০৬ এপ্রিল ২০২০
আমিও বলতে চাই

রক্ত

-

নেইলকাটার খুঁজে না পেয়ে ব্লেড দিয়ে নখ কাটতে গিয়ে বাম হাতের আঙুল কেটে ফেলতেই চিরচির করে রক্ত ঝরতে শুরু করল। সে দৃশ্য দেখে মা বিচলিত হয়ে উঠলেন। স্যাভলন আর ব্যান্ডেজ কোথা থেকে বের করে এনে আমার সেবায় নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলেন। মাকে বললাম, ‘এত অস্থির হচ্ছো কেন? সামান্য রক্ত তো!’ মা আমাকে পাত্তা না দিয়ে বললেন, ‘চুপ থাকো। সামান্য রক্ত কই? এখানে অনেক রক্ত!’ বলেই মা ডাক্তারের মতো আঙুল ব্যান্ডেজ করে দিলেন। ততক্ষণে মায়ের চোখে পানিও। সব মা-ই বুঝি এমন! সন্তানের ব্যাপারে মায়েরা বড্ড অস্থির!
মা পুষ্পকে অর্ডার দিয়ে বললেন, ‘আমার ছেলের জন্য আপেল কেটে আনো জলদি।’ পুষ্প কিচেনে রান্নায় ব্যস্ত। এক বছর ধরে পুষ্প আমাদের বাড়িতে কাজ করে। সকাল-সন্ধ্যা পুষ্প সাংসারিক কাজে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার পরও মায়ের মন সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কোনো এক অজানা কারণে পুষ্পকে সহ্য হয় না মায়ের। সংসারের কাজে রাত-দিন ডুবে থাকলেও পান থেকে চুন খসলেই পুষ্পকে অপমান আর অপবাদের বলির পাঁঠা বানাতে মায়ের বিলম্ব হয় না। এ দেশের কাজের মেয়েদের জীবনযাত্রা সম্ভবত এমনই।
এক বাটি আপেল কেটে এনে দিয়ে পুষ্প আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। এক টুকরো আপেল হাতে নিতেই দেখি আপেলের এক কোণে লাল রক্তের দাগ। জানা গেল, পুষ্প আপেল কাটতে গিয়ে ওর আঙুল কেটে ফেলেছে। আপেলের গায়ে লেগে থাকা ওই রক্ত পুষ্পের।
তাকিয়ে দেখি, পুষ্পের আঙুল থেকে হালকা রক্ত ঝরছে। সেই রক্তময় আপেল না ধুয়ে আমাকে দেয়ার অপরাধে মা পুষ্পকে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে লাগলেন। ‘হারামজাদি, কোনো গুণই নেই তোর। সামান্য একটি আপেল কাটতে পারিস না! আবার রক্ত মাখানো আপেল আমার ছেলেকে খেতে দিলি! উজবুক মেয়ে কোথাকার!’ পুষ্প তর্ক না করে বিষণœœ মুখে দাঁড়িয়ে রইল।
আঙুল আমিও কেটেছি, পুষ্পও কেটেছে। অথচ মা আমাকে করছেন সেবাযতœ আর পুষ্পকে করছেন অবজ্ঞা। পুষ্প আমার আপন বোন হলে মা কী এমন আচরণ করতেন! নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু পুষ্প এই সংসারের সামান্য একজন কাজের মেয়ে। বাংলাদেশের কাজের মেয়েরা চিরকাল নির্যাতিত। তাদের সত্যিকারের মূল্যায়ন নেই। তাদের হাত কেটে রক্ত ঝরে ঝরুক। এই সমাজের প্রতিষ্ঠিত চোখগুলো সেই রক্ত দেখে সত্যি, কিন্তু মূল্যায়ন করে না।
জোবায়ের রাজু
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