০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৬৯তম বার্ষিকী আজ, কী ঘটেছিল সেদিন

আয়া সোফিয়া মসজিদ। - ছবি : সংগৃহীত

১৪৫৩ সালের আজকেই এই দিনে অর্থাৎ ২৯ মে ওসমানিয়া সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ বাইজেন্টাইন (রোম) সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমানে ইস্তাম্বুল) জয় করেন। আর এর মাধ্যমেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন বা সমাপ্তি সম্পন্ন হয়।

শহরটি অধিকারের পূর্বে এটি ১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল থেকে ২৯ মে পর্যন্ত অবরোধের সম্মুখীন হয়। এরপর চূড়ান্তভাবে শহরটি ওসমানিয়াদের অধিকারে আসে। 

কনস্টান্টিনোপল বিজয়কে ১৫ শ’ বছরের মতো টিকে থাকা রোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মূলত এই বিজয়ের ফলে ওসমানিয়া সেনাদের সামনে ইউরোপে অগ্রসর হওয়ার পথে সব বাধাই দূর হয়ে যায়। অন্যদিকে, কনস্টান্টিনোপলের এই পতনই ছিল খ্রিস্টানজগতে বিরাট ধাক্কার মতো।

বিজয়ের পর সুলতান মোহাম্মদ তার রাজধানী এড্রিনোপল থেকে কনস্টান্টিনোপলে স্থানান্তরিত করেন। শহরটি অবরোধের আগে ও পরে শহরের বেশ কিছু গ্রীক ও অগ্রীক বুদ্ধিজীবী পালিয়ে যাযন। তাদের অধিকাংশই ইতালিতে চলে যাযন এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁতে সাহায্য করেন।

সেইসাথে বেশ কিছু ইতিহাসবিদ কনস্টান্টিনোপলের বিজয় ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনকে মধ্য যুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখেন।

যেভাবে প্রস্তুতি
১৪৫১ সালে সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ তার পিতার উত্তরাধিকারী হন। ১৯ বছর বয়সে সিংহাসনে বসায় শাসক হিসেবে তরুণ মোহাম্মদ অযোগ্য হবেন এবং বলকান ও এজিয়ান অঞ্চলের খ্রিস্টানদের জন্য কোনো রকম হুমকি হবেন না বলেই তখন ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল। তার দরবারে পাঠানো দূতদের সাথে মোহাম্মদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এই ধারণাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু মোহাম্মদের কাজ তার কথার চাইতেও অধিক তীব্র বলেই প্রমাণিত হয়।

১৪৫২-এর শুরুতে তিনি বসফরাসে রুমেলি হিসারি নামক দ্বিতীয় ওসমানিয়া দুর্গ গড়ে তোলেন। কনস্টান্টিনোপলের কয়েক মাইল উত্তরে ইউরোপীয় অংশে এই দুর্গ গড়ে তোলা হয়। তার প্রপিতামহ প্রথম বায়েজিদও আনাদোলু হিসারি নামে অনুরূপ একটি দুর্গ তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল এশীয় অংশে অবস্থিত।

এই দুর্গ দুটির কারণে তুর্কিরা বসফরাসে চলমান নৌযানের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়। বিশেষত এটি উত্তরে কৃষ্ণ সাগর উপকূলের জেনোভা কলোনি থেকে কনস্টান্টিনোপল আসার পথে বাধা প্রদান করে। কৌশলগত অবস্থানের কারণে নতুন দুর্গকে ‘বোগাযকেসেন’ বলা হতো, যার অর্থ ‘প্রণালি-রুদ্ধকারী’ বা ‘গলা-কর্তনকারী’।

১৪৫২ সালের অক্টোবর সুলতান মোহাম্মদ তুরাখান বেগকে পেলোপন্নিসের উদ্দেশে বিরাট এক নৌবহর নিয়ে অভিযানের নির্দেশ দেন এবং আসন্ন কনস্টান্টিনোপল অবরোধের সময় যাতে থমাস ও ডেমেট্রিওস তাদের ভাই সম্রাট একাদশ কনস্টান্টাইন পেলেইওলোগসকে সাহায্য করতে না পারেন সে লক্ষ্যে সেখানে অবস্থানের নির্দেশ দেন।

বাইজেন্টাইন সম্রাট একাদশ কনস্টান্টাইন সুলতান মোহাম্মদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন এবং পশ্চিম ইউরোপের কাছে সাহায্য চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু শতাব্দীব্যাপী যুদ্ধ ও পূর্ব ও পশ্চিমের চার্চের মধ্যকার বিরোধের ফলে কাঙ্খিত সাহায্য পাওয়া যায়নি।

