০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

সিলেটে পরিবহন শ্রমিকরা যেন সড়কের রাজা : জিম্মি সাধারণ মানুষ

সিলেটে পরিবহন শ্রমিকরা যেন সড়কের রাজা : জিম্মি সাধারণ মানুষ - ছবি : সংগৃহীত

'পরিবহন শ্রমিক'। এই নামটি এখন সিলেটের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। যখন-তখন কর্মবিরতির নামে ধর্মঘট ডেকে অচল করে দেয় তারা। ন্যায্য দাবি থেকে অন্যায্য দাবিই বেশি তাদের। এমনকি নিজেদের মারামারির বিষয়েও সড়ক অবরোধ করে ভোগান্তিতে ফেলেন সিলেটবাসীকে। তারা যেন সড়কের অলিখিত রাজা। সরকারে নয়, যেন তাদের নিয়মই চলে সড়কে। নিজেদের নিয়মবহির্ভুত কোনো কাজে বাঁধা আসলেই বেঁকে বসেন পরিবহন শ্রমিকরা।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র বলছে, সিলেটে বৈধ অটোরিকশার চেয়ে অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা বেশি। অধিকাংশ গাড়ির কাগজপত্রও ঠিক নেই। এছাড়া অনেক বাসচালকের ড্রাইভিং লাইন্সেস নেই। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই পরিবহন শ্রমিকরা একজোট হয়ে আন্দোলনে নেমে যায়। তারা কোনো আইনের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো গাড়ি চালানোর স্বাধীনতা চায়। জনগণের ভোগান্তি লাঘবে তাদের ব্যাপারে পুলিশকেও অনেক সময় পিছু হটতে হয়।

এ বিষয়ে এসএমপি কমিশনার মো: নিশারুল আরিফ বলেন, 'কিছু ঘটলেই তারা যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। মানুষজনকে চলাচলে বাধা দেয়। এতে মানুষজন দুর্ভোগে পড়েন। তারা এভাবে বার বার জনদুর্ভোগ তৈরি করছে, তবুও পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা শক্তি প্রয়োগ বা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছি না। কারণ এখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে, সামনে দুর্গাপূজা, এরপর সিলেটে নারী এশিয়া কাপ। এসব কারণে আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করছি। ফলে আমরা অনেকটা নমনীয় আচরণ করছি। তবে পরে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে। হঠাৎ সড়ক অবরোধ করে পুরো সিলেট অচল করে দেন পরিবহন শ্রমিকরা। নিজেদের দু’গ্রুপের বিরোধ নিয়ে সিলেটে রাস্তায় নেমে তাণ্ডব চালান তারা। প্রায় চার ঘণ্টা সিলেটের কোনো রাস্তায় একটি গাড়িও চলতে দেননি শ্রমিকরা। সিলেট মহানগরীর অন্তত ২৫টি স্থানে এলোপাতাড়িভাবে গাড়ি রেখে সড়ক অবরোধ করা হয়।

মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা। রিকশা, এমনকি মোটরসাইকেল চলাচলেও বাধা দেন তারা। জরুরি কাজে কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে যেতে চাইলে তাদের হেনস্তা, এমনকি মারধরও করা হয়। এ ছাড়াও সিলেট জেলার প্রতিটি উপজেলা সদর ও বড় বাজারে ঠিক একইভাবে রাস্তায় এলোপাতাড়িভাবে গাড়ি রেখে সড়ক অবরোধ করেন পরিবহন শ্রমিকরা।

জানা যায়, পরিবহন শ্রমিকদের দু‘গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছে। এই বিরোধের জেরে সম্প্রতি লেগুনা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা মো: শাহাব উদ্দিনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। এর জের ধরে গত ৮ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সুরমা থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়।

শাহাব উদ্দিনের করা মামলায় সিলেট জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি মইনুল ইসলাম, সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি জাকারিয়া আহমদ, হিউম্যান হলার শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি রুনু মিয়া মইন ও আওলাদ মিয়াসহ অজ্ঞাত আরো ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় মারপিট ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ আনা হয়।

বৃহস্পতিবার ওই মামলার ব্যাপারে মহানগর পুলিশ কমিশনারের সাথে দেখা করতে যান পরিবহন শ্রমিক নেতারা। এরপর সন্ধ্যা থেকে আচমকা মহানগরীসহ সিলেটের সবগুলো সড়ক অবরোধ করে দেন শ্রমিকরা। মামলা প্রত্যাহার ও পুলিশ কমিশনারের অপসারণ দাবিতে বন্ধ করে দেন যান চলাচল। মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে রিকশা, বাইক চলাচলেও বাধা দেন শ্রমিকরা। চালক এবং যাত্রীদের মারধরও করা হয়। অবরোধে প্রায় অচল হয়ে পড়ে পুরো সিলেট।

প্রতিটি রাস্তায় দেখা যায় দীর্ঘ যানজট। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কেও দীর্ঘ যানজট দেখা যায়। অবরোধের কারণে কোনো গাড়ি সিলেট জেলায় প্রবেশ করতে বা বের হতে পারেনি পুরো চার ঘণ্টা। সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের এমন তাণ্ডব নতুন নয়। নিজেদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে প্রায়ই কর্মবিরতির নামে ধর্মঘট ডেকে বসেন তারা। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আদায় করে নেন নিজেদের দাবি। এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পাঁচ দফা দাবিতে দিনভর কর্মবিরতি পালন করেন পরিবহন শ্রমিকরা। এতে বন্ধ করে দেয়া হয় সব ধরনের যান চলাচল। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলেও বাধা দেয়া হয়।


আরো সংবাদ


premium cement