০৬ এপ্রিল ২০২০

এই সব নাদিয়ারা

-

ইফতারির ঘণ্টাখানেক পর কলিংবেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে দেখি রাহেলার নাতনি আকলিমা।
-- কিরে এই সময় তুই।
-- আফা নানী কইছে অহন আর কামে আইব না। মায় অসুস্থ।
খবরটা শুনে দরজা বন্ধ করে ভেতরের রুমে আসি। রাহেলা আমার বাসায় ছুটা কাজ করে, ওর মেয়ে নাদিয়া স্বামী সন্তান নিয়ে থাকে পাশেই। নাদিয়াও কয়েক বাসায় ছুটা কাজ করে। রাহেলা কাজে আসে ইফতারের পরপরই। মিনিট দশ পরে আকলিমা এসেই ওকে কী বলে ডেকে নেয়।
হঠাৎ মনে হয় কয়েক দিন আগে রাহেলা বলেছে নাদিয়ার পেটে বাচ্চা এসেছে, বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ খেয়েছে। কথাটা মনে হতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তবে কি নাদিয়া সেই সমস্যায় অসুস্থ। মোবাইল হাতে করে বের হয়ে যাই, তিনটা বাড়ি পরেই নাদিয়াদের বাসা। বাসা বলতে ওর স্বামী সে বাড়ির দারোয়ান, সেভাবেই সিঁড়ির নিচের রুমে ওরা থাকে।
গিয়ে দেখি নাদিয়া রুমের কোনায় বসে আছে পেট চেপে ধরে। যা জানা গেল,
সন্তান নষ্ট হওয়ার জন্য ওষুধ খেয়েছে। ব্লিডিং শুরু, ২-৩ দিন পর আবার ব্লিডিং বন্ধ হওয়ার ওষুধ খেয়েছে। কিন্তু আর বন্ধ হচ্ছে না। প্রচণ্ড ব্যথায় সে কোঁকড়াচ্ছে। বললাম,
-- মেয়েকে বাঁচাইতে চাইলে এখনই ডাক্তারের কাছে যাও। গাইনি ডাক্তার দেখাও।
রাহেলা বলে,
-- আফা আপনি বুদ্ধি দেন কি করব, কার কাছে নেবো।
-- আগে তো জিগাওনি, এখন বুদ্ধি চাইছ। বুদ্ধি দিতে পারব, নিতেও পারব, টাকা জোগাড় করো। আমি বাসায় যাচ্ছি পাঁচ মিনিটের মাঝে বের হবো, মেয়েকে নিয়ে বের হও।
কথাটা বলে বাসায় এসে নিজের ছোট সাইড ব্যাগটা নিয়ে বের হই। ততক্ষণে ওরাও বের হয়। একটা রিকশায় তুলে নিয়ে আসি হাসপাতালে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে নাদিয়ার শরীরের নিচের অংশ। ডা: এশার সিরিয়ালের অপেক্ষা না করে সোজা রুমে যাই।
-- আপা ইমার্জেন্সি ওকে দেখতে হবে।
ডাক্তার আপা সব শুনে সামান্য পরীক্ষা দেয় আর ওকে একটা ইনজেকশন দেয়। হাতের কয়েকটা রোগী দেখেই তিনি নাদিয়াকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে যাবেন। এই ফাঁকে ওর পরীক্ষাগুলো করিয়ে নিই। আর রক্তের গ্রুপও জেনে নিই। নাদিয়ার শরীরে রক্তস্বল্পতা আছে। গ্রুপ জেনে দেখলাম আমার সাথেই মিলে গেছে। যাক রক্তের প্রয়োজন হলে আমিই দিতে পারব।
রাত সাড়ে ১০টায় ডাক্তার আপা চেম্বার থেকে আসেন ওটিতে। চেকআপ করে জানান দ্রুত এমআরআই করতে হবে। আপাকে বললাম,
-- যা করা দরকার আপনি করেন।
প্রায় ৪৫ মিনিট পর আপা ওটি থেকে বের হন। বলেন,
-- নাদিয়ার গর্ভে পাঁচ মাসের পুত্রসন্তান। ওষুধ খাওয়ার ফলে ব্লিডিং শুরু হয়, আর বন্ধ হয়নি। পচা দুর্গন্ধ ভেতরে।
অপারেশনের ট্রেতে করে সেই বাচ্চা আনা হয় দেখানোর জন্য। কিন্তু আমার দেখার সাহস হয়নি। পুরো দুই ঘণ্টা ওকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তখন রাত ১২টা। ডাক্তার বলেছেন, দুইটা-আড়াইটা বাজবে ওর জ্ঞান ফিরতে। জ্ঞান ফিরলেই নিতে পারবেন। তবে ভর্তি রাখা লাগবে না।
রাহেলা আর ওর জামাইসহ সবাই বলল আমাকে থাকতেই হবে সে পর্যন্ত। এর মাঝে এলাকার অন্য বুয়ারা এসে হাজির। সবাই আমাকে দেখে অবাক হয়। নাদিয়াকে নিয়ে আমিই এসেছি। কেউ আসে কেউ যায় আর আমি অপেক্ষায় বসে আছি অপেক্ষাগারে। নাদিয়ার বয়স আঠারো হয়েছে মাত্র, এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র করতে পারেনি অথচ সে তিন সন্তানের মা। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নাকি শিশুই থাকে, তাহলে এক শিশুর কোলে আরো তিন শিশু। রাত ২টায় নাদিয়ার জ্ঞান ফেরে। স্বাভাবিক করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত আড়াইটা। ওদের বাসায় দিয়ে নিজে ঘরে আসি। দ্রুত গোসল সেরে সেহেরির ভাত বসিয়ে সবাইকে সেহেরি খেতে দিই। নামাজ পড়ে বিছানায় আসি। চোখে ঘুম আসে না নাদিয়ার কথা ভেবে।


আরো সংবাদ