ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক বাড়িতে হত্যা ও পরবর্তী সহিংসতার প্রায় এক বছর পার হতে চললেও এর রেশ কাটেনি। মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে শতবর্ষী একটি বাগানবাড়ি। আক্রান্ত ওই বাড়ির লোকজন প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে এক বছরেও ফিরতে পারেননি বাড়িতে। ওই পরিবারের অন্তত ১০ জন স্কুল ও মাদরাসা শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ৭০-ঊর্ধ্ব রেজিয়া খাতুনসহ পরিবারের ২৮ সদস্য।
জানা গেছে, উপজেলার মগটুলা ইউনিয়নের কর্মা গ্রামে দীর্ঘদিন জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একই বাড়ির গিয়াস উদ্দিন ও কছুম উদ্দিনের ছেলেদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে। বারবার এলাকাবাসী মিলে দেনদরবার করেও এর ইতি টানতে পারেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ওই বাড়িতে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কছুমের ছেলেরা দলবল নিয়ে গিয়াসের বাড়িতে হামলা করলে গিয়াসের বড় ছেলে মোসলেম উদ্দিনের বাম চোখে রামদার কোপ লাগে। পরে ওই চোখটি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়।
গত বছরের ৩ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে গিয়াস ও কছুমের উদ্দিনের ছেলেদের মধ্যে আবরো সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হলেও কছুমের ছেলে খোকন মিয়া মারা যান। বিষয়টি নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কছুমের অন্য ছেলেরা গিয়াসের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। ওই সময় গিয়াসের ছেলেদের চারটি হাফ বিল্ডিং ও পাঁচটি টিনের ঘর ভেঙে লুটপাট করা হয়। ঘরের সব জিনিসপত্র লুটপাট করার পাশাপাশি একটি একটি করে ইট পর্যন্ত খুলে নেয়া হয়। কেটে নেয়া হয় অর্ধশতাধিক গাছ।
ছেলে ও ভাতিজাদের এমন কর্মকাণ্ডে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন নিহত খোকনের বাবা কছুম। এই হতাশা থেকেই ছেলেদের প্রতি বিরক্ত হয়ে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে কছুম আত্মহত্যা করে মারা যান।
বিষয়টি নিয়ে গিয়াসের ছেলে মুফতি এখলাছ উদ্দিন জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে কছুমের ছেলেরা প্রায়ই তাদের বাড়িতে হামলা করত। বেশ কয়েকবার চুরি ও ডাকাতির ঘটনাও ঘটিয়েছে তারা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাড়িতে হামলা করে তার বড় ভাই মোসলেমের একটি চোখ নষ্ট করেছে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে ডাকাতির উদ্দেশে তাদের বাড়িতে হামলা করলে বাড়িতে থাকা লোকজন প্রতিরোধ করতে গেলে সংঘর্ষ বাধে। ওই সময় অনেকেই আহত হন। রাতে আহত হলেও খোকনের সৎ মা ও সৎ ভাইয়েরা যথাসময়ে তাকে চিকিৎসা দিতে গড়িমসি করেন। চিকিৎসাজনিত অবহেলাতেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মুফতি এখলাছ উদ্দিন আরো জানান, এরপর তাদের শতবর্ষী বাগানবাড়িতে হামলা চালিয়ে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে লুটপাট করা হয়। বসতবাড়িটি ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। ঘর ভেঙে একটি একটি করে ইট পর্যন্ত খুলে নেয়া হয়। বাড়ির উঠানে গর্ত করা হয়। কেটে নেয়া হয় অর্ধশতাধিক গাছ। এতে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটনার এক বছর পার হলেও প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে পরিবারের লোকজন এখন পর্যন্ত বাড়িতে যেতে পারেননি। বৃদ্ধ মাসহ মাদরাসা ও স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে পরিবারের ২৮ সদস্য মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তবে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়টি নিয়ে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে নিহত খোকন মিয়ার সৎ ভাই শফিকুল বলেন, ‘আমার ভাইকে তারা ফিরিয়ে দিয়ে বাড়িতে আসুক আমাদের তো কোনো সমস্যা নেই।’
তাদের বাড়িঘর কে ভাংচুর করেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাড়িঘর ভাংচুর করেছে উত্তেজিত এলাকাবাসী।’
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আজম বলেন, ‘আসামিরা যদি জামিনে থাকেন, তাহলে বাড়িতে থাকার অধিকার অবশ্যই আছে। আর যারা আসামি নন, তারা তো বাড়িতেই থাকার কথা।’



