০৪ এপ্রিল ২০২০

পতাকা নিয়ে কাজ করেন তিনি

-

লাল-সবুজের পতাকার ইতিহাস সবারই জানা। অনেক রক্ত কেনা এই স্বাধীনতা। পতাকার বৃত্তের রঙের মতো রক্তে রঞ্জিত আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস। অন্য দিকে পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আমাদের স্বাধীনতার গল্প অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে একটু আলাদাই। তাই বাঙালি জাতি ভিন্নভাবে স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করে। স্বাধীন দেশের স্বাধীন পতাকা যখন আকাশে উড়তে থাকে, গর্বে বুক ভরে যায়। আবার যখন কেউ এই পতাকা উড্ডয়ন করতে গিয়ে কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে, তখন মনে হয় স্বাধীনতার অমর্যাদা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের দেশের অনেকেই জাতীয় পতাকার প্রতি অনেক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। জাতীয় পতাকার খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানেন। আবার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে অনেকে ভুল করে বসেন, আর এমন মানুষের ভুল সংশোধন করে দিচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব এক নারী।
নাম তার মাধুরী বণিক। মাধুরী বণিকের জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার পানালিয়া গ্রামে। ছোটবেলা থেকে মাধুরী বণিক একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। যে পরিবারে মাধুরী বণিক বড় হয়েছেন, সেই পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল। যে কারণে নারী হয়েও দেশের কল্যাণে মানুষের জন্য কাজ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। মানুষকে সচেতন করতে তার এই ব্যতিক্রমী কর্মপ্রেরণা অনেকের কাছে অনুকরণীয়।
স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় মাধুরী বণিক দশম শ্রেণীর ছাত্রী। অনেক মুক্তিযোদ্ধা তার সহপাঠী ছিলেন। মায়ের আদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ বাড়ি থেকে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দিতেন। সেই থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা সবাই তাকে স্নেহ করতেন। আর এ কারণেই মুক্তিযোদ্ধাকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন মাধুরী বণিক। দেশ স্বাধীনের পর বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করেছেন একত্রে। দেশপ্রেম বলতে যা বোঝায় তা বুকে লালন করে চলেছেন। এ জন্য দেশের প্রতি, দেশের পতাকার প্রতি তার বিরল সম্মান। যে পতাকার জন্য এত ত্যাগ তিতিক্ষা সেই পতাকার যদি অবমাননা দেখেন, তাহলে তিনি সহ্য করতে পারেন না। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন এই পতাকার মান-মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সবাইকে কাজ করতে হবে। এ জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি বিবর্ণ, ছেঁড়া ও এক টুকরো লাঠিতে পতাকা উত্তোলিত দেখেন, সেখানে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে বলেন পতাকার মর্যাদার কথা। তখন তার কথা একবাক্যে মেনে নিয়ে সেই পতাকা নামিয়ে ফেলেন। দোহার নবাবগঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ যেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়, সেখানে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করে খোঁজখবর রাখেন। এ পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের উত্তোলনকৃত বিবর্ণ ও ছেঁড়া পতাকা নামিয়ে নতুন পতাকা উড্ডয়ন করেছেন।
প্রতিটি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, সরকারি অফিস, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যেখানে পতাকা উত্তোলন করা হয়, সেখানে গিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন। মাধুরী বণিক ৫২ বছর ধরে শিশুদের নিয়ে একটি পাঠশালা চালাচ্ছেন। সেখানে শিশুদের বর্ণ-পরিচয়ের পাশাপাশি জাতীয় সঙ্গীত, পতাকার অভিবাদন, পতাকার মাপ, রঙ, পতাকা উত্তোলনের নিয়মাবলি শিখিয়ে থাকেন। যা শিশুদের জন্য অনুকরণীয় একটি বিষয়। শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকে পতাকা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেয়া গেলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে এই ধ্যান ধারণা থেকে তার এই কর্মযজ্ঞ।
এ বিষয়ে মাধুরী বণিকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, সরকারি-আধাসরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ যেখানে সাপ্তাহিক বন্ধ ছাড়া জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হয়, সেখানে গিয়ে যদি দেখি জাতীয় পতাকায় কোনো ধরনের ভুলভ্রান্তি রয়েছে, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সাথে কথা বলে সেই পতাকা নামিয়ে ভালো পতাকার ব্যবস্থা করি। কারো সহযোগিতার ছাড়াই এ কাজ করতে পারেন তিনি। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ দিবস ও জাতীয় শোকদিবসে সাধারণত যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়; সেখানে অনেকেই ভুল করে বসেন। অর্থাৎ জাতীয় পতাকা উত্তোলনের স্থলে অর্ধনমিত রাখেন; আবার অর্ধনমিত রাখার স্থলে উত্তোলন করে রাখেন। সেখানে তিনি গিয়ে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কলাকোপা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল জানান, মাধুরী বণিক একজন নারী হয়েও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেভাবে কাজ করেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। ভালো কাজ করায় মাধুরী বণিককে আমাদের পক্ষ থেকে সব সময় সহযোগিতা দিয়ে থাকি।
এ ব্যাপারে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালাউদ্দিন মজনু বলেন, মাধুরী বণিককে সমাজ সংস্কারের জন্য অবিরত ছুটে চলা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি কেবল জাতীয় পতাকাই নয়, নারীর উন্নয়নে এ অঞ্চলে তার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আমরা আশা করব, তার এ কাজে প্রশাসনের যেকোনো ধরনের সহযোগিতা লাগে তা করার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।
মাধুরী বণিক জানান, আমরা সবাই কেবল পয়সার জন্য ছুটি। পয়সা ছাড়া কাজ করতে পারলে এক ধরনের আনন্দ আছে, সেই আনন্দই আমাকে পথ দেখা শিখিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে সুস্থ থাকলে মানুষ, মানবতার ও দেশের জন্য কাজ করে যাবো।


আরো সংবাদ