১৪৫২ সালের গ্রীষ্মে রুমেলি হিসারি (দুর্গ) নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর বাইজেন্টাইন্দের জন্য ঝুঁকি খুবই নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। ইউনিয়ন ব্যবস্থা চালু করা হবে-এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে কনস্টান্টাইন পোপকে চিঠি লেখেন। পোপ পঞ্চম নিকোলাস সুযোগ ব্যবহারে আগ্রহী থাকলেও কাঙ্খিত সাহায্য পাওয়া যায়নি। তবে কিছু পশ্চিমা ব্যক্তিত্ব তাদের নিজ উদ্যোগে শহর রক্ষায় এগিয়ে আসেন। তাদের অন্যতম হলেন- জেনোভার সৈনিক জিওভান্নো জিসটিনিয়ানি। তিনি ১৪৫৩-এর জানুয়ারিতে ৭০০ সৈনিক নিয়ে উপস্থিত হন।

দেয়ালঘেরা শহর রক্ষায় তার দক্ষতার জন্য সম্রাট তাকে দেয়ালের প্রতিরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করেন। একই সময় গোল্ডেন হর্নে অবস্থানরত ভেনিসিয়ান জাহাজগুলো ভেনিসের অনুমতি ছাড়াই সম্রাটকে তাদের দায়িত্ব গ্রহণের আগ্রহ জানায়। পোপ নিকোলাস তিনটি জাহাজ সাহায্যের জন্য পাঠান। এগুলো মার্চের শেষের দিকে যাত্রা করে।

ইতোমধ্যে ভেনিসে এ বিষয়ে আলাপ শুরু হয় যে, তারা কনস্টান্টিনোপলকে কী ধরনের সাহায্য প্রদান করবে। সিনেটে একটি নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এতে দেরি হয়ে যায়। এপ্রিলে যখন এটি যাত্রা করে, তখন যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য যথেষ্ট দেরি হয়ে যায়। একই সময় কনস্টান্টাইন উপহার প্রদানের মাধ্যমে সুলতানকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার দূতকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ফলে সে চেষ্টাও ব্যাহত হয়। ফলে বাইজেন্টাইনদের কূটনীতিতে কাজ হয়নি।

এদিকে, গোল্ডেন হর্ন থেকে নৌ-হামলার আশঙ্কা থেকে সম্রাট কনস্টান্টাইন পোতাশ্রয়ের মুখে একটি শিকল লাগানোর আদেশ দেন। এই শিকল যে কোনো তুর্কি জাহাজকে আটকানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। বিদেশী সাহায্য আসার আগ পর্যন্ত অবরোধের সময় বৃদ্ধির ব্যাপারে বাইজেন্টাইনরা যে দুটি কৌশলের ওপর নির্ভরশীল ছিল- এটি তার অন্যতম। ১২০৪ সালের চতুর্থ ক্রুসেডের সময় শত্রুরা গোল্ডেন হর্নের দিক থেকে দেয়াল ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়।

কার শক্তি কেমন
কনস্টান্টিনোপলের প্রতিরক্ষার জন্য নিয়োজিত বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এতে সর্বমোট ৭ হাজার সৈনিক ছিল, যাদের মধ্যে ২ হাজারই ছিল বিদেশী। অবরোধকালে আশপাশের এলাকা থেকে আগত শরণার্থীসহ মোট ৫০ হাজারের মতো মানুষ ছিল বলে ধারণা করা হয়। সম্রাটের বেতনভুক্ত তুর্কি কমাণ্ডার ডোরগানো বেতনভুক্ত কিছু তুর্কিদের সাহায্যে সমুদ্রের পার্শ্ববর্তী শহরের একটি অংশ রক্ষার দায়িত্ব পান। এই তুর্কিরা সম্রাটের প্রতি অনুগত থাকে এবং পরবর্তী লড়াইয়ে প্রাণ হারায়।

অন্যদিকে ওসমানিয়রা লোকবলের দিক থেকে ছিল ব্যাপক সংখ্যক। সাম্প্রতিক গবেষণা ও ওসমানিয়া আর্কাইভের তথ্য থেকে জানা যায় যে, ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার উসমানীয় সৈন্য এতে অংশ নেয়। এদের মধ্যে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার জেনিসারি বাহিনী ছিল। জেনিসারিরা হলো- উচ্চশ্রেণির পদাতিক সেনা। সেইসাথে হাজার হাজার খ্রিস্টান সৈনিক, যাদের মধ্যে সার্বিয়ান নেতা ডুরাড ব্রানকোভিকের পাঠানো ১৫ শ’ সার্বিয়ান অশ্বারোহীও যুদ্ধে অংশ নেয়।

