project-এর আওতায় নাসিকে ১০টি উপ-প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ড্রেন নির্মাণ, কমিউনিটি সেন্টার, স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, খেলার মাঠ ও গণপরিসর উন্নয়ন। এছাড়া বৈদেশিক সহায়তায় ২০ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন, ২৮০ কিলোমিটার বিতরণ পাইপলাইন, ১৪টি ডিস্ট্রিক্ট মিটার্ড এরিয়া (ডিএমএ), ৩৫ হাজার হোল্ডিংয়ে স্মার্ট মিটারসহ পানি সংযোগ এবং ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
সিটি প্রশাসক বলেন, ‘পানির সঙ্কট মোকাবেলায় ৩০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নয়টির কাজ চলছে এবং বাকি ২১টির দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একইসাথে ২৭টি ওয়ার্ডে ধাপে ধাপে মোট ৫৪টি পাম্প স্থাপনের উদ্যোগও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে জালকুড়িতে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কদমরসুল এলাকায় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৭০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে চলছে। পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে ৩৫ হাজার আবাসিক ভবনে পৃথক বর্জ্য সংরক্ষণের বিন সরবরাহ করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নাসিকের পাঁচ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব ও কার্বনমুক্ত নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন বাস-ট্রাক টার্মিনাল, মাল্টিমোডাল হাব, ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, নাগরিক সেবার শতভাগ অটোমেশন, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ‘কলরব’ ও ‘অপরাজিতা’ স্কুলের নির্মাণ, পার্ক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
সিটি প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নগর সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এর আওতায় নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেলের সাথে সংযুক্ত করা, শীতলক্ষ্যা নদীর উপর রোপওয়ে ও ওয়াটার সার্কুলার সার্ভিস চালু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত সার্কুলার সড়ক নির্মাণ, আধুনিক সুয়ারেজ ব্যবস্থা চালু এবং সিটি করপোরেশনের পরিধি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উচ্চশিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ, শিল্প ও গৃহস্থালির শতভাগ বর্জ্য পরিশোধনে সমন্বিত ইটিপি স্থাপন, শীতলক্ষ্যা নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করে তীরজুড়ে সবুজায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার রূপরেখা বাস্তবায়ন।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেওভোগ জিউস পুকুর ও ৬.৬৬ কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধার, পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য আবাসন, বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের উন্নয়ন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে ৩০টি ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ স্থাপন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও অনুদান প্রদান, টিসিবির স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি এবং ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের জন্য জরিপ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।’
বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নান, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাসুকুল ইসলাম রাজীব, নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি, সুশাসনের জন্য নাগরিক নারায়ণগঞ্জের সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল প্রমুখ।



