সিলেটে হামে মৃত্যু থামছে না, বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম ও হাম উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৮ জনে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৬ জনে।

এমজেএইচ জামিল, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিলেট-এর কার্যালয়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিলেট-এর কার্যালয় |সংগৃহীত

সিলেটে হামে মৃত্যু থামছে না। প্রতিদিন নতুন করে রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণও বাড়তে থাকায় নাজুক হয়ে উঠেছে বিভাগের সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি।

গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৪ জনের শরীরে এবং হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো ৯২ জন। পাশাপাশি নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচজন।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম ও হাম উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৮ জনে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৬ জনে।

অন্যদিকে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩৬ জন। ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে।

হামে আরো এক শিশুর মৃত্যু

গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুটির নাম রাইহান। তার বয়স ৭ মাস। সে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইছাকপুর এলাকার বাসিন্দা। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর হাম ও হাম উপসর্গে মারা যাওয়া ১২৮ জনের মধ্যে নিশ্চিত হাম ছিল ছয়জনের। বাকি ১২২ জন মারা গেছেন হাম উপসর্গ নিয়ে। জেলাভিত্তিক হিসাবে এ পর্যন্ত সিলেটে ৪৬ জন, হবিগঞ্জে ১৬ জন, মৌলভীবাজারে ১৩ জন এবং সুনামগঞ্জে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৪ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে ১ জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৬ জনে। এর মধ্যে সিলেটে ২৮৭ জন, হবিগঞ্জে ১১৬ জন, মৌলভীবাজারে ১২০ জন এবং সুনামগঞ্জে ৩৫৩ জন রয়েছেন। হবিগঞ্জে শনাক্তদের মধ্যে দুইজন রুবেলা রোগী।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে আরো ৯২ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৪ জন।

এর আগে ৯ আগস্ট তিন শিশু এবং ১০ আগস্ট আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এবার আরো এক শিশুর মৃত্যুতে টানা তিন দিনে ছয় শিশুর মৃত্যু হলো। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত এবং বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ডেঙ্গুতেও বাড়ছে আক্রান্ত

হামের পাশাপাশি সিলেটে ডেঙ্গুর সংক্রমণও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো পাঁচজনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬ জনে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

নতুন শনাক্ত পাঁচ রোগীর মধ্যে দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চারজন রয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চিকিৎসাধীনদের মধ্যে দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছয়জন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে সাতজন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে একজন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনজন রয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত বিভাগে মোট ১৩৬ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটে ২৬ জন, সুনামগঞ্জে ২৭ জন, হবিগঞ্জে ৬৪ জন এবং মৌলভীবাজারে ১৬ জন।

এছাড়া বিভাগের বাইরের আরো তিনজন রোগী সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

চলতি বছর ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

সিলেটে একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, হাম, ডেঙ্গু ও করোনা—তিনটিই সংক্রামক রোগ। এসব রোগ থেকে সুরক্ষায় স্বাস্থ্য সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ রোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। বাসাবাড়ি ও আঙ্গিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি কোনো অবস্থাতেই পানি জমে থাকতে দেয়া যাবে না। সর্বোপরি, উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি।

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় শংকর দত্ত বলেন, সিলেটে একজন করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তবে হামে মৃত্যুর বিষয়টি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা আরো বেশি উদ্বেগের। হাম উপসর্গে যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের অনেকেই টিকা নেয়নি। টিকা ক্যাম্পেইন চলাকালে হয়তো স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের খুঁজে বের করতে পারেনি, অথবা অভিভাবকরা টিকা দিতে আগ্রহ দেখাননি।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব।