০৪ এপ্রিল ২০২০

নিশ্চিত হোক কন্যা শিশুর নিরাপত্তা

-

আমাদের দেশে বয়ঃসন্ধিকালে প্রায় ৬০ শতাংশ মেয়েশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয় বলে জানিয়েছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। অতি সম্প্রতি ফোরামের এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে গবেষকদের অভিমত, বয়ঃসন্ধিকালে যৌন হয়রানির কারণে দেশে বাল্যবিয়ের হার হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামে মাঠ জরিপে অংশ নেয়া শতভাগ নারীই মনে করেন, পাবলিক পরিসরে ও অফিস-আদালতে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির বিচারে পৃথক আইন প্রণয়ন আবশ্যক।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বয়ঃসন্ধিকালে অনাকাক্সিক্ষত যৌন সংস্পর্শের কারণে মেয়েশিশুদের পরবর্তী যৌন জীবন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে ট্রমার মধ্য দিয়ে বয়ঃসন্ধিকালে প্রায় মেয়েশিশু বড় হয়, সেখানে আচরণে স্বাভাবিকত্ব লোপ পাওয়ার শঙ্কা থাকে অনেকাংশে।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম সম্প্রতি ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৩৯২ জন নারীর ওপর জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে অংশ নেয়া ৩৯২ নারীর মতামতের ভিত্তিতে জরিপে দেখানো হয়েছেÑ ৫৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ নারী ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যেই পাবলিক প্লেসে জীবনে প্রথমবারের মতো যৌন হয়রানির শিকার হয়। ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ নারী ছয় বছর বয়সের আগেই এবং ১৫ দশমিক ২৬ শতাংশ নারী ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে জীবনে প্রথমবারের মতো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন। অল্প বয়সেই এমন অনাকাক্সিক্ষত তিক্ত অভিজ্ঞতা তাদের পরবর্তী যৌন জীবনে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলে।
পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির প্রবণতা প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে দাবি করেন গবেষণার সাথে জড়িত জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি। তার দাবি, ‘বাজার, ডাক্তারের চেম্বার, ধর্মীয় উপাসনালয়Ñ যেখানেই যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ইঙ্গিতের মাধ্যমে ঘটেছে এমন নয়, শারীরিক স্পর্শের মধ্য দিয়েও গেছে।’
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক জানান, যেখানে মেয়েশিশু বা নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেখানে উপস্থিত অন্য পুরুষদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল এ প্রশ্নে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, ওই সব ঘটনার সময় ৬৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ পুরুষ নীরব, সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। আর ১১ শতাংশ পুরুষ অনেকটা নির্যাতনকারীর পক্ষেই কথা বলেছেন বা সাফাই গেয়েছেন। তবে ২৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ পুরুষ নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বা মৃদু অথবা শক্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়েছেন। অনেক সময় নারীর ওপর যৌন হয়রানির প্রতিবাদে যে পুরুষরা সোচ্চার হয়েছেন, তারা নানাভাবে হয়রানির শিকারও হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সমন্বিত আইন প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণ বলছে, বয়ঃসন্ধিকালে অনাকাক্সিক্ষত যৌন হয়রানির ঘটনা ঠেকাতে না পারার কারণে বাল্যবিয়ে কমানো যাচ্ছে না। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনামূলক নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হলেও এর পরিধি আরো ব্যাপক।
অভিজ্ঞদের মতে, ‘নারীর চলাচল সহজ করতে হবে। নতুবা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। নারীর বাইরের জগৎ নিরবচ্ছিন্ন করতেই হবে। নতুবা আমরা আর্থিক ও জাতিগতভাবে অনেক পিছিয়ে যাবো। একটা মেয়েশিশু এ সমাজে বড় হয়ে ওঠার পথে তার চারপাশে তার অগ্রজ নারীদের যেভাবে দেখেছে, সেটাকেই সে স্বাভাবিক হিসেবেই ভেবে নেয়। তাকে ছোটবেলা থেকে শেখানো প্রয়োজন, কোন আচরণগুলো নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে এবং ওই নির্যাতন প্রতিরোধে তার কী করা উচিত। এ ছাড়া কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় তা তাকে শেখাতে হবে। তবেই হ্রাস পাবে নারী তথা কন্যাশিশু নির্যাতন-নিপীড়ন।
কিভাবে বয়ঃসন্ধিকালে অনাকাক্সিক্ষত যৌন হয়রানি থেকে মেয়েশিশুকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে কেউই কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ মেয়েশিশুদের দিচ্ছেন না। ফলে দিন দিন মেয়েশিশুদের মনে এ নিয়ে ভীতির সঞ্চার হচ্ছে। মেয়েশিশুদের অনাকাক্সিক্ষত যৌন হয়রানি থেকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে কার্যকর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছেলে ও মেয়েশিশুদের শেখাতে হবে পরস্পরের সাথে কোন আচরণগুলো একেবারেই করা যাবে না। কোন আচরণগুলো ছেলে ও মেয়েশিশুদের ভবিষ্যৎ বিনষ্ট করবে এবং কোন আচরণগুলো নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। মেয়েশিশুরা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে নিজেদের কিভাবে রক্ষা করবে বা আত্মরক্ষার কৌশল, দক্ষতা ও প্রতিকারের পদ্ধতি সম্পর্কে বাল্যকালেই শিক্ষা দিতে হবে। বাল্যকালেই শিক্ষা দিতে হবে ছেলে ও মেয়েদের সম মর্যাদা ও অধিকারের পুরো বিষয়গুলো। একটি মেয়েশিশু যেন কোনো অবস্থায়ই অন্যের দ্বারা ঘটানো কোনো নির্যাতনকে মেনে নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখার কৌশল অবলম্বন না করে, সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রারম্ভেই প্রতিটি ছেলে ও মেয়েকে তার প্রতিটি আচরণ যেন দায়িত্বশীল হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে এবং প্রতিটি শিশুকে আচরণের তারতম্যের কারণে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই মানসিকতাসম্পন্ন শিশুকে গড়ে তুলতে প্রথমেই শিশুদের নিজের পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।
এ ব্যাপারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কমিউনিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইক্রিয়াট্রি বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বয়ঃসন্ধিকালে যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জনসম্মুখে যৌন হয়রানি করা পুরোপুরি অস্বাভাবিক আচরণ। পাবলিক প্লেস বা উন্মুক্ত স্থানে নারীকে যৌন হয়রানি করা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও যৌনবিকৃতির নিকৃষ্ট উদাহরণ। নারীদের বিকাশের যে কয়েকটি স্তর আছে, তার মধ্যে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কালে প্রতিটি মেয়েশিশু বিভিন্ন দিক থেকে পরিণত হতে শুরু করে এবং দ্রুত বিকাশ ঘটে। এই সময় হরমোনজনিত নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে মেয়েশিশুকে পরিবেশ ও প্রতিবেশের সাথে সমন্বয় সাধন করা শিখতে হয়। সে সময় যদি কোনো মেয়েশিশু অনাকাক্সিক্ষত যৌন সংস্পর্শের শিকার হয় বা যৌন হয়রানির মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, তবে তার বাকি জীবনে সে আর ইতিবাচকভাবে ভাবতে শিখবে না বা শিখতে পারবে না। যার কারণে আমরা আর্থিকভাবে ও জাতিগতভাবে অনেক পিছিয়ে পড়ব। তাই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে সবাইকে।


আরো সংবাদ