০৬ এপ্রিল ২০২০

নারীরা স্বাধীনতার আলোয় আলোকিত হোক : শরিফা কার্লোস

ভিন দেশ
-

শরিফা কার্লোস। তিনি নওমুসলিমদের একজন সংগ্রামী নারী। সংগ্রামী বলা হচ্ছে এ কারণে যে, তিনি একজন স্পষ্টবাদী, স্পষ্টভাষী, উৎসাহী, সাহসী, নারীবিষয়ক আইনজীবী ইত্যাদি গুণের অধিকারী হিসেবে বিশ্বের দরবারে অতি পরিচিত মুখ। বিশেষ করে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এমনকি অন্য দেশগুলোর মানুষের কাছেও শরিফা রীতিমতো মডেল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
শরিফা কার্লোস একজন মার্কিন নাগরিক। বাংলা ভাষাভাষীদের সাথে তার খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু তিনি দেখেন, মুসলিমদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এত বেশি সুন্দর; যেগুলো অন্য ধর্মগুলোতে খুব একটা দেখা যায় না। তার মতে, ইসলাম শান্তি, ঐক্য ও সমৃদ্ধির ধর্ম। এসব দেখতে দেখতে ইসলামের অনুরাগী হতে থাকেন শরিফা কার্লোস।
তবে তার ইসলামের ছায়াতলে আসার সুন্দর বাস্তব গল্পও রয়েছে। আর তা হলো, ইসলামবিরোধী কিছু লোকের কুপরামর্শে তিনি একসময় তাদের সাথে এক হয়ে ইসলামের ক্ষতি করার পরিকল্পনা নেন। কিন্তু কে জানত, ইসলামবিরোধী এই মনোভাবই তাকে ভবিষ্যতে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসবে। পাশাপাশি তিনি অন্যদেরও এ ছায়াতলে আসার আহ্বান জানাবেন।
শরিফা কার্লোস বলেন, যারা আমাকে ইসলাম ধর্মের ক্ষতি করার প্ররোচনা দেয় তারা রীতিমতো কোনো ভাসমান দলের লোক। তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের মতলবে এসব করে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা এখনো এমন গর্হিত কাজ করে যাচ্ছে, যা অনেকে জানেই না। এমনো হতে পারে, তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদে চাকরি করত। তাদের নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অনেক সময় ব্যবহার করে নিজ নিজ পদ-পদবি। তারা মনে করে, এসব পদ-পদবি দেখে সাধারণ মানুষ তাদের প্রলোভনে ভালোভাবেই সাড়া দেবে। কিন্তু যারা এ সংক্রান্ত অনেক বিষয়ে ওয়াকিবহাল তারা ঠিকই বুঝতে পারে, এগুলো তাদের প্রলোভন ছাড়া অন্য ভালো কিছু নয়। তাদেরই একজন নওমুসলিম নারী শরিফা কার্লোস।
শরিফা কার্লোস বলেন, কেউ যদি ভুল করে কিংবা কারো প্রলোভনে পড়ে কোনো সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের ক্ষতির শিকার হয়, তবে সেখান থেকে ভালোভাবে কিংবা ক্ষতি ছাড়া বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ জন্য এসব বিষয় সম্পর্কে আগে থেকেই বুঝতে হবে আমাদের।
তিনি বলেন, প্ররোচনায় পড়ে আমি যে ইসলামের ক্ষতি করার চিন্তাভাবনা করি সেখান থেকে মহান আল্লাহ আমাকে হেফাজত করেন। মনে হলো, আল্লাহ চাইলেন, সত্যপ্রাপ্ত হই আমি। সে জন্য বলতে হয় আলহামদুলিল্লাহ। সবচেয়ে বড় শান্তি আজ আমি মুসলিম।
একদিন একজন মানুষ শরিফা কার্লোসকে মধ্যপ্রাচ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বিষয়ে অধ্যয়নের পরামর্শ দেন। তার বিনিময়ে একটি দূতাবাসে চাকরি পাওয়া যাবে। এ জন্য তাকে বলতে হবে আমেরিকার মুসলিম নারী বিষয়ে। আরেক কাজ হলো, মুসলিম নারীদের উৎসাহী করতে হবে ‘নারীবাদী আন্দোলনে’। তিনি বুঝতে পারলেন, এটি খুবই ভালো চিন্তা। টেলিভিশনেও তিনি মুসলিম নারীদের সুন্দর করে কথা বলতে দেখেছেন। তাদের অনেকেই দরিদ্র ঘরের সদস্য। ফলে নানা সমস্যায় জর্জরিত।
শরিফা বলেন, আমি যে বিষয়টা বেশি করে চাইতাম সেটি হলো, নারীরা স্বাধীনতার আলোয় আলোকিত হোক। এ জন্য আমারও অনেক কিছু করার আছে বলে মনে হচ্ছে। নারীদের শিক্ষিত ও সচেতন হতে হবে। আমিও কলেজে ভর্তি হই ভালো বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের জন্য। আমি পড়তে শুরু করলাম কুরআন, হাদিস, ইসলামের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে। এমনভাবে পড়ি যাতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে শুধু আমেরিকা নয়, সারা বিশ্বের নারীদের ওপর। কিভাবে বললে বা উপস্থাপন করে তা অল্প সময়ে ভালোভাবে বুঝবে সেটাই কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে আমার মনে হচ্ছে। অর্থাৎ সার্থক করতে হবে শ্রম।