সুলতান মোহাম্মদের প্রতি আনুগত্য হিসেবে এই সেনাদের পাঠানো হয়। যদিও এর কয়েকমাস পূর্বেই কনস্টান্টিনোপলের দেয়াল পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থ পাঠিয়েছিলেন ব্রানকোভিক। অন্যদিকে, অবরোধের সমসাময়িক পশ্চিমা সাক্ষীরা সুলতানের সামরিক ক্ষমতার বর্ণনা দিয়েছে অনেকটা অতিরঞ্জিত করেই।

ওসমানিয়া সেনাবিন্যাস ও কৌশল
সুলতান মোহাম্মদ সমুদ্রের দিক থেকে শহর অবরোধের জন্য একটি নৌবহর গড়ে তোলেন। এটি অংশত গেলিপোলির গ্রিক নাবিকদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। সমকালীন হিসাবমতে, ওসমানিয়া নৌবহরে জাহাজ সংখ্যা ছিল ১০০টি। তবে আধুনিককালের আরো বাস্তবিক হিসাব মতে নৌবহরে ১২৬টি জাহাজ ছিল। নৌবহরটি বিশেষত ৬টি বৃহৎ জাহাজ, ১০টি সাধারণ জাহাজ, ১৫টি ছোট জাহাজ, ৭৫টি বড় নৌকা এবং ২০টি ঘোড়া পরিবহনে সক্ষম এমন নৌকা দ্বারা গঠিত হয়।

ওসমানিয়রা যে সে সময় মাঝারি আকারের কামান তৈরিতে দক্ষ- একথা অবরোধের আগে সবার জানা ছিল। কিন্তু গোলা ছোড়ার পাল্লা প্রতিপক্ষের ধারণার বাইরে চলে যায়। অস্ত্রের ক্ষেত্রে ওসমানিয়দের এই সক্ষমতা উরবান নামক এক হাঙ্গেরিয়ান (কারো মতে জার্মান) ব্যক্তির কারণে সম্ভব হয়। তার নকশা করা একটি কামানের নাম ছিল ‘শাহি’। যার দৈর্ঘ্য ছিল ২৭ ফুট (৮.২ মি) এবং এটি ৬০০ পাউন্ডের (২৭২ কেজি) একটি গোলা প্রায় এক মাইল (১.৬ কিমি) দূরে ছুড়ে মারতে পারত।

উরবান প্রাথমিকভাবে বাইজেন্টাইনদের অধীনে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা তার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে অক্ষম ছিল। এরপর উরবান কনস্টান্টিনোপল ত্যাগ করেন এবং সুলতান মোহাম্মদের কাছে যান। তিনি দাবি করেন যে, তার অস্ত্র ব্যাবিলনের দেয়ালকে উড়িয়ে দিতে পারে। পর্যাপ্ত অর্থ ও উপাদান লাভের পর এড্রিনোপলে তিনি তিন মাসের মধ্যে কামান নির্মাণ করেন। এখান থেকে ৬০টি ষাঁড়ের সাহায্যে এটি কনস্টান্টিনোপলে নিয়ে যাওয়া হয়। উরবান তুর্কি বাহিনীর জন্য অন্যান্য কামানও নির্মাণ করেন।

উরবানের কামানে কিছু ত্রুটিও ছিল। এটি পুন:রায় ব্যবহার করতে তিন ঘণ্টা সময় লাগত। কামানের গোলার সরবরাহ খুবই কম ছিল। বলা হয় যে, কামানটি ছয় সপ্তাহ পর আপনা থেকেই অকেজো হয়ে যায়। তবে এই বিষয়টি বিতর্কিত। ১৫০ মাইল (২৪০ কি.মি.) দূরে অস্ত্র কারখানা হওয়ায় সুলতানকে বিশাল কামানকে বহনের জন্য বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়। বলা হয় যে, উরবানের এই কামানকে বহন করতে ৬০টি ষাঁড় ও ৪০০ মানুষ প্রয়োজন হয়েছিল।

সুলতান মোহাম্মদ থিওডোসিয়ান দেয়াল আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। এই দেয়ালগুলো কনস্টান্টিনোপলকে পশ্চিম দিকের আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। শুধু পানিবেষ্টিত অংশই দেয়াল ঘেরা ছিল না। ১৪৫৩ এর ২ এপ্রিল ইস্টারের পরের দিন তার সেনারা শহরের বাইরে অবস্থা নেয়।

ওসমানিয়া সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ গোল্ডেন হর্নের দক্ষিণে অবস্থান নেয়। কারাদজা পাশার অধীনস্থ নিয়মিত ইউরোপীয় সেনারা দেয়ালের পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আনাতোলিয়ার নিয়মিত বাহিনী ইশাক পাশার নেতৃত্বে দক্ষিণে লুকাস থেকে মারমারা সাগর পর্যন্ত অবস্থান নেয়। সুলতান মোহাম্মদ নিজে তার লাল ও সোনালি তাবু স্থাপন করে ‘মেসোটেচিওনের’ কাছে অবস্থান নেন। এখানে কামান ও জেনিসারিরা অবস্থান নিয়েছিল। বাশি-বেজোক নামের সেনারা প্রথম সারির পেছনে অবস্থান নেয়। জাগান পাশার অধীনস্থ অন্যান্য সেনারা হোল্ডেন হর্নের উত্তরে অবস্থান নেয়। গোল্ডেন হর্নের জলার উপর নির্মিত একটি রাস্তার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো।

বাইজেন্টাইন সেনাবিন্যাস ও কৌশল
শহরটি প্রায় ২০ কি.মি. দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। এটি ছিল সে সময়ের অন্যতম মজবুত দেয়াল। কিছুকাল পূর্বে অষ্টমজন পেলেইওলোগস এটির সংস্কার করেন। দেয়ালের অবস্থা যথেষ্ট ভাল ছিল। ফলে বাইজেন্টাইনদের ধারণা ছিল পশ্চিমা সাহায্য আসার আগ পর্যন্ত তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে। তার ওপর প্রতিরক্ষাকারীরা ২৬টি জাহাজের একটি নৌবহর দ্বারা শক্তিপ্রাপ্ত ছিল। এর মধ্যে ৫টি জেনোভা, ৫টি ভেনিস, ৩টি ভেনিসিয়ান ক্রিট, ১টি আনকোনা, ১টি আরাগন, ১টি ফ্রান্স থেকে ও প্রায় ১০টি বাইজেন্টাইনদের জাহাজ ছিল।

৫ এপ্রিল সুলতান মোহাম্মদ তার শেষ সেনাদল নিয়ে পৌঁছলে বাইজেন্টাইনরা তাদের অবস্থান গ্রহণ করে। সংখ্যার অপ্রতুলতার কারণে দেয়ালের সব অংশে অবস্থান নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না বিধায় সিদ্ধান্ত হয় যে, শুধু বাইরের দেয়ালে সেনা মোতায়েন করা হবে। কনস্টান্টাইন ও তার গ্রিক সেনারা দেয়ালের মাঝের অংশ রক্ষায় অবস্থান নেয়। দেয়ালের এই অংশটিকে সবচেয়ে দুর্বল অংশ হিসেবে দেখা হতো এবং এই দিক থেকে আক্রমণের আশঙ্কা বেশি ছিল। জিসটিনিয়ানি সম্রাটের উত্তর দিকে অবস্থান নেন।

পরবর্তীতে অবরোধ চলার সময় তিনি সম্রাটের অবস্থানের জায়গায় চলে আসেন। তার পূর্বের অবস্থানে বোকিয়ারডি ভাইদের দায়িত্ব দেয়া হয়। মিনট্টো ও তার ভেনিসিয়ানরা ব্লেচারনে প্রাসাদে টিউডোরো কেরিসটো, লেনগেসকো ভ্রাতৃবৃন্দ ও আর্চবিশপ লিউনার্দো অব চিওস এর সাথে অবস্থান নেন। সম্রাটের বাম পাশে কিছুটা দক্ষিণে সেনানায়ক কাটানিও ও জেনোভার সৈনিকেরা এবং গ্রীক সৈনিকদের সাথে অবস্থানরত থিওফিলিস পেলেইওলোগস অবস্থান করছিলেন। দেয়ালের একটি অংশে ভেনিসিয়ান ব্যক্তি ফিলিপ্পো কনটারিনি এবং সর্বদক্ষিণে ডিমিটরিয়াস কেন্টাকুজেনাস অবস্থান নেন। সমুদ্রের দেয়ালে অপেক্ষাকৃত কম সৈনিক মোতায়েন করা হয়। স্টেডিয়ানে জেকোবো কনটারিনি, তার বাম পাশে গ্রীক পুরোহিতদের একটি দল এবং এলিউথেরিয়াস পোতাশ্রয়ে যুবরাজ ওরহানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। জেনোয়াস ও কাটালান সৈনিকদের সাথে পিরে জুলিয়া প্রাসাদে অবস্থান নেন। কিয়েভের কার্ডিনাল ইসিডর উপদ্বীপের প্রান্তে অবস্থান নেন।

