০৫ এপ্রিল ২০২০

আমাদের ভাষা আন্দোলন

-

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর মাত্র ১৪ দিনের মাথায় ১ সেপ্টেম্বর অসাধারণ কর্মকাণ্ডের অনন্য শক্তিধর পুরুষ অধ্য আবুল কাসেম প্রতিষ্ঠা করলেন ‘তমদ্দুন মজলিস’। ১৯ নম্বর আজিমপুরে তার বাসায়, ১৯৪৭-এর ১ সেপ্টেম্বর এই মজলিসের শুভ উদ্বোধন হয়। এ অধ্য আবুল কাসেম ছিলেন ভাগ্যবান ব্যক্তি। তার স্বপ্ন দেখার সূচনা পর্বেই তিনি পেয়ে গেলেন অসাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধি ও ঈমানের আলোকে ভাস্বর এক ঝাঁক প্রগতিবাদী তরুণ দল। এই তরুণরাই ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের অগ্রগামী ঘোড়ার সওয়ার। তাদের একজন অধ্যাপক আবদুল গফুর। অন্যদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক শাহেদ আলী, সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী, নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখ, ডক্টর মাহফুজুল হক, সাংবাদিক হাসান ইকবালসহ উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় আরও কিছু তরুণ ও বুদ্ধিজীবী। কাসেম ভাই ছিলেন চট্টগ্রামের ছেলে, প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত, মেধাবী এবং পরিশ্রমী। আমার বাবা তাকে খুব পছন্দ করতেন। আমাদের বাসায় মাঝে মধ্যে আসতেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ভারত-পাকিস্তান ভাগের আগ থেকেই। সদ্য কলকাতা থেকে এসে আমরা দুই বোন যখন পুরান ঢাকার মুসলিম গার্লস স্কুলে ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি তখন তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠার সূচনাতেই কাসেম ভাই বাবার অনুমতি নিয়ে আমাদের দুই বোনকে তমদ্দুন মজলিসের খুদে কর্মী বানিয়ে নিলেন। ১৯৪৭ থেকে গফুর ভাই যে লজিংবাড়িতে থাকতেন, সেই বাড়ির ছোট মেয়ে গফুর ভাইয়ের ছাত্রী নিলুফারও তখন মুসলিম গার্লস স্কুলের ছাত্রী। সেও গফুর ভাইয়ের মাধ্যমে তমদ্দুন মজলিসে কর্মী হয়েছিল। তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯ নম্বর আজিমপুর কিশোর, যুবক, নবীন-প্রবীণ নানা বয়সের লোকজনে সব সময় সরগরম থাকত। প্রতিদিন নানা কর্মসূচি থাকত। এ কর্মসূচিকে বাস্তবায়নের জন্য মাঝে মধ্যে জরুরি পদপে নিতেন, কাসেম ভাই ও তার সহযোগী গফুর ভাইয়েরা। তখন আমাদেরও ডাকতেন ছোট ছোট কাজে সাহায্য করার জন্য। তবে আমাদের তিনজনের ওপর পোস্টার সাঁটা ও ব্যানার লেখার দায়িত্বই বেশি থাকত।
এই কাজে আমরা খুব আনন্দ পেতাম। আরও মজা পেতাম যখন দেখতাম রান্না ঘরে কাঠের চুলায় বড় বড় হাঁড়িতে ভাত-তরকারি রান্না হচ্ছে। আর সেসব আঞ্জাম দিচ্ছেন কাসেম ভাইয়ের স্ত্রী রাহেলা আপা ও জামালি ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া ভাবী। এই দুই নারীর প্রাণময় ভালোবাসা, কান্তিহীন পরিশ্রম, প্রাণচাঞ্চল্য। বাড়িঘরত্যাগী তমদ্দুন মজলিসের কর্মীদের জন্য ছিল কর্মপ্রেরণার উৎস।
তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত তমদ্দুন মজলিসের যে স্বর্ণময় অধ্যায় সূচিত হয়েছিল তার পেছনে ছিল ১৯ নম্বর আজিমপুরের অন্দর মহলের নারীদের ঐতিহাসিক অবদান। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য তমদ্দুন মজলিস ‘সৈনিক’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশনা শুরু করে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ও জাতীয় জীবনে সৈনিকের বলিষ্ঠ ভূমিকা তমদ্দুন মজলিসের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে। আমার যতদূর মনে পড়ে এই সৈনিক পত্রিকার দায়িত্বে ছিলেন গফুর ভাই। ১৯৪৮ সালে আমার প্রথম লেখা গল্প গফুর ভাইয়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে গফুর ভাইয়ের নামের সঙ্গে আমি প্রথম পরিচিত হই। জানতে পারি তার ছাত্রজীবন ছিল অসাধারণ উজ্জ্বল। ১৯৫২ সালে গফুর ভাই সৈনিকের সম্পাদক ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সংগৃহীত তথ্য নিয়ে একটি বিশেষ শহীদসংখ্যা বের হলে ২৩ ফেব্রুয়ারির রাতে পুলিশ ১৯ নম্বর আজিমপুরের সৈনিক অফিস ঘেরাও করে। কাসেম ভাইয়ের স্ত্রী রাহেলা খাতুন ঘরের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থেকে পুলিশের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত থেকে কাসেম ভাই এবং গফুর ভাইকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। ওই দিন রাহেলা আপার তাৎণিক বুদ্ধিমত্তার জন্য বিশাল বিপদের হাত থেকে গফুর ভাইয়েরা রা পেয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার আনন্দে সমগ্র। বাঙালি জাতি আজ বেসামাল। গফুর ভাইয়েরা অর্ধবেলা খেয়ে না খেয়ে কাগজের বিছানায় রাত কাটিয়ে যে ভাষা আন্দোলনকে গতি দিয়েছিলেন তাদের নাম বাংলাদেশের বর্তমান শিতি বুদ্ধিজীবীরা নিতে দ্বিধাবোধ করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ও জাতীয় জীবনে যুবকদের চরিত্র গঠনের জন্য সৈনিকের বলিষ্ঠ ভূমিকা তমদ্দুন মজলিসের আরেকটি গৌরবময় অধ্যায়। বালিকা বয়স থেকে গফুর ভাইকে আমার খুব কাছাকাছি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। গফুর ভাই আমার ব্যক্তিগত জীবনেও একটি প্রেরণার উৎস। সৈনিকে তার হাতে আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় ছয় দশকেরও আগে।
আজকের এই সময়ে ভাষাকে যেভাবে বিকৃত করা হচ্ছে বিভিন্ন রেডিও, টিভি নাটক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। আমরা এ জন্যই কী ভাষা আন্দোলন করেছি! এই প্রশ্ন জাতির কাছে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে গেলাম।

 


আরো সংবাদ