শরিফা কার্লোস বলেন, আমি ক্রমেই উপলব্ধি করতে পারছি, আমি প্রভাবিত হচ্ছি ইসলামের শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে। তা আমার ভেতরে তৈরি করেছে একটি চেতনা। আমি পড়ালেখা চালিয়ে গেলাম নিজেকে ও নিজের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বা সমৃদ্ধ করার জন্য। এভাবে কেটে গেল বেশ কয়েক বছর। এ সময় আমি প্রশ্ন করতে থাকি (মুসলিমদের) তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে।
একবার তিনি (শরিফা) ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখান একজন লোকের কাছে। তিনি মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বা এমএসএ’র সদস্য। তিনি সহজে বুঝতে পারেন শরিফার দ্বীনের ব্যাপারে। তিনি শরিফাকে ইসলাম সম্পর্কে জানাতে গ্রহণ করেন নানা ব্যক্তিগত উদ্যোগ। ইসলামের প্রায় সব দিক নিয়ে আলোচনা করা হয় বর্তমান বিশ্বের আলোকে।
একদিন ওই ব্যক্তি শরিফাদের শহর ঘুরে দেখার জন্য একদল মুসলিমকে আসার জন্য আহ্বান জানান। তিনি তাদের সঙ্গে শরিফাকে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন বলে জানান। এতে শরিফা খুবই খুশি হন। শেষ পর্যন্ত তাদের সাথে সাক্ষাৎও হয় শরিফার। আগত মুসলিমরা শরিফাকে তাদের সাথে এশার নামাজ পড়ার আহ্বান জানান। তাতে মুহূর্তেই রাজি হন শরিফা। শরিফাকে বসার জায়গা করে দেন অতিথিরা। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বৃদ্ধলোক। তিনি তার মুখোমুখি হন। তার সাথে শরিফার কুরআনের বিভিন্ন বাণী ও শিক্ষা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয় দীর্ঘ সময়। তিনিই তাকে আমন্ত্রণ জানান মুসলিম হওয়ার।
শরিফা কার্লোস বলেন, আমি ইসলাম শুধু নয়, অন্যান্য ধর্ম নিয়েও অনুসন্ধান ও গবেষণা করেছি বেশ কয়েক বছর। কিন্তু কেউ আমাকে মুসলিম হওয়ার জন্য আহ্বান জানায়নি। তার পরও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে ভালো জানেন, এমন কিছু লোকের মুখে ইসলামের নানা দিক শুনে, তা বিচার বিশ্লেষণ করে আমার ভেতরে যেন ইসলামের বিষয়টি নাড়া দিয়েছে।
শরিফা আরও বলেন, আমি আগে থেকে জানতাম, ইসলাম ধর্মই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুন্দর ধর্ম। একপর্যায়ে ইসলামের অনুসারীরাই আমাকে আরবি ও ইংরেজি ভাষায় কুরআন শেখার আহ্বান জানায়। তাতে আমি সাড়া দিই। অর্থাৎ শুরু হলো কুরআন পাঠ। প্রথমেই পাঠ করি কালেমা শাহাদত। ইসলাম গ্রহণ এবং কলেমা পাঠের পর আমার এ সংক্রান্ত চমৎকার অনুভূতি হলো, যা আমি কাউকে বলে বুঝাতে পারব না। মনে হলো, দীর্ঘ দিনের না পাওয়া ভালো কিছু আমি পেয়ে ফেলেছি। আমার বুক খুব হালকা মনে হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিই জোরে জোরে। যেন আমি প্রথম নিঃশ্বাস নিচ্ছি জীবনে। তাই বলতে হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। আমাকে নতুন সুন্দর জীবন দান করেছেন মহান আল্লাহ। আমার এখন একটাই প্রার্থনা আর তা হলো বাকি জীবন যেন মুসলিম হিসেবে থাকতে পারি। মৃত্যুবরণ করতে পারি মুসলিম হিসেবেই।
শরিফা কার্লোস গর্বের সাথে বলেন, পরিস্থিতি যাতে আমার প্রতিকূলে না যায় সেজন্য আমি প্রথম প্রথম খ্রিষ্ট ধর্মের কাসে বসতাম। সবাইকে দেখাতাম, আমি খ্রিষ্ট ধর্মই চর্চা করি। কিন্তু অবস্থা ও সময় বুঝে ঠিকই ইসলাম সম্পর্কে জানতে নিজেকে নিয়োজিত করি। যা আমি খ্রিষ্ট ধর্মানুরাগীদের বুঝতে দিতাম না। শরিফা বলেন, আমি যে ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরাগী হতে থাকি তা সবাইকে বুঝতে দিইনি। কারণ এতে বাধার সম্মুখীন হতে পারতাম। অনেকে আমাকে এমন পরামর্শও দিয়েছিলেন।
বলা হয়েছে, এখনো বিশ্বের অনেক স্থানে নিপীড়িত মুসলিম নারীদের উসকানি দিয়ে সুন্দর ধর্ম ইসলামের ক্ষতি করতে দ্বিধা করেন না অনেকেই। অথচ মানুষ ভুলে যায়, মৃত্যুর স্বাদ আসবে প্রতিটি মানুষের। পুরো প্রতিদান দেয়া হবে বিচার দিবসে। দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী, পরকালের জীবন স্থায়ী। মহান আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করলে পরকাল সুন্দর হবে। আমরা কেউ জানি না, কবে আমাদের মৃত্যু হবে। অথচ মহান আল্লাহ সবই জানেন, সবই করেন। অদেখা জ্ঞানের বিষয়গুলো শুধু আল্লাহই জানেন। এসব বিষয়ের সাথে একমত শরিফা কার্লোস। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন ২০০৭ সালে।


আরো সংবাদ