দক্ষিণ উপকূলের সমুদ্র দেয়ালগুলোতে গেব্রিয়েল ট্রেভিসানোর অধীন ভেনিসিয়ান ও জেনোয়ার নাবিকরা পাহারার দায়িত্ব পালন করে। কৌশলগত কারণে শহরের ভেতর দুটি রিজার্ভ বাহিনী রাখা হয়। এর একটি হলো- লুকাস নটরাসের অধীনে পেট্রায় ও অন্যটি নিসেফোরোস পেলেইওলোগসের অধীনে চার্চ অব দ্য হলি এপস্টলসের কাছে। ভেনিসিয়ান কমান্ডার আলভিসো ডিয়েডো পোতাশ্রয়ের জাহাজগুলোকে নেতৃত্ব দেন। বাইজেন্টাইনদের কামান থাকলেও সেগুলো ওসমানিয়াদের তুলনায় ছোট ছিল এবং গোলা ছোড়ার পর কামানের পেছনদিকের ধাক্কার ফলে তাদের নিজেদের দেয়ালেরই ক্ষতি হচ্ছিল।

ডেভিড নিকোলের মতে (২০০০), কনস্টান্টিনোপল খুব সহজেই বিজয় হয় এ কথাটা সঠিক নয়। মানচিত্রে দেখানোর মতো পুরো ব্যাপারটি একপক্ষীয় ছিল না। এমনও দাবি করা হয় যে, কনস্টান্টিনোপল ঐ সময় ইউরোপের সবচেয়ে মজবুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শহর ছিল।

অবরোধ শুরু
অবরোধের শুরুতে সুলতান মোহাম্মদ শহরের বাইরে বাইজেন্টাইনদের শক্তিকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার জন্য তার সেরা সৈনিকদের পাঠান। কয়েকদিনের মধ্যে বসফরাসের কাছে থেরাপিয়া দুর্গ ও স্টুডিয়াস গ্রামে মারমারা সাগরের নিকটে অনুরূপ আরেকটি দুর্গ দখল করা হয়। মারমারা সাগরে অবস্থিত প্রিন্সেস দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয় এডমিরাল বালতুঘলুর নৌবহর। কয়েক সপ্তাহ ধরে কামানগুলো শহরের দেয়ালের উপর গোলাবর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে হামলা করতে না পারা এবং হামলার গতি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বাইজেন্টাইনরা ক্ষতিগ্রস্থ অংশ দ্রুত মেরামত করতে সক্ষম হয়।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার চেষ্টার পরও বালতুঘলুর অধীনস্থ ওসমানিয়া নৌবহরগুলো গোল্ডেন হর্নে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। বাইজেন্টাইনরা এর প্রবেশমুখে প্রতিরক্ষামূলক ধাতব শিকল বসিয়ে দেয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, বাইরের কোনো জাহাজকে গোল্ডেন হর্নে প্রবেশে বাধা দেয়া তুর্কি নৌবহরের প্রধান কাজ হলেও ২০ এপ্রিল চারটি খ্রিষ্টান জাহাজের একটি ক্ষুদ্র দল বেশ বড় লড়াইয়ের পর এতে ঢুকে পড়ে। এতে বাইজেন্টাইনদের মনোবল বেড়ে যায় এবং সুলতানের জন্য অবস্থা অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। ফলে ব্যর্থতা সত্ত্বেও বালতুঘলুর অধীনস্থ সৈনিকেরা লড়াইয়ের সময় তার সাহসিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত করায় তাকে ক্ষমা করা হয়।

এরপর সুলতান মোহাম্মদ অন্য পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গোল্ডেন হর্নের উত্তরে গালাটার ওপর দিয়ে চর্বি মাখানো কাঠের একটি রাস্তা তৈরীর আদেশ দেন। ২২ এপ্রিল সেই রাস্তা দিয়ে জাহাজগুলোকে টেনে গোল্ডেন হর্নে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে রসদ সরবরাহ করা জেনোভার জাহাজগুলো বাধার মুখে পড়ে এবং বাইজেনটাইনদের মনোবল ভেঙ্গে যায়।

