০৬ এপ্রিল ২০২০

শ্রম মেধা দক্ষতা ও কাজের প্রতি কমিটমেন্টই মানুষকে জীবনে বড় করে : ডা: হোসনে আরা বেগম মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট ও হ্যামাটোলজিস্ট, অরোরা মেডিক্যাল সেন্টার, ইউএসএ

-

ছায়া সুনিবিড় কুমিল্লা শহরতলির এক ছোট্ট মেয়ের নাম হোসেনে আরা বেগম। বাবা আবদুুল মজিদ ও মা মাহমুদা বেগম ছিলেন খুবই বিচক্ষণ। তাদের আট সন্তানের মধ্যে হোসনে আরা ছিলেন চতুর্থ। ছয় ভাই দুই বোনের মধ্যে ছোট বেলা থেকেই হোসনে আরা ছিলেন বেশ মেধাবী। পড়াশোনায় ভালো বলে বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়ে তাদের বড় হয়ে যেন মস্ত বড় ডাক্তার হয়। হোসনে আরাও বাবা-মায়ের আশা পূরণ করতে সদা সচেষ্ট ছিলেন। হোসনে আরা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই চলে এলেন ঢাকায়, ভর্তি হলেন কলেজে। তার আগেই বাবা ব্রেন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে থাকেন ১০ বছর। তিনি এক বছর কোনো কথাই বলেননি। বাবার এই অসুস্থতা কিশোরী হোসনে আরাকে ভীষণভাবে বিচলিত করতÑ কষ্ট পেতেন ভীষণ, কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারতেন না। যখন তিনি এইচএসসি পরীক্ষার্থী তখন বাবা চিরতরে এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান। বড় এক ভাইও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। অন্য দুই ভাইও উচ্চশিক্ষায় বিদেশে চলে যান। মা অন্য ভাইবোনদের নিয়ে অনেক কষ্ট করেই জীবন সংগ্রামে এগিয়ে চলেন। সব মিলিয়ে বাবার ইচ্ছা পূরণ ও বাবার মতো অন্যদের চিকিৎসা করে নিজের জীবনকে সার্থক করতে তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাস করেন। সেটা ১৯৮৪ সালের ১২তম ব্যাচ। কিছুদিন মিটফোর্ডে ছিলেন। তারপর সৌদি আরবে আট বছর পেশাগত জীবন কাটিয়ে ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। তিন বছর ইউনাইটেড স্টেট মেডিক্যাল লাইসেন্সি এক্সামের (টঝগখঊ) তিনটি পার্ট শেষ করেন। আরো তিন বছর মেডিসিনে রেসিডেন্সি করেন হেমাটোলজিতে। আর অনকোলজিতে ফেলোশিপ করেন আরো তিন বছর। তারপর ২০০২ সাল থেকে প্র্যাক্টিস শুরু করেন। আমেরিকার ইলিনয়ের ‘মার্সি হেলথ’-এ। পাঁচ বছর কাজ করেন ‘রকফোর্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালে।’ তিনি বর্তমানে অনকোলজিস্ট হিসেবে কর্মরত আছেনÑ অঁৎড়ৎধ গবফরপধষ ঈবহঃবৎ, যেটা ডরংপড়হংরহ শহরে অবস্থিত। বাংলাদেশের মতো একটা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের ডাক্তার হিসেবে আপনার অবস্থান কেমনÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রোগীরা আমাকে ভীষণ পছন্দ করে। কারণ চিকিৎসা শুধু শরীরের হয় না, মনেরও হয়। আর রোগীকে প্রথম কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে প্রস্তুত করে ক্যান্সারের মতো মরণ ব্যাধির চিকিৎসা শুরু করতে হয়। যারা মানসিকভাবে শক্ত-সবল থাকে, তারাই এই কঠিন রোগ থেকে নিষ্কৃতি পায়। আমার এমন শত শত রোগী আছে যারা আমার চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বহুদিন বেঁচে ছিলেন। তারা আমাকে খুবই সম্মান করেন। আমি দিন-রাত তাদের নিয়েই সময় কাটাই। আর বাবাকে ভীষণ মিস করি। এদের মধ্যেই আমার বাবাকে খুঁজে পাই। কয়েক বছর আগে আমি দেশে ফিরে ভাবছিলাম এখানেই থেকে যাই না কেনÑ আমি আমার দেশের মানুষের চিকিৎসা করি, কিন্তু দুর্ভাগ্য কেউ-ই আমাকে সাহস দিলো না, বললÑ এখানে বিদেশী ডাক্তারদের রিকগনাইজড করা হয় না। তারপরও ডেল্টা ক্লিনিকে এক বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। দেশের মানুষকে সেবা করার সুযোগ দেয়ার জন্য ডেল্টা কর্তৃপক্ষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
পেশাগত জীবনে সফল হতে হলে বিশেষ কোন দিকটায় মনোযোগ দেয়া দরকার বলে আপনি করেন Ñ তিনি বলেন, ‘শ্রম, মেধা, দক্ষতা ও কাজের প্রতি কমিটমেন্ট, সততা বস্তুত দায়িত্ববোধ না থাকলে মানুষ জীবনে বড় হতে পারে না। সবারই বিশ্ববিদালয়ে পাস হতে হবে তা নয়, বরং স্বশিক্ষিত হওয়াটাই বেশি প্রয়োজন। আমি তরুণ-তরুণীদের সবাইকে বলি, জীবনে আমরা এমন কিছু করব না, যার কারণে মাথা উঁচু করে চলতে পারব না। নতুন প্রজন্মের বোনদের উদ্দেশে বলতে চাইÑ ছোট-বড় চিন্তা না করে সবার জন্য একটা দরদি মন থাকা দরকার। অতীতে আমাদের উত্তরসূরিরা বহু ঝড় ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে কাজ করে গেছেÑ অথচ আমাদের জন্য তা অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আরো অনেক সজ হবে। সমাজে নারী-পুরুষ সমতা না নিয়ে যদি পথ চলতে হয়, তা হলে জীবনটাই বৃথা। আমার ভাগ্য ভালো, যেহেতু আমি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের উন্নত জীবনের সাথে পেশাগত সময়গুলো কাটিয়েছি, সে দিক থেকে আমার জীবনে কোনো বাধা আসেনি। ব্যক্তিগত জীবনে আমি ও আমার স্বামী মিজানুর রহমান (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার) খুব ভালো আছি। আমাদের পেশাগত জায়গাটা আলাদা হলেও আমরা সব কিছু ভাগাভাগি করে কাজ করি। অথচ আমাদের দেশে নারীকে সেভাবে মর্যাদা দেয়া হয় না। আমাদের দেশে নারীর মর্যাদা অনেকাংশে নির্ভর করে পুরুষ কর্তৃক আরোপিত নারীত্বের আচরণ যথাযথভাবে পালনের ওপর। আমাদের সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত নারীরা বাবা-মায়ের সংসারে মেহমান, বিয়ের পর শ্বশুরের সংসারে বহিরাগত সদস্য আর বিয়ের পর স্বামীর সংসার ত্যাগ করে যদি বাবা-মায়ের সংসারে যায়, তাহলে নারী হয়ে যায় বোঝা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানানÑ ‘আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটিতে জীবন যাপন করছি। অথচ বাবা আমার সেই কবে ইহধাম ত্যাগ করেছেন ১০ বছর প্যারালাইজড হয়ে। আগে প্রথমে ব্রেন স্ট্রোক, পরে কী কষ্টের জীবন কাটিয়েছেন। আমরা কেউ বাবার জন্য কিছুই করতে পারিনি। তাই আমি চাই দুই বছর পর দেশে ফিরে এসে দেশের মানুষের সেবা করব। তাহলে হয়তো বাবার আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।
সাক্ষাৎকার : আঞ্জুমান আরা


আরো সংবাদ