মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান (অবসরপ্রাপ্ত) হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের যথাযথ আইন অনুযায়ী শিগগিরই বিচার নিশ্চিতকল্পে সর্ব প্রকার সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) মেজর সিনহার স্মরণে নির্মিত ‘সিনহা স্মৃতিফলক’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাবাহিনী প্রধান এসব কথা বলেন। এ সময় শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
এ দিন রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শ্যামলাপুরে বিজিবি কক্সবাজার রিজিয়নের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নির্মিত ‘সিনহা স্মৃতিফলক’ উদ্বোধন করেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার অন্তর্গত বাহারছড়া ইউনিয়নের শ্যামলাপুর নামক স্থানে নিরস্ত্র মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান (অবসরপ্রাপ্ত) চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশের গুলিতে নিহত হন। মেজর সিনহা চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ২৬ জুলাই ১৯৮৪ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ এরশাদ খান অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব ছিলেন। তিনি ২১ জুলাই ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৫১তম বিএমএ লং কোর্সে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে ২২ ডিসেম্বর ২০০৪ সালে কমিশন লাভ করেন। চাকরি জীবনে তিনি অত্যন্ত দক্ষ, বিচক্ষণ, উদ্ভাবনশীল ও চৌকস সেনা অফিসার ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ সংগীন যোদ্ধা এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) এর সদস্য ছিলেন। তিনি ২০১৩ সালে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আইভোরিকোস্টে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
অনুষ্ঠানে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ মিনহাজুল আলম, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, মেজর সিনহার মা ও বোন; সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব-এর সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
কী ঘটেছিল সেদিন
সিনহার বোনের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, সিনহা ও সিফাত ৩১ জুলাই বিকেলে ডকুমেন্টারির জন্য ভিডিও ধারণ করতে নীলিমা রিসোর্ট থেকে বাহারছড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রাস্তার পাশের পাহাড়ে যান। ‘ডকুমেন্টারির প্রয়োজনেই’ সিনহার পরনে তখন কমব্যাট গেঞ্জি, কমব্যাট ট্রাউজার ও ডেজার্ট বুট ছিল।
রাত ৮টা পর্যন্ত পাহাড়ে ভিডিও ধারণ করে তারা ফিরতি পথে রওনা হন এবং রাত ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে সিনহার প্রাইভেটকার শামলাপুর চেক পোস্টে পৌঁছায়। পরিদর্শক লিয়াকতসহ পুলিশ সদস্যরা সেখানে গাড়ির ‘গতিরোধ’ করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়।
এজাহারে বলা হয়, সিনহা অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে পরিচয় দিলে পুলিশ সদস্যরা গাড়ির সামনের বাঁ দিকের দরজা খুলে ‘টেনে-হিঁচড়ে’ সিফাতকে বের করে নিয়ে যান। সিফাত তখন দু’ হাত তুলে নিজের এবং গাড়িতে বসা সিনহার পরিচয় দেন।
আসামিরা ওই সময় আরো ক্ষিপ্ত হয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে।
মামলায় বলা হয়, এ সময় সিনহা গাড়ি থেকে নেমে দু’ হাত ওপরে তুলে বারবার নিজের পরিচয় দেন। কিন্তু পরিদর্শক লিয়াকত তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।
পরিদর্শক লিয়াকত বলতে থাকেন, ‘তোর মতো বহুত মেজরকে আমি দেখছি। এইবার খেলা দেখামু’। এরপর লিয়াকত টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ফোন করে নিচু স্বরে সলাপরামর্শ করতে থাকেন। একপর্যায়ে লিয়াকত ফোনে প্রদীপকে বলতে থাকেন, ‘ঠিক আছে, শালারে শেষ কইরা দিতাছি’।
ওই সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিদর্শক লিয়াকত সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মাথায় পূর্ব পরিকল্পিতভাবে মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের শরীরের উর্ধ্বাংশে কয়েক রাউন্ড গুলি করেন। গুলির আঘাতে সিনহা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান এবং নিজের জীবন রক্ষার জন্য ঘটনাস্থল থেকে উঠে পালানোর চেষ্টা করেন।
তখন অন্য আসামিরা তাকে চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দেয়। লিয়াকত তখন সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরো এক রাউন্ড গুলি করেন।