২৮ এপ্রিল রাতে ওসমানিয়া জাহাজগুলো ধ্বংস করার একটা চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু ওসমানিয়রা পূর্বেই সংকেত পাওয়ায় খ্রিস্টান বাহিনী ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পিছু হটে। এরপর বাইজেন্টাইনরা গোল্ডেন হর্নের অংশে অধিক মাত্রায় সেনা সমাবেশ করে। ফলশ্রুতিতে অন্য অংশের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।

২৯ এপ্রিল ২৬০ জন উসমানীয় বন্দীকে ওসমানিয়াদের চোখের সামনেই দেয়ালের ওপর শিরশ্ছেদ করা হয়। ভূমির দেয়ালে বেশ কয়েকবার আক্রমণের পরও তুর্কিরা সফলতা লাভ করেনি। এ বিষয়ে ভেনিসিয়ান সার্জন নিকোলো বারবারো তার ডায়েরিতে জেনিসারিদের আক্রমণের বিষয়ে লেখেন, ‘তারা তাদের দেয়ালের নিচ দিয়ে তুর্কিদের যুদ্ধের জন্য আসতে দেখল, বিশেষত জেনিসারিদের ... এবং যখন তাদের এক বা দুইজন মারা যায়, আরও তুর্কি চলে আসে এবং মৃতদেরকে নিয়ে যায় ... তারা দেয়ালের কত নিকটে এসে গিয়েছে সে বিষয়ে ভাবছিল না। আমাদের লোকেরা মৃতদেহ বহনকারী তুর্কিদের দিকে কামান ও ক্রসবোর সাহায্যে আক্রমণ করে এবং তাদের দুজনেই মৃতে পরিণত হয়, এরপর আরো একজন তুর্কি তাদেরকে নিতে এগিয়ে আসে, কেউই মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছিল না, তারা স্বেচ্ছায় দশজন মরতে প্রস্তুত ছিল কিন্তু একজন তুর্কির লাশও দেয়ালের কাছে ফেলে রাখতে রাজি ছিল না।’

যুদ্ধক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় ওসমানিয়ারা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ দিয়ে দেয়ালের বাধা ভাঙ্গার চেষ্টা করে। মে মাসের মধ্যভাগ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত খনন কাজ চলে। অধিকাংশ খননকারী ছিল সার্বিয়ান শাসক কর্তৃক প্রেরিত নোভো বরডোর জার্মান বংশোদ্ভূত। তাদেরকে সেনাপতি জাগান পাশার অধীনে দায়িত্ব দেয়া হয়।

বাইজেন্টাইনরা জোহাননেস গ্রান্ট (জার্মান অথবা স্কটিশ) নামক একজন প্রকৌশলীকে নিয়োগ দেয়। তার কাজ ছিল পাল্টা সুড়ঙ্গ খুড়ে তুর্কি খননকারীদের হামলা করা। ১৬ মে রাতে বাইজেন্টাইনরা প্রথম সার্বিয়ান সুড়ঙ্গ আবিষ্কার করে। পরবর্তীকালে সুড়ঙ্গগুলো ২১, ২৩ ও ২৫ মে ধরা পড়ে এবং গোলা হামলার মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া হয়। ২৩ মে বাইজেন্টাইনরা দুই জন তুর্কি অফিসারকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করে সুড়ঙ্গের অবস্থান জেনে নেয় ও সেগুলো ধ্বংস করে।

এর আগে ২১ মে সুলতান মোহাম্মদ কনস্টান্টিনোপলে একজন দূত পাঠান। শহর তার কাছে হস্তান্তর করা হলে অবরোধ তুলে নেয়া হবে বলে তিনি প্রস্তাব দেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, সম্রাট ও অন্য যে কোনও বাসিন্দাকে তাদের সম্পত্তিসহ চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। তাছাড়া সম্রাটকে পেলোপোননিসের গভর্নর হিসেবে মেনে নেয়ারও প্রস্তাব দেন। সর্বশেষে তিনি শহরে যারা থেকে যাবে তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও দেন। কনস্টান্টাইন উচ্চমাত্রায় করপ্রদান ও তুর্কিদের হস্তগত হওয়া দুর্গ ও এলাকাকে ওসমানিয়া সম্পত্তি হিসেবে মেনে নিতে সম্মত হন।

তবে কনস্টান্টিনোপলের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আপনাকে শহর হস্তান্তর করা আমার বা এর অধিবাসীদের ওপর নির্ভর করে না; আমরা সবাই স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমরা আমাদের জীবনের পরোয়া করবো না।’

এই সময়ের মধ্যে সুলতান মোহাম্মদ তার উচ্চপদস্থ অফিসারদের সাথে চূড়ান্ত বৈঠক করেন। তবে কিছু দ্বিমত দেখতে পান। তার অন্যতম উজির খলিল পাশা, যিনি সবসময় সুলতানের শহর জয়ের পরিকল্পনার বিরোধিতা করতেন, সুলতানকে সতর্ক করে অবরোধ তুলে নিতে বলেন। খলিল পাশার স্থলে জাগান পাশাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। জাগান পাশা অবিলম্বে আক্রমণের পক্ষে ছিলেন। অতঃপর সুলতান দেয়াল ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন যাতে বাইজেন্টাইনদের প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়া যায়।

ওসামানিয়াদের চূড়ান্ত আক্রমণ
২৬ মে সন্ধ্যায় চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু হয় এবং পরদিন পর্যন্ত তা জারি থাকে। যুদ্ধসভার সিদ্ধান্তের ৩৬ ঘণ্টা পর ওসমানিয়ারা তাদের সৈন্যচালনা শুরু করে। ২৮ মে সৈনিকদের প্রার্থনা ও বিশ্রামের জন্য মঞ্জুর করা হয়। এরপর চূড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। বাইজেন্টাইন অংশে ১২টি জাহাজের ক্ষুদ্র ভেনিসিয়ান নৌবহর এজিয়ান সাগরে তল্লাশির পর রাজধানী পৌঁছে সম্রাটকে জানায় যে, ভেনিসিয়ান রসদের কোনও জাহাজ পথিমধ্যে নেই। ২৮ মে ওসমানিয়া সেনারা চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলে শহরে বড় আকারের ধর্মীয় পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় আয়া সোফিয়ায় বক্তৃতা দেয়া হয়, যাতে সম্রাট এবং ল্যাটিন ও গ্রিক উভয় চার্চ অংশ নেয়।

২৯ মে মধ্যরাতের কিছু পরে আক্রমণ শুরু হয়। ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের খ্রিস্টান সৈনিকরা প্রথমে আক্রমণ করে। এরপর আজাপ ও আনাতোলিয়ানরা আক্রমণ করে। শহরের উত্তর অংশের দেয়ালে তারা আক্রমণ করে। এই দেয়ালগুলো কামানের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো এগারো শতকে নির্মাণ করা হয় এবং যথেষ্ট দুর্বল ছিল। জিওভান্নো জিসটিনিয়ানি আক্রমণের সময় মারাত্মক আহত হন। তার এই অবস্থা প্রতিরোধকারীদের ভেতর ভীতির সঞ্চার করে। তাকে চিওস নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি কয়েকদিন পর মারা যান।

জিসটিনিয়ানির অধীন জেনোভার সৈনিকরা শহরের ভেতর ও পোতাশ্রয়ের দিকে পিছু হটে। কনস্টান্টাইন ও তার সৈনিকেদের তখন তাদের নিজের প্রতিরক্ষার ওপর নির্ভর করতে হয়। তারা জেনিসারিদের কিছু সময় পর্যন্ত প্রতিরোধ করলেও একসময় তারা শহরে ঢুকে পড়ে। যখন একটি ফটকে তুর্কি পতাকা দেখা যায় তখন সৈনিকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয় এবং উলুবাতলি হাসান তার সৈনিকদের নিয়ে এগিয়ে গেলে প্রতিরোধ ভেঙ্গে যায়।

কথিত আছে যে, সম্রাট কনস্টান্টাইন তার বেগুনি রাজপোষাক ছুড়ে ফেলে চূড়ান্ত লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে নিকোলো বারবারো নামক ভেনিসিয়ান প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, তুর্কিরা সান রোমানো ফটক দিয়ে ঢুকে পড়লে কনস্টান্টাইন ফাঁসিতে ঝুলে পড়েন। তবে তার পরিণতি কী হয়েছিল তা অজানা থেকে যায়।

হামলার পর ওসমানিয়া সেনারা শহরের সড়ক, প্রাক্তন ফোরা এবং চার্চ অব দ্য হলি এপস্টলস এসব এলাকায় চলে আসে। সুলতান মোহাম্মদের ইচ্ছা ছিল যে, তার নবনিযুক্ত পেট্রিয়ার্ককে একটি পদ দেয়া যাতে তিনি তার খ্রিস্টান প্রজাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন। তাই তিনি চার্চ অব দ্য হলি এপস্টলসের মতো স্থাপনা রক্ষার জন্য একটি নিরাপত্তা দল পাঠান।