এজাহারে বলা হয়, এর পরপর ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে ওসি প্রদীপ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা সিনহার শরীর ও মুখে কয়েকবার লাথি মেরে তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হন এবং নিজের বুট জুতা দিয়ে ঘষা দিয়ে নিহতের মুখমণ্ডল বিকৃত করার চেষ্টা করতে থাকেন।
পুলিশ সদস্যরা এ সময় মামলার সাক্ষী এবং ঘটনাস্থলের আশপাশে উপস্থিত লোকজনকে ‘অস্ত্র উঁচিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে’ সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর রাত পৌনে ১২টার দিকে সিনহাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে উল্লেখ করা হয় মামলায়।
তদন্ত প্রতিবেদেনে বলা হয়, ‘হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনাকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য আসামী প্রদীপ কুমার দাশ ও ইন্সপেক্টর লিয়াকত তাদের সঙ্গীয় ফোর্সের সহায়তায় ভিকটিমের গাড়ি হতে মাদক উদ্ধারের ও সরকারি কাজে বাধা দানের ঘটনার সাজিয়ে তিনটি নিয়মিত মামলা রুজু করে এবং ভিকটিমসহ শিপ্রা ও সিফাতের চরিত্র হরণের জন্য বিভিন্ন অপচেষ্টায় লিপ্ত হন।’
ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। তখন পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত পুরো কক্সবাজার জেলা পুলিশের প্রায় দেড় হাজার জনকে বদলি করা হয়েছিল।
৫ আগস্ট ২০২০
২০২০ সালের ৫ আগস্ট টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ ৯ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি করে কক্সবাজার আদালতে মামলা করেন নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস।
আদালত মামলাটি নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেয়। এ মামলার পাশাপাশি পুলিশের দায়ের করা তিন মামলারও তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় র্যাবকে।
৫ আগস্ট ২০২০
সিনহা নিহত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার মধ্যে কক্সবাজারে বিরল এক সংবাদ সম্মেলনে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদ। ঘটনাস্থল শামলাপুর চেকপোস্ট এলাকা পরিদর্শনেও যান তারা।
৫ আগস্ট ২০২০
ব্যাপক আলোড়নের মধ্যে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে করে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স অয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)। সেখানে সিনহা নিহতের ঘটনায় দায়ী সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতারের দাবি তোলেন সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা।
৬ আগস্ট ২০২০
এ দিন সকালে মামলাটি নথিভুক্ত করে টেকনাফ থানা। বিকালে মামলায় এজাহারভুক্ত ৯ জন আসামির মধ্যে ওসি প্রদীপসহ সাতজন পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। বাকি ছিলেন এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা। প্রদীপ-লিয়াকতসহ তিনজনকে রিমান্ডে পাঠায় আদালত।
৭ আগস্ট ২০২০
ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকত, এসআই নন্দলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন ও এএসআই লিটন মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ।
১২ জানুয়ারি ২০২২
যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য ৩১ জানুয়ারি দিন ঠিক করে দেন বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল।
৩১ জানুয়ারি ২০২২
কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল তার রায়ে বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে।’
এ মামলার ১৫ আসামির মধ্যে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলীর ফাঁসির রায় আসে।
সিনহাকে হত্যায় সহযোগিতা এবং ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার অভিযোগে তিন পুলিশ সদস্য এবং পুলিশের তিন সোর্সকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মামলার ১৫ আসামির মধ্যে বাকি চার পুলিশ সদস্য এবং তিন এপিবিএন সদস্যকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।
হত্যাকাণ্ডের দেড় বছর পর ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি সেই মামলায় রায় দেন আদালত। আসামিদের মধ্যে প্রদীপ ও লিয়াকতের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, ছয়জনকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।