সেনারা আয়া সোফিয়ার সামনের চত্বর অগাস্টিয়ামে চলে আসে। এর ব্রোঞ্জের ফটকের ভেতর বিপুল বেসামরিক লোক স্বর্গীয় নিরাপত্তার আশায় অবস্থান নিয়েছিল। দেয়াল ভেঙ্গে ফেলার পর সৈনিকরা মূল্যবান বস্তুকে অধিকার করা শুরু করে। সুলতান তৎকালীন প্রথা হিসেবে তিন দিন পর্যন্ত সৈনিকদের শহরের সম্পদ অধিকারের অনুমতি দেন।

তবে ওসমানিয়াদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অজানা। তাদের বেশ কয়েকটি আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা, তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক। বারবারোর বর্ণনা মতে, নর্দমায় হঠাৎ ঝড়ের ফলে সৃষ্ট বৃষ্টির পানির মতো রক্ত বয়ে যাচ্ছিল এবং তুর্কি ও খ্রিস্টানদের মৃতদেহগুলো সাগরে ভাসছিল।

পরের অবস্থা
বিজয়ের তৃতীয় দিন সুলতান মোহাম্মদ সব ধরনের লুটপাট বন্ধের নির্দেশ দেন এবং সৈনিকদের শহরের বাইরে পাঠান। ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ জর্জ স্ফ্রান্টজেজের বর্ণনা অনুযায়ী, শহরের পতনের তৃতীয় দিন সুলতান তার বিজয় উদযাপন করেন। তিনি এই মর্মে আদেশ জারি করেন- লুকিয়ে থাকা সব বয়সের নাগরিকদেরকে মুক্ত মানুষের মতো বেরিয়ে আসতে হবে এবং তাদের কোনো প্রশ্ন করা হবে না। তিনি এও ঘোষণা করেন যে, অবরোধের আগে যারা শহর ত্যাগ করে চলে গেছে তাদের বাড়ি ও সম্পদ পুনর্বহাল করা হবে, যদি তারা বাড়ি ফিরে আসে তবে তাদের সাথে তাদের পদ ও ধর্ম অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে, যেন কিছুই পরিবর্তন হয়নি।’

আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। তবে গ্রীক অর্থোডক্স চার্চকে আগের মতই রেখে দেয়া হয় এবং গেনাডিয়াস স্কোলারিয়াসকে কনস্টান্টিনোপলের পেট্রিয়ার্ক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

কনস্টান্টিনোপল অধিকারের মাধ্যমে সুলতান মোহাম্মদ তার নতুন রাজধানী পেয়ে যান। ইউরোপে ওসমানিয়াদের অগ্রসরে এরপর আর কোনো বড় বাধা থাকল না। খ্রিস্টান জগতে এই শহর হাতছাড়া হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং পশ্চিমা খ্রিস্টানদের প্রাচ্যের প্রতি আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। পোপ পঞ্চম নিকোলাস ক্রুসেডের মতো আরেকটা আক্রমণের ডাক দেন। যখন কোনো ইউরোপীয় শাসক এতে রাজি হলো না, পোপ নিজেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু তার মৃত্যুর ফলে এই পরিকল্পনা সাধিত হয়নি।

গ্রীক পন্ডিতরা কনস্টান্টিনোপলের পতনকে মধ্য যুগের সমাপ্তি এবং রেনেসার শুরু হিসেবে দেখেন। এর কারণ হলো- এই ঘটনার পর ইউরোপে পুরনো ধর্মীয় রীতির অবসান হয় এবং কামান ও বারুদের ব্যবহার শুরু হয়। উক্ত এলাকায় তুর্কিদের একাধিপত্যের কারণে এটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের মূল সংযোগস্থল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ইউরোপীয়রা সমুদ্রপথে এশিয়া আসার পথ বের করাকে গুরুত্বের সাথে দেখা শুরু করে।

সুলতাম মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ১৯২২ সালে তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই আদর্শিক সঙ্ঘাতই মূলত রাশিয়া ও ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধে ইন্ধন যোগায়। আঠারো ও উনিশ শতকে রুশ সেনারা ধীরে ধীরে কনস্টান্টিনোপলের দিকে অগ্রসর হয়। ১৮৭৭-১৮৭৮ এর রুশ-তুর্কি যুদ্ধের সময় রুশ সেনারা তোপকাপি প্রাসাদের ১৬ কি.মি. পশ্চিমে কনস্টান্টিনোপলের ইয়েশিলকো শহরতলীতে এসে পৌঁছায়।


আরো সংবাদ


premium